মৃত্যু যেখানে উৎসব, মাধ্যম সেখানে অধম

আমাদের নতুন সময় : 05/06/2018

কাকন রেজা

সাম্প্রতিক সময়ে মূলধারা আর নাগরিক সাংবাদিকতা বিষয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলাম কয়েকটি লেখায় এবং ‘ই-সাউথ এশিয়া’র সাথে ভার্চ্যুয়াল আড্ডায়। গত ক’দিন ধরে মনে হচ্ছে, যেখানে ধারাই থাকে না সেখানে আবার মূলধারা কী! নাগরিকরা যেখানে দমটেপা রোবট, সেখানে নাগরিক সাংবাদিকতা কী! যেখানে ভাঁড়’রা সমুখ সারিতে, ‘ক্যানিবাল’রা নাগরিক, সেখানে সাংবাদিকতার জায়গাটা কোথায়! এগুলো প্রশ্ন নয়, বিস্ময়। উত্তর জানা থাকা প্রশ্নগুলো বিস্ময় ছাড়া আর কী। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাম্য সমাজে এটাই স্বাভাবিক। এমন সমাজে উদয়াস্ত বিস্ময়ের সাথে যুঝতে গিয়ে বিস্মিত হবার স্নায়ুটাই অবসন্নতায় ভোগে। ভারতের ২৫টি খ্যাত মিডিয়া গ্রুপ টাকা খেতে রাজি। আদর্শ নেই শুধু উদ্দেশ্যের পেছনে ছোটা। কোবরা নিউজ এর স্টিং অপারেশন ভারতের এসব মিডিয়া জায়ান্টদের চেহারা পরিষ্কার করে দিয়েছে। বিজেপির টাকা খেয়ে এসব মিডিয়া হিন্দুত্ববাদ প্রচারে রাজি হয়েছিল। হিটলার জীবিত থাকলে এরা হয়তো নাৎসিজম প্রচারেও এক পায়ে খাড়া থাকতো, হয়তো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদও। এদের জন্যই পিতৃহন্তা চন্দ্রগুপ্ত, যে কি না নিজ পিতার বংশই ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেই চন্দ্রগুপ্ত ইতিহাসে মহান স¤্রাট হিসাবে ঠাঁই পেয়েছে। এক সময় মায়েরা সন্তানদের ভয় দেখিয়ে ঘুমপাড়াতে ছাড়া কাটতো, ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে’, সেই বর্গি, মারাঠা লুটেরাদেরও এরাই বানিয়েছে মহামানব।
দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাম্য সমাজের আমরাও তো বাসিন্দা। গুরুজন যে পথে করে গমন, সে পথ অনুসরণে তো কোন বাধা নেই। হালের কিছু বিষয় নিয়ে দেখলাম অনেকে সমালোচনা মুখর। মিডিয়ার সমালোচনায় গোপাল ভাঁড়ের নামও আলোচিত হচ্ছে। গোপাল তো এই সমাজেরই মানুষ। সে জানে কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট। চাণক্য শিখিয়েছিলেন কৌশলের কথা, গোপালেরা তা প্রয়োগ করছে, তাতে অসুবিধাটা কোথায়। কৌশল তো জার্নালিজমেরই একটা অংশ। সামনে ঈদ। সামাজিকমাধ্যমে অনেকে জানতে চেয়েছেন মিডিয়া ও মিডিয়া জায়ান্টদের নিয়ে ঈদে কোন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নেই? পাল্টা প্রশ্ন এসেছে, ঈদের আগেই তো গেল, আবার কেন? দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাম্য সমাজে গণমাধ্যম ধীরে ধীরে শুধুমাত্র বিনোদন মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। টেলিভিশনগুলোর দিকে কৌতুহলি চোখে তাকালেই বোঝা যায় এই পরিবর্তনের ধারাগুলো। প্রোগ্র্যাম আর নিউজ, শুরুর দিকে সব টেলিভিশনের ফরমেট ছিল এমনটাই। বিনোদন এবং খবর প্রচারিত হতো সময় ভাগ করে। তারপর শুরু হলো নিউজ চ্যানেল। ২৪ ঘন্টাই খবর। আর এখনতো সব মিলেমিশে একাকার। নাটক আর সংবাদ ও তার বিশ্লেষণ এবং টকশো চোখে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে না দিলে ঠাহর করা কষ্টকর। প্রায় সবই কমেডি। হালের মোশারফ হোসেনের টকশো বিষয়ক কমেডি অন্তত তাই বলে। আশা ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাম্য সমাজে যখন মূলধারা’র সাংবাদিকতা বিপথে, তখন নাগরিক সাংবাদিকতা জবাবদিহিতার একটা জায়গা তৈরি করবে। হয়তো সেই সাংবাদিকতা বিশুদ্ধ হবে না এবং না হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেহেতু নাগরিক সাংবাদিকতায় নিজেই প্রতিবেদক, নিজেই সম্পাদনায়; এমন অবস্থায় পরিপূর্ণতা আশা করা বোকামি। কিন্তু তারপরেও সত্যটা উঠে আসা এবং তাকে কেন্দ্র করে জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হওয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। সম্প্রতি মনে হচ্ছে সে আশাতেও গুড়ে বালি। এক কথায় বলতে গেলে, মূলধারা’র এক অংশের স্তব্ধতা, আরেক অংশের ভাঁড়ামি, আর নাগরিক সাংবাদিকতায় ‘ক্যানিবালিজম’ সব মিলে মাধ্যমকে অধম করে তুলেছে। চলছে যুক্তিহীন তর্ক। তোষামদি আর খিস্তিখেউর মাধ্যমগুলির মূল উপজীব্য উঠছে। গ্রাম্য সমাজের এমন কলতলাসম পরিবেশে যুক্তির মুখ বন্ধ, সভ্যতার চোখও। দক্ষিণ এশিয়ার এই গ্রাম্য সমাজ ক্রমেই আদিম যুগের অ্যামাজন অঞ্চলের রূপ পরিগ্রহ করছে। ক্রমেই উঠছে ‘ক্যানিবাল’। সঙ্গত কারণেই ‘নরভুক’ এ সমাজের কাছে মৃত্যুও উঠছে উৎসব!
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]