‘সমকামিতা’ নিয়ে চলছে ফেসবুকীয় বিনোদন

আমাদের নতুন সময় : 02/07/2015

যায়নুদ্দিন সানী

ফেসবুক এখন বেশ সরগরম। সমলিঙ্গ বিয়ে নিয়ে রীতিমত লাফালাফি শুরু হয়ে গেছে। একদল তো আনন্দে আত্মহারা না জানি কি বিশাল বিজয় হলো। প্রভু দেশ আমেরিকা বলেছে, এই বিয়ে ‘জায়েজ’ তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। অন্যদল যথারীতি ‘নৈতিকতা’ ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ ‘সৃষ্টি ধ্বংস’ এসব গপ্প দিচ্ছেন। যেকোনো টপিক নিয়ে বাঙালির বাড়াবাড়ি ব্যাপারটা সম্ভবত মজ্জাগত এবং ফেসবুক সে ব্যাপারটা, চায়ের স্টল থেকে তুলে অনলাইনে এনে দিয়েছে।
গত কয়কদিন যাবত নিউজফিডের উল্লেযোগ্য ব্যাপার ছিল প্রোফাইল পিকচার রঙিন করা থেকে শুরু করে সমলিঙ্গ বিয়ে যে বেশ প্রাকৃতিক একটা ব্যাপার এই ব্যাখ্যা সংবলিত তথ্য। পক্ষে এবং বিপক্ষের ব্যাখ্যা কমবেশি একই। বলা যায়, ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’। কেউ ভদ্র ভঙ্গিতে বলছেন, কেউ অপর পক্ষকে কটাক্ষ করে। একদল বোঝাতে চাইছে, হোমোসেক্সুয়ালিটি শুরু হলে, মানব প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে, অর্থাৎ আমেরিকা যেহেতু ‘জায়েজ’ বলেছে তাই আপামর জনসাধারণ কাল থেকেই এই পথে গমন করবেন। অন্য দল ব্যাপারটাকে ব্যক্তিগত অধিকার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন।
সমলিঙ্গ বিয়ের পক্ষের এবং বিপক্ষের বক্তব্যগুলো পড়তে বেশ মজাই পাচ্ছি। বিপক্ষের জন বলছেন, এটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ। যুক্তিটি ছোঁ মেরে নিয়ে নিলেন পক্ষের জন। ‘সে তো প্রকৃতি মানুষকে ক্ষমতা দেয়নি আকাশে ওড়ার, তাও তো মানুষ উড়ছে। অন্ধকেও তো প্রকৃতি অনুমতি দেয়নি চোখে দেখার, তাও তো কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট করে সে দেখছে।’ এরপর শুরু হয়ে যাচ্ছে মহান সব সমকামিদের লিস্টি এবং জগৎকে দেয়া সেসব সমকামীদের উপহারের ফিরিস্তি। কেউ কেউ আবার এর সঙ্গে ধর্মকে টানছেন। একজন বলছেন, ধর্মে বারণ, আরেকজন আবার একটি ছবি পোস্ট দিয়েছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন সমকামি ইমামকে। বলা যায় এই বিষয়ে মুক্তচিন্তার থেকে বদ্ধচিন্তার সব চিন্তাশীল মানুষের চিন্তার বর্ণনায়, ফেসবুক এখন রীতিমত থরথর করে কাঁপছে।
পড়তে ভালো লাগে, তাই লেখাগুলো পড়ছি, যুক্তিগুলো শুনছি। তবে সম্প্রতি আমার একজন শিক্ষক এবং চিকিৎসক ডা. এআরএম সাইফুদ্দিন একরাম স্যারের একটি স্ট্যাটাস বেশ ভালো লাগল। তিনি বেশ গুছিয়ে সমকামীদের এই বিজয়ের কিছু ইতিহাস লিখেছেন। এখানে তার কিছুটা উল্লেখ করছি।
‘অবশেষে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গত ২৬ জুন সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে আইনগত বৈধতা দান করল। ১৯৯৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সম্মতিক্রমে সমলিঙ্গের বিয়ে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। প্রায় দুই দশক ধরে আন্দোলন করে সমকামীরা শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি আদায়ের পথে সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন পেল। এতদিন আন্দোলনের মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি রাজ্যে কোনো না কোনোভাবে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ ছিল। নতুন আইনের ফলে সবকটি রাজ্যেই তা বৈধতা পাবে। এর আগে দুনিয়ার আরো ২০টি দেশে সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহবন্ধন আইনগত বৈধতা দান করা হয়েছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নতুন পাস করা আইনের ফলে এখন সমলিঙ্গের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ দম্পতিরা স্বাভাবিক নারীপুরুষের বিয়ের মতোই আইনি সুবিধা পাবে, সরকারি নথিপত্রে তাদের জš§-মৃত্যুর হিসাব রাখা হবে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি অর্জনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
সমকামিতা আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই আইনের ফলে যা ঘটল, তা হচ্ছে সমকামীদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদে ক্ষতিপূরণ কিংবা সম্পদের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনি সুবিধা এনে দিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইনি বৈধতা দেয়ার এই কাজটা কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রাজনৈতিক দলগুলো বরং ভোট হারাবার ভয়ে, ব্যাপারটা হয় নিষিদ্ধ করেছিল বা এড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে ব্যাপারটাকে, একটি সমাজের উদার মানসিকতা বলা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। বলা যেতে পারে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, ‘যাক বাবা, এই বৈধতা দানের খেসারত অন্তত আমার দলকে দিতে হচ্ছে না।’
ফলে মূল প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। সমাজ এই ব্যাপারটাকে কতটা মেনেছে। কিংবা সমকামীদের কতটা সম্মানের সঙ্গে দেখছে। বলাই বাহুল্য, এ বিষয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি। যারা এই আইনি বৈধতাকে বিজয় হিসেবে দেখছেন, তারাও জানেন, ‘দিল্লি বহুত দূর’। বিভিন্ন বিতর্ক পড়ে যেটা মনে হচ্ছে, সবাই এসে আটকাচ্ছেন, দুটি জায়গায়। ‘ধর্ম’ আর ‘নৈতিকতা’।
কেন সবাই এর সঙ্গে নীতি কিংবা ধর্মকে কেন মেলানোর চেষ্টা করছেন, আমার তা খুব বেশি বোধগম্য হচ্ছে না। ‘সমাজ’, ‘সামাজিকতা’ এসব বলে ব্যাপারটার একটা ‘ঠিক’ কিংবা ‘বেঠিক’ লেবেল দেয়ার চেষ্টারও তো অর্থ দেখি না। কেউ টানছেন ‘প্রকৃতি’র উদাহরণ কেউ টানছেন ‘জিন’। কেউ বলছেন, এটা অসুখ, কেউ বলছেন স্বাভাবিক।
আর ফেসবুকে যেহেতু বিতর্কে কেউ হারে না, তাই এই বিতর্ক থামবে বলে মনে হয় না। বরং অচিরেই যোগ হবে, ‘পুঁজিবাদ’, ‘বুর্জুয়া’ কিংবা ‘হেফাজত’ এ জাতীয় ট্যাগিং। অবশেষে যুক্ত হবে গালিগালাজ, ‘চ’ বর্গীয়। একসময় এরা এমনিতেই থামবে কিংবা হয়তো গ্রিসের সমস্যা নিয়ে বিতর্কে মেতে উঠবে। এবং আবার শুরু হবে, ‘তুই আমার চেয়ে বেশি জানিস?’
যে ব্যাপারটা সবাই এড়িয়ে যাচ্ছেন, তা হচ্ছে, নীতিকথা দিয়ে কিংবা ধর্মের দোহাই দিয়ে, কোনো ব্যাপারকে কি কখনো থামানো গেছে? ‘ঘুষ’ থামানো গেছে? মিথ্যা বলা থামানো গেছে? চুরি, অন্যায়, দুর্নীতি? আমি বলছি না, সমকামিতা অন্যায়, বলতে চাইছি, যে কাজগুলোকে সবাই মেনে নিয়েছেন ‘অন্যায়’ সেগুলোকেই কখনো ধর্ম কিংবা নীতিকথা দিয়ে থামানো যায়নি, আর এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে সবাই একমতও নন, তাকে থামানো যাবে?
যারা ব্যাপারটাকে অসুস্থতা বলছেন, বিভিন্ন জিনের দোহাই দিচ্ছেন তারা একটা ব্যাপার ভুলে যাচ্ছেন যে, কাল যদি প্রমাণ হয় ‘ধর্ষণের ইচ্ছা’ তৈরি পেছনেও দায়ী কোনো ‘জিন’ তখন কি বলবেন? ধর্ষিতাকে বলবেন, ‘মেনে নাও ব্যাপারটা, ওটা ওর অসুখ’? সম্ভবত বলবেন না, কারণ এখানে একটা অপরাধ হয়েছে। যারা প্রকৃতির উদাহরণ টানছেন, তাদের যদি প্রশ্ন করি, সব প্রাণীই তো উলঙ্গ থাকে, আপনিও কি তাই করবেন? সেখানেও হয়তো উত্তর ‘না’ আসবে।
মনে হয় না এ ব্যাপারটিকে থামানো যাবে। কিংবা ব্যাপারটাকে ‘অ্যাবনরমাল’ কিংবা ‘অসুস্থতা’ বলে এর প্রতিকার করা যাবে। কোনোরকম জোর খাটিয়ে সমকামীকে ‘বিসমকামী’ করা কি সম্ভব? মূল বিতর্ক তো অন্য জায়গায়। ‘আমার ভালো লাগা বা মন্দ লাগাকে অন্যের ওপর চাপাবো কিনা’। যদি এর উত্তর ‘না’ হয়, তবে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র ব্যাপারটারই তো অস্তিত্ব থাকে না। আর যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে তো ‘ডিম ভাঙা নিয়েও যুদ্ধ জায়েজ হয়ে যায়’।
সত্যিকার অর্থে আমি নিজেও খুঁজে পাচ্ছি না, এই বিতর্ক তাহলে আমরা কেন করছি? ‘নেই কাজ তাই খৈ ভাজ?’ হয়তো। আবার বলা যায়, আমরা সবাই নিজেকে সমাজের কিংবা নৈতিকতার পাহারাদার ভাবছি। তবে যে যাই ভাবি বা করি ফেসবুকের এসব বিতর্ক দেখে আমার মনে হয়েছে এসব থেকে আপাতত পরিণাম একটাই হচ্ছে কিছু বিনোদন। সো-এনজয় ইট।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]