জেগে ওঠো খেলার স্পিরিট’

আমাদের নতুন সময় : 30/06/2015

বাহারউদ্দিন : বাংলাদেশ একসময়, ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সেৌরভ গাঙ্গুলির খেলার প্রতিভায় আপ্লত হয়ে গেৌরববোধ করত। আর আজ বঙ্গীয় সমতটের অপর প্রান্ত পশ্চিমবঙ্গ, সাতক্ষীরার বিস্ময়-কিশোরের জেদ, বিনয়, বঁাহাতি-দক্ষতা দেখে মুস্তাফিজময় হয়ে আছে। তাহলে কি ইতিহাসের আরেক সদর্থক, প্রত্যাশিত অভিযাত্রার সূচনা দেখছি আমরা? লক্ষ্য করছি ময়দানের স্পিরিট, ব্যক্তিপ্রতিভার উদ্ভাস বা সঙঘবদ্ধ উষ্ঞতাকে সমর্থনের প্রশ্নে বৃহত্তরের স্বাভাবিক হূদয়বৃত্তি মানতে চায় না কোনও সীমান্ত? তোয়াক্কা করে না ভিসা পাসপোর্টের গড়িমসিকে? আপন বেগে পাগলপারা জনস্রোতের মতো, ঝোড়ো হাওয়ার মতো, যে কোনও শুদ্ধ শিল্পের সমান্তরাল চিন্তার মতো স্বচ্ছ সরব ভঙ্গিতে সমর্থনের উচ্ছ্বাস নিয়ে উপচে পড়ে মাঠে, মাঠের বাইরে? গত কয়েকদিন জুড়ে গণদেবতার এই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগ, একাত্মতাবোধের যে চালচিত্র চোখে পড়ল, তাতে বিশ্বাস বাড়ছে যে, বাংলাদেশের যে কোনও সংশয়হীন সাফল্যে সমানভাবে আলোড়িত এবার বাংলার প্রতিটি প্রান্ত। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম, এমনকি আধিপত্যবাদীরাও তাদের স্বাভাবিক উল্লাস রুখতে পারে না। দ্বিতীয়ত ভেবে দেখার মতো একটি বিষয়? তা হচ্ছে এই যে, কিছুদিন আগে, এমনকি ক্রিকেটের বিশ্বকাপের মুহূর্তেও যঁারা বাংলাদেশকে তেমন পাত্তা দেননি, তঁারাও বলতে শুরু করেছেন, ঢাকার ক্রিকেট এগোচ্ছে। দ্রুতগতিতে? অচিরে শিখরমুখী হয়ে উঠবে। গণমানসের সি্তমিত ঐক্যবোধের হঠাত্-হাওয়া বা রক্ষণশীলদের মানসিকতা বদলের এই ঝঁোক কীসের চিহ্ন? এক হয়ে চলার, এক সুরে বলার, একই আনন্দে সামিল হওয়ার সুপ্ত বাসনার বহিঃপ্রকাশের           লক্ষণ নয় কী? আমরা খোলা চোখে, উন্মুক্ত মনে বিষয়টিকে এভাবেই দেখছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দক্ষতা আর জয়যাত্রাকে যেৌথ ইতিহাস নির্মাণের নতুন অভিমুখ বলে শনাক্ত করতে ভাল লাগছে। দ্বিতীয়ত সামাজিক ভাষার, সামাজিক উন্নয়নের, মুক্ত চিন্তার বৃহত্তর যে পরিসর গড়ে তুলতে বাংলাদেশ আজ উজ্জীবিত, যে অব্যক্ত গণজাগরণের ভিত অলক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে- এসব থেকে ক্রিকেটের সাফল্য, মুস্তাফিজের উত্থান আর তার জেদের খরস্রোত বিলকুল বিচ্ছিন্ন নয়? এটাও নির্মীয়মাণ ইতিহাসের নির্দেশ। যাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়, সঙ্গতও নয়। এই শুভযাত্রায়, হূদয়ের স্বাভাবিক টানে শরিক হচ্ছে, হতে চাইছে বঙ্গভাষী ভূখণ্ডের ঐক্যের অঙ্গীকার আর অন্তরের অবরুদ্ধধর্ম। এ জন্যই মিরপুরে একদিনের ক্রিকেটে ভারতীয় দলের প্রথম বিপর্যয়ের পরদিন, ১৯ জুন কলকাতার এই সময়- প্রথম পাতার শীর্ষ সংবাদে আবেগতাড়িত শিরোনাম বসিয়ে চমকে দেয়- বাঙালি বাঘের থাবায় ক্ষতবিক্ষত ভারত। আজকাল বলল, রণদেবের ছাত্রের হাতে Èখুন’ ভারত! চমক জাগানো হেডিং আর খবরের ছত্রে ছত্রে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দক্ষতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। তবে অন্য একটি সংবাদপত্রের ভাষা, খেলাকে ঘিরে তাদের প্রতিবেদন অবশ্য যতটা না সংযত, তার চেয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রথম পাতায় সংক্ষপ্তি সংবাদ। শুরুতেই বলা হল, কোয়ার্টার ফাইনালে হারের বদলা নিল বাংলাদেশ।

এটা কি বদলা? না সাফল্য? কোনও ব্যক্তি বা সঙঘবদ্ধ দলের দক্ষতাকে সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিতে বিচার করা, ভাবা, বা এইভাবে দেখা কতটা শোভনীয়- তা ওঁরাই বলতে পারেন। আমরা সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখি, দেখতে অভ্যস্ত। এই অভ্যাস থেকে আমাদের বিচু্যত করা কঠিন। খেলার বিশ্বজনীন আবেদনকে গুরুত্ব দিই। মান্যতা দিই মাঠের স্পিরিটকে, দর্শকের উচ্ছ্বাসকে। যে দল ভাল খেলে, উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সেৌকর্য আর কেৌশলে, হূদয়ের সব ভালবাসা দিয়ে তঁাদের জড়িয়ে ধরি। এটাই দর্শকের, সর্বজনীন সমর্থনের, খেলাধুলোর আমোদ উপভোগেরও লক্ষ্য। খেলা বিভেদ মানে না, বিভাজনকে উসকে দেয় না। অন্ধ, উগ্র দেশপ্রেমের রসদ জোগায় না। খেলা মিলনের, সেৌহার্দ্যের, বিশ্বপ্রেমের অন্যরকম যোগসূত্র। শানি্তরও বার্তাবাহক। তার ভেতরেও বাইরে নৈকট্যময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, যেখানে মতান্তর নয়, মনান্তরও নয়, সুস&হ বীরত্বের পরিভাষা আর আবহ তৈরি হয়। গড়ে ওঠে শানি্তকামী মানুষের অভিন্ন প্রতিচ্ছবি। এরকম এক দৈহিক শিল্পের, কলাকেৌশলের জাদুবিদ্যাকে কেউ যদি হারজিতের গ্লানি আর বড়াই দিয়ে ওজন করে- তাহলে তাতে খেলার নিহিত দর্শন (ফিলোসফি) থেমে থাকে না, সঙ্কীর্ণতায় আটকা পড়ে তাদেরই চোখ- যারা নিজের দেশ, নিজের দল হেরে গেলে Èলজ্জায় মুখ ঢাকে’। কুত্সিত ভাষায় গালিগালাজ করে মাঠের পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের। কিন্তু নিরপেক্ষ, মুগ্ধ দর্শক, যারা অসংখ্য আর অসীম- তারা এই অসুখ থেকে মুক্ত, এটা এক পরম সেৌভাগ্য। মিরপুরে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ে এই ধরনের দর্শকদের, প্রেমিকদের অসংখ্য মুখ এবার কলকাতায়, কলকাতার বাইরেও দেখার সুযোগ ঘটল আমাদের। প্রসঙ্গত কয়েকটি উদাহরণ দিই।

২১ জুন। ছুটির দিন। হঠাত্ অঝোর বর্ষণ শুরু। অত্যন্ত জরুরি কাজে, গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েতের উন্নয়ন খতিয়ে দেখতে সুন্দরবনের দিকে গাড়ি ছুটছে। বারাসত-হাসনাবাদগামী ঝকঝকে রাস্তা। একপাশে লোকালয়, মাছের ভেড়ি আর অন্যদিকে ইছামতীর শাখা খালের নিকষ জল দেখতে দেখতে ছুটছি? জনহীন রাস্তা। বৃষ্টির আমেজ ছুঁয়ে বাড়িতে লোকজন সম্ভবত খেলা দেখতে ব্যস্ত। ভাঙড়ের ঘটকপুকুর আমাদের প্রথম গন্তব্য। গাড়ি থামল কাইজার আহমেদের অফিসের সামনে। তার সঙ্গে কথা বলেই গ্রাম দেখা শুরু হবে- কর্মসূচি এভাবেই ঠিক হয়ে আছে। কে এই কাইজার আহমেদ? দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের Èএকমাত্র এম এ পাস’ সদস্য? বনেদি পরিবারের সন্তান। রুচিসম্পন্ন, সপ্রতিভ, স্পষ্টবাদী- এবং দুর্নীতি, দলবাজি আর রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে সতত সরব তরুণ। বয়স তিরিশের ঘরে। তার সঙ্গে পরিচয় আমাদের যত্সামান্য- কিন্তু সুখ্যাতি শুনে মনে আলাদা ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে আছে? ক্রীড়ামোদী বলেও তার প্রচুর নামডাক। ওঁর অফিসে ঢোকার মুখেই দেখি টিভির সামনে জটলা। প্রতিটি যুবকের চোখ মিরপুরের শের-বাংলা স্টেডিয়ামে। কাইজারের নির্দষ্টি ঘরে প্রবেশ করতেই আইফোনের পর্দায় চোখ বুলিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য, এক বোলারের দক্ষ কাটারেই ভারতের ৬ উইকেটের পতন। কাটার শব্দটির আগে, Èবিষাক্ত, প্রতিশোধাত্মক’ জাতীয় কোনও শব্দ উচ্চারণ করলেন না কাইজার। নিঃশব্দে আমরা ওঁর মুচকি হাসি, সংযত উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করছি। কোথাও কোনও আতিশয্য নেই, বললেন- বাংলাদেশ ভাল খেলছে। ওদের সাফল্য আরও বাড়বে। বাড়বে উপমহাদেশের গেৌরব। ঠিক এই সময় স&হানীয় প্রাণগঞ্জ পঞ্চায়েতের একজন সদস্যের প্রবেশ্য। তার কণ্ঠেও উচ্ছ্বাস- বিশ্বক্রিকেটের শীর্ষ তালিকার দিকে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। এসব কথাবার্তা শুনতে শুনতে অন্য এক প্রতিক্রিয়ার উত্স আন্দাজ করার চষ্টো করছি। বাঙালি বলেই কি তঁাদের এই গেৌরববোধ? পরে কথা বলে মনে হল, না একেবারেই নয়, নিকটতম প্রতিবেশী দেশের খেলোয়াড়দের দক্ষতা, পরিশ্রম আর জেদ দেখে ওঁরা সম্মোহিত। সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। খবর ছাড়া টিভিকে দুশমন ভাবি। কুত্সিত যত সব ডেলি সোপ আমাদের সব সেৌন্দর্যবোধকে, রুচির সূক্ষতাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। এই নিয়ে বাড়িতে প্রায়ই দুই সন্তানের জননী আমার একান্ত বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া বেধে যায়। আমি খবরের স্বামী, আর উনি সিরিয়ালের গিন্নি। মিরপুরে ক্রিকেটের রেজাল্ট দেখার ইচ্ছার কাছে উনি সেদিন হার মানলেন। টিভি খুলতেই প্রতিটি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ- ওয়ান ডে ক্রিকেট সিরিজে ভারতের হার, বিজয়ী বাংলাদেশ? আগ্রহ বাড়ল। Èদ্বিতীয় দিনেও কেরামতির শান দেখাল মুস্তাফিজুর’। কিন্তু কোনও বাংলা চ্যানেলেই খেলার দৃশ্য ভেসে উঠল না। তাহলে কি কেউই প্রতিনিধি পাঠায়নি? সংশয় আর অতৃপ্তি কাটল না। অতএব পরদিনের সংবাদপত্রই ভরসা। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়, প্রতিদিন। আলোর সঙ্গে দেখা হয় কখনও দশটায়, কখনও এগারোটায়। সেদিন মেয়ের ধমকে সাড়ে নটায় ঘুম উধাও। প্রথমে Èআজকাল’ খুলেই উত্সাহে চাঙ্গা- প্রথম পাতায় বড় হেডিং- কঁাপিয়ে দিলেন সেই মুস্তাফিজুর। নিচে মিরপুর থেকে অগ্নি পান্ডের টানটান, ঝরঝরে গদ্যের প্রতিবেদন। বিস্তৃত খবরের পাশেই Èবাংলার বাঘ’ শিরোনামের তলায় সাতক্ষীরার দিগি&বজয়ীর অসাধারণ অহঙ্কারহীন হাসি। এবার চোখ শহরমুখী সংবাদপত্র এই সময়-এ। এ কাগজেও প্রশংসার খই হয়ে ফুটেছে? ব্যানার হেডিং- সিরিজ জিতে ইতিহাস বাংলাদেশের। বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে সাবালক শাকিবরা। ঢাকা থেকে রিপোর্ট রূপক বসুর। প্রতিবেদনের শুরুতেই প্রশ্ন, ইতিহাসের হুঙ্কার কেমন হয়? কেমন হয় পদ্মাপস্নাবনের শব্দ? অমর একুশে কেমন করে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশ? ইতিহাস আর বাংলাদেশের ঘোষিত অঙ্গীকার্ব জেদ, অধ্যবসায়কে স্মরণ করিয়ে দিলেন অনুজ প্রতিবেদক। অমর একুশের জাগ্রত চেতনার সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন ২১ জুনের ঐতিহাসিক মুহূর্তকে। তৃতীয় একটি কাগজের প্রতিবেদনে অবশ্য এরকম ভাবাবেগের তরঙ্গ নেই। তারা সংযত, বাংলাদেশের জয়কে যেন বিশেষ গুরুত্ব দিতে আগ্রহী নয়? অথচ ভারতীয় ক্রিকেট দলের




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]