আহ্বান মানুষের জীবনের জন্য একটি দায়বদ্ধতা

আমাদের নতুন সময় : 30/09/2018

এলড্রিক বিশ্বাস

 

চট্টগ্রাম বা চট্টলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বাণিজ্যিক রাজধানী। একটি মেট্রোপলিটন শহর হিসেবে যে কোন শহরের যত রকম সুযোগ সুবিধা আছে তা চট্টগ্রামে বিদ্যমান। এমনকি সর্বশেষ প্রযুক্তির যে কোন দ্রব্য সামগ্রী চট্টগ্রামে পাওয়া যায়। তাই শহরের যুবক যুবতীরা শহরের সব রকমের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে জীবনপাত করে। জীবনে চলার পথে ধর্মকর্ম অপরিহার্য।

বেড়ে উঠা ছাত্র যুবকদের কর্ম বলতে আমরা বুঝি তাদের শিক্ষা জীবন। শিক্ষা জীবনেও পড়ার চাপের জন্য ইদানিং দেখা যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোচিং এ যায় রবিবারের খ্রিস্টযাগে অংশ নেয়ার বদলে। ঢাকার একটি বাসায় কোন একটি ঘরোয়া প্রার্থনা সভায় খ্রিস্টযাগ উৎসর্গের আগে ফাদার ছোট শিশুদের বললেন তোমরা কে কে রবিবার খ্রিস্টযাগে যোগদান কর, হাত উঠাও। সংখ্যা কম পাওয়া গেল। অনেকেই উত্তর দিল কোচিং আছে, পড়া আছে, তাই রবিবার খ্রিস্টযাগে যোগদান করা সম্ভব হয় না। এমনকি অনেক মায়েরা জানালেন তারাও রবিবার খ্রিস্টযাগে যোগ দিতে পারেন না, কারণ সন্তানকে কোচিং এ আনা নেয়া করতে হয়।

তারা শুক্র বা শনিবার খ্রিস্টযাগে যোগ অংশনেন। ছোট ছেলেমেয়েরা মা বাবার হাত ধরে রবিবাসরীয় খ্রিস্টযাগে যোগদান করে এটা হল ক্যাথলিক মন্ডলির প্রচলিত ধারা আধ্যাত্মিক পরিচর্যার ক্ষেত্রে। সে প্রথা এখন আর নেই। মা-বাবা অথবা মা বা বাবা দুই একজন সন্তান সহ খ্রিস্টযাগে যোগদান করছে। আমরা ছোটবেলায় মা বাবার সাথে খ্রিস্টযাগে যোগদান করেছি। যদি নিয়মিত খ্রিস্টযাগে যোগদান না করে তবে কি ভাবে ছেলেমেয়েরা আহ্বানের প্রতি আগ্রহান্বিত হবে। বেদীর সেবক হয়ে অনেকেই আগ্রহান্বিত হয় ব্রতধারী হওয়ার জন্য। গ্রামের ছেলেমেয়েরা আহ্বানের প্রতি আগ্রহ বেশী হয় আধ্যাত্মিক পরিচর্যার জন্য। শহরের চাকচাক্য জীবন মন টানে না আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশের জন্য। চট্টগ্রাম এর ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা শহর থেকেও আহ্বান কম আমরা দেখেছি। চট্টগ্রামের সবেধন নীলমনি ফাদার টেরেন্স রড্রিক্স গঠন পেয়েছিলেন গৌরনদীর সেবকালয়ে। সেবকালয় গঠনের জন্য দূরদৃষ্টি ও চিন্তার বহিঃপ্রকাশ যিনি ঘটিয়েছেন, যিনি একজন দার্শনিক বিশপ হিসেবে সবার নিকট প্রণিধানযোগ্য নমস্য বিশপ যোয়াকিম রোজারিও, সিএসসিকে স্মরণ করতে হয়। সাথে শুরুতে ছিলেন ব্রাদার লরেন্স ডায়েস, সিএসসি। এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের যত পুরোহিত আমরা পেয়েছি সকলেই সেবকালয়ের নবীস ছিলেন। বর্তমানে সেবকালয় গঠনগৃহ বরিশাল ধর্মপ্রদেশের পাদ্রীশিবপুর ধর্মপল্লীতে অবস্থিত। চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশে এখন একটি সেবকালয় দরকার। আমরা আজ একজন নতুন পুরোহিত পেতে যাচ্ছি যিনি হবেন চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের একজন নিবেদিত প্রাণ। যাজক অভিষেক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেক মজুর যেন শষ্য ক্ষেত্রের জন্য তৈরী হয়। প্রার্থনা করি পিতা ঈশ্বর যেন শষ্য ক্ষেত্রে মজুর পাঠিয়ে দেন। আহবান দিয়েই পিতা ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট মানুষকে এ জগতে পাঠিয়ে থাকেন।

মানুষের জীবনে এ জগতের পদচারণা একবারই হয়। যখন থেকে মানুষ বুঝতে শিখে, জানতে শিখে তখন থেকে মানুষ জীবনকে ভালবাসতে শিখে। মানুষের জীবনে ভালবাসার জন্য জীবন নাকি জীবনের জন্য ভালবাসা। আমরা সাধারণত বুঝে থাকি আহবান মানেই ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীর জীবনে প্রবেশ। যেখানে সেবার মাধ্যমে মানুষের ও সমাজের কল্যাণ করা সম্ভব। সেবায় নিহিত ঈশ্বরের ভালবাসা। ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীরা সমাজের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাঁদের সেবা কাজ খ্রিস্টের প্রচারকে করছে আরো গ্রহণযোগ্য ও সার্বজনীন। যারা ব্রতধারী বা ব্রতধারিনী নয় তাদের জীবনে কি আহবান নেই। অবশ্যই আছে। যে যা নিয়ে সমাজের জন্য ভাল কাজ করছে তা তার আহবান। সাধারণ খ্রিস্টভক্তরা কেউ শিল্পী, লেখক, সমাজ সেবক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কৃষিজীবি, পেশাজীবি, সমবায়ী সকলেই পিতা ঈশ্বরের আহবান পেয়েছে বলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

বাংলাদেশ খ্রিস্ট মন্ডলিতে এক সময় আঠারো গ্রামের খ্রিস্টভক্তদের থেকে ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীর সংখ্যা যথেষ্ট ছিল। আর্চ বিশপ, বিশপ, ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার ছিল আঠারো গ্রাম এলাকা থেকে। ঐসময় মন্ডলিতে ছিল বিদেশী ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীরা। পরবর্তীতে ভাওয়াল অঞ্চল থেকে আর্চ বিশপ, বিশপ, ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার মন্ডলি পেয়েছে। ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সিলেট থেকে ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীরা আহ্বানে আসছেন এখন। সম্প্রতি পোপ ফ্রান্সিস ঘোষিত কার্ডিনাল ও বর্তমান আর্চবিশপ নমস্য প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, সিএসসি বরিশাল ধর্মপ্রদেশের অধীন বরিশালের বাকেরগঞ্জ, পাদ্রীশিবপুর ধর্মপল্লীর বাসিন্দা। আগামীতে আমরা কোন ধর্মপ্রদেশের ব্রতধারী বা ব্রতধারিনী বেশী প্রত্যাশা করি। হয়তো আর্চ বিশপ ঢাকা ব্যতীত অন্য ধর্মপ্রদেশ থেকে হতে পারে যদি সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ থাকে। আমি অনেককেই জানি যারা ব্রতধারী বা ব্রতধারিনী নয় কিন্তু তাদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। তারা সেবা দেন প্রচার বিমুখ থেকে বা নেপথ্য থেকে। খ্রিস্টভক্ত জনগণ যারা সাংসারিক দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন, সন্তানকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলেছেন, সন্তানকে ব্রতধারী বা ব্রতধারিনী হতে উৎসাহ দেন তারাও আহবানের অংশ। যারা ব্রতধারী বা ব্রতধারিনী হন তারাতো আমাদের পরিবারেরই সদস্য। কেউ কাকা, মামা, ভাই, বোন, ভাগিনা, ভাগ্নি, ভাতিজা, ভাতিজি নানা পরিচয় বহন করে। এখন প্রায় পরিবারে যে সমস্যা প্রকট তা হল প্রতি পরিবারে ২/১ জন সন্তান। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মন্ডলিতে নিবেদিত ব্রতধারী বা ব্রতধারিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি প্রশ্নবিদ্ধ হবে? তেজগাঁও হলি রোজারি চার্চে পাল-পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব শেষে ফাদার আবেল বি রোজারিওকে চার্চ কমিউনিটি সেন্টারে বিদায় জানানো হয়। নতুন পাল-পুরোহিত ফাদার জ্যোতি এ, গমেজ দায়িত্বে আসেন। বিদায় অনুষ্ঠানে ফাদার আবেল বি রোজারিও বলেন আমি সেমিনারীতে পিছনের বেঞ্চে বসতাম। যারা সামনে বসতো তারা ছিল তুখোর সেমিনারীয়ান। সামনে বসা অনেকেই আহ্বান পায়নি কিন্তু ব্যাক বেঞ্চে বসে আমি ফাদার হতে পেরেছি। আহ্বানের জন্য পিতা ঈশ্বরের আশীর্বাদ দরকার। সেন্ট যোসেফ ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারী, রমনা ও পবিত্র আত্মার মেজর সেমিনারী, বনানী, থেকে প্রকাশিত স্মরণিকা ডিসেম্বর, ২০১৪ সংখ্যার একটি তথ্য উপাত্ত ধর্মপ্রদেশ ভিত্তিক তুলে ধরা হল।

সেন্ট যোসেফ ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারী, রমনা: মোট: ১০৫ জন।

ঢাকা-১১, চট্টগ্রাম-৭, খুলনা-১১, দিনাজপুর-২১, ময়মনসিংহ-২০, রাজশাহী-৩১, সিলেট-৪ জন। পবিত্র আতœার মেজর সেমিনারী, বনানী: মোট: ১২১ জন। ঢাকা-৩০, চট্টগ্রাম-৭, খুলনা-১৬, দিনাজপুর-১৯, ময়মনসিংহ-২৭, রাজশাহী-২০, সিলেট-২ জন। উপরোক্ত তথ্য থেকেই আমরা বুঝতে পারবো ধর্মপ্রদেশ ভিত্তিক আহ্বানের চিত্র। ভবিষ্যতে মন্ডলিতে ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রাজশাহী থেকে আহ্বান বৃদ্ধির সম্ভবনা আছে। আমরা পিতা ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা জানাই তিনি যেন বাংলাদেশ মন্ডলিকে আহ্বানের নিমিত্তে প্রচুর আশীর্বাদ দান করেন। লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বিডি খ্রিস্টান নিউজ

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]