মানুষের ধর্মের সঙ্গে কর্মের সমাঞ্জস্যতা

আমাদের নতুন সময় : 05/07/2018

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার

ধর্ম অনেক মানুষ পালন করেন, অনেকে আবার করেন না। ধর্ম অবিশ্বাসী লোক আছেনা। নানা রকম ভেদে এ পৃথিবীর মানুষ। মানুষ তার নিজ ধর্ম ছাড়া অনেক কিছু করে যা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক, অন্যদিকে নিজ নিজ বিশ্বাস তথা ধর্মের অনুশীলন থেকে এক চুল পরিমাণ পেছাবে না এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। নিজ নিজ ধর্মেও বিভক্তি অনেক। এমন কোনো ধর্ম নেই যেখানে অনুশারীদের মধ্যে বিভক্তি হয়নি। ফলে এ বিভক্তি যুদ্ধ বিগ্রহ পর্যন্ত ঘটেছে। বিভক্তির কারণে একই সৃষ্টি কর্তার বিশ্বাসী হওয়ার পরও একে অপরকে খুন করছে দুনিয়া ও পরকালে গৌরবান্বিত হওয়ার প্রত্যাশায়। কোনো ধর্মকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। তবে নিজ ধর্ম সঠিকভাবে পালন করাটাই মূখ্য উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। শুধু মানুষই কি ধর্ম পালন করে? নাকি প্রতিটি সৃষ্টি বা প্রাণী বা বস্তুর নিজস্ব ধর্ম রয়েছে? প্রবাদ রয়েছে যে, রণে বনে প্রেমের কোনো নীতি বা ধর্ম নেই। রণে (যুদ্ধে) জয় লাভের জন্য যা করা দরকার তাই তখনকার ধর্ম, বনে (জঙ্গলে) বেঁচে থাকার প্রয়োজনে যা করা দরকার তাহাই ধর্ম এবং প্রেমে আত্মতৃপ্তি পাওয়াই ধর্ম। অন্য প্রবাদও রয়েছে যে, সব ধর্মই ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু প্রেম, ভালোবাসার কোনো ধর্ম নেই। প্রেম, ভালোবাসা বড়-ছোট, জাত-বিজাত মানে না।
পুলিশ ও আমলাদের ধর্ম কি হওয়া উচিত? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ এবং ২১(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ পুলিশ ও আমলারা কি সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করার মানসিকতা প্রমাণ করতে পেরেছে? মোটা দাগে পুলিশ ও প্রশাসনের ধর্ম কি বাস্তবতার নিরিখে যদি কথা বলতে হয় তবে এটাই এপ্রোপিয়েট যে, পুলিশ ও আমলাদের ধর্ম ‘শক্তের ভক্ত, নরমের জম।’ আপনি যদি কোনো পুলিশ বা আমলার শরণাপণœ হন, তখন দেখবেন কত ধানে কত চাল? তখন দেখা যায় সংবিধান ও আইন কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কি কি?
জন্মসূত্রে বাংলাদেশের সকল মানুষই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক যার মর্যাদা, সম্মান, অধিকার, প্রভৃতি সংবিধান ও আইন দ্বারা সংরক্ষিত ও নিশ্চিত। সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসাবে বিবেচিত। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ তা সত্ত্বেও কোনো নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার রক্ষা বা প্রাপ্তির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কোনো আমলার শরণাপন্ন হয় তখনই তাকে হেনস্থা হতে হবে যদি তার টাকা দেওয়ার মানসিকতা না থাকে বা মামা, খালু বা কোনো আত্মীয়তার রেফারেন্স না থাকে বা যদি না সে সরকারি দলের লোক না হয়। নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পেতে হলে খুঁটির জোড় থাকতে হবে, খুঁটির জোরবিহীন নাগরিকদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সংবিধান ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা তথা পুলিশ ও আমলারা দুই ভাবে প্রয়োগ করে। যার খুঁটির জোড় নেই আমলাতন্ত্র তাকে জুতার শুকতলী মনে করে। অন্যদিকে যার খুঁটির জোড় আছে তাকে একই বিষয়ে পদলেহন করে দ্রুত গতিতে চাহিদা পূরণ করে দেয়, হোক তা আইনি বা বেআইনি! অতএব, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের ধর্ম যখন যেমন তখন তেমন। একই বিষয়ে যাকে লাথি মারে, সে বিষয়ে খুঁটিওয়ালাদের মাথার মুকুট বানিয়ে কুর্নিশ করে। খুঁটিওয়ালা ও টাকা ওয়ালাদের জন্য বাংলাদেশ একটি স্বর্গরাজ্য, আর খুঁটি বিহীনদের জন্য নরক। আমলাদের এ ধর্ম উত্তরাধিকার সূত্রে বৃটিশ ও পাকিস্তান থেকে প্রাপ্ত। ‘স্বাধীনতা’ নামক প্রতিশোধক বা স্বাধীনতার চেতনা বৃটিশ থেকে উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ‘ধর্ম’ থেকে আমলাদের বিচ্যুতি ঘটাতে পারেনি।
কি আর্শ্চয এ দেশ ও জাতি। জলজান্ত ঘটনাকে মিথ্যার আবরণে অনর্গল বলে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মিথ্যা শুনতে শুনতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিকারের প্রত্যাশা করে না। কথিত আছে যে, এ দেশে সকল বিকাল জোয়ার ভাটা হয় বলে বাদশা জাহাঙ্গীর (যার নামানুসারে জাহাঙ্গীর নগর) ঢাকা প্রবেশ না করে মুন্সীগঞ্জ জেলাধীন ষাটনল থেকে বজরা (বিলাস বহুল পানসি নৌকা) দিল্লিতে ফিরে গেছেন। একটু সুযোগ সুবিধার জন্য বুদ্দিজীবীদের রং পরিবর্তন, মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তর, অধিকন্তু জনগণকে বোকা মনে করে ধোকা দেওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জাতি এখন আর আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। রক্ষকই যেখানে ভক্ষক হয় এবং রক্ষক যখন সব কিছু নিজের মতো করে গিলে ফেলার ‘ধর্ম’ গ্রহণ করে তখন জাতি আশ্রয় নিবে কোথায়?
‘ক্ষমতার’ ধর্ম কি? ক্ষমতার অনেক ধরন রয়েছে, কিন্তু এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘অন্ধত্ব।’ ক্ষমতার অন্ধত্ব্যের কারণে যার আশ্রয়দাতা হওয়ার ছিল তাহারাই হয়ে যান শ্রেষ্ঠ নির্যাতনকারী। প্রতিপক্ষকে সহ্য করতে না পারও ক্ষমতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতা খালি চোখে দেখা না গেলেও এর অ্যাকশন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। সম্প্রতি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের যখন পুলিশের বুটের নিচে দেখা যায় তখনই বুঝতে হবে যে, ক্ষমতার ধর্ম ও রং কি ও কত প্রকার? স্বীকৃতভাবে অটোম্যান স¤্রাজোর দাসীদের সাথে বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কে মুসলমান বাদশারা (রাজা) সন্তান জন্ম দিত বা মন্দিরে সেবা দাসী যখন যৌনদাসীতে পরিণত হয় তখন কোনো অপরাধ হয় না, রাজার বিরুদ্ধে কথা বললেই অপরাধ, লিখলে তো অপরাধের শেষ নেই, তখনই বোঝা যায় ক্ষমতার রূপ বা চেহারা কি হতে পারে, যেমনটি বোঝে ছিলেন সক্রেটিস।
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]