সময়ের বিকল্প ভাবনা

আমাদের নতুন সময় : 30/09/2018

ফাদার সুনীল রোজারিও

 

রাজশাহী ধর্মপ্রদেশে তিনদিনব্যাপী ১৬তম পালকীয় সম্মেলন- ২০১৮ শেষ হয়ে গেল। পালকীয় কর্মশালার মূল বিষয় ছিল, ‘মঙ্গলবাণীর নবপ্রচার : আমাদের করণীয়।’ আজবের বাস্তবতায় মূলসুরটি উপযুক্ত ও উত্তম। আটটি জেলার বিভিন্ন ধর্মপল্লী, উপ-ধর্মপল্লী এবং প্রতিষ্ঠান থেকে ২২৩ জন প্রতিনিধি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা কম হয়নি। অনেক সুচিন্তিত দিক নির্দেশনা ছিল। সেই সঙ্গে নানা পর্যায়ে আলোচনা, পর্যালোচনাও ছিল বরাবরের মতো। ভিকারিয়া পর্যায়ে, এলাকা পর্যায়ে এবং প্যারিস পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে- আলোচনার প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। যে দলে ভালো লেখক থাকে, শিক্ষিত ব্যক্তি থাকে- তাদের প্রতিবেদন বেশী ভালো হবে, এটা জানা কথা। তবে সেগুলো এ কলামে আলোচনার বিষয় নয়। আলোচনার বিষয় হলো পারিবারিক ধর্মশিক্ষা। কারণ আমরা এখনো বিশ্বাস করি- পরিবার হলো শিক্ষার প্রাথমিক পাঠাগার।

পালকীয় সম্মেলন চলাকালীন সময়ে আমি রেডিও জ্যোতি থেকে সম্প্রচারের জন্যে মোট ছয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে আমার একটি কমন জানার বিষয় ছিলো- পারিবারিক ধর্মচর্চা এবং পিতা-মাতার দায়িত্ব। প্রশ্নের উত্তরে ফাদার ও সিস্টারগণ যে যুক্তি দেখিয়েছেন তা যুক্তিযুক্ত। চার্চ চত্বরে যেসব উপায়ে ছেলেমেয়েদের ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয় তা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটুকু শিক্ষা নিয়ে সন্তানদের উপযুক্তভাবে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। সন্তানদের গড়ে তোলার জন্য পুরোটাই চার্চের উপর ছেড়ে দেওয়াও সঠিক নয়। সন্তানগণ ২৪ ঘন্টার মধ্যে কমপক্ষে ১৬ ঘন্টা বাড়িতে থাকে। আর আট ঘন্টা কাটায় স্কুলে, খেলার মাঠে, ফেসবুক বা এখানে সেখানে। এতো হিসাব নিকাশে না গিয়ে আমরা যদি মুরুব্বিদের জিজ্ঞাসা করি তাহলে তাদের কাছ থেকে একটা নিরপেক্ষ উত্তর পাওয়া যাবে। তাদের কথায় বড়দিন, ইস্টারদিন ছাড়া কোনো সন্ধ্যায়, সন্ধ্যার মালা প্রার্থনা বন্ধ থাকেনি। কোন কারণে কোন সন্তান যদি মালা প্রার্থনা মিস করতো- তাহলে সেদিন তার কপালে দুঃখ ছিলো এবং জবাবদিহি করতে হতো। সেই যে পারিবারিক গন্ডী থেকে ধর্মচর্চা জীবনে ধারণ করেছিলাম- ব্যক্তি জীবনে আজো সেই চর্চা থেকে বের হতে পারেনি।

এখন কেন পরিবারে ধর্মচর্চা বা মালা প্রার্থনা হয়না- এই প্রশ্নের জবাব কেউ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন জনের মতামত ছিল- ছেলে সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়তে যায়, বাবা বাজারে বা মোড়ের দোকানে আড্ডা দেয়, মা রান্না করতে ব্যস্ত, বাড়িতে এখন আর তেমন বুড়া-বুড়ি নেই- যারা উদ্যোগ নিবে, কাজকর্ম বেড়েছে বিধায় ঠিক মতো সময় বের করা যায়না, ইত্যাদি। জিজ্ঞেস করেছিলাম- তাহলে সিরিয়াল দেখার সময় কীভাবে বের করেন? হাসি দেওয়া ছাড়া কোন জবাব আসেনি। ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’ এই বাক্য ফেলে দেবার নয়।

আমার ছাত্রজীবনে স্কুলে প্রতিদিন বাংলা, অংক, ইংরেজির মতো ধর্মশিক্ষা ছিলো বাধ্যতামূলক এবং প্রতিদিন ধর্মক্লাশ হতো। ধর্মেও ৩৩ নম্বর না পেলে ফেল ধরা হতো। আলোচনার সময় স্বনামধন্য একটি মিশন স্কুলের সিস্টার শিক্ষিকা বললেন যে, তার স্কুলে সপ্তাহে তিনদিন ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয়। ধর্ম যেটা মানুষের নৈতিক জীবন তৈরি করে সেটা স্কুলে কেন অপশোনাল সাব্জেক্ট হবে? এই প্রশ্নটি আমি স্কুল পরিচালনা কমিটির কাছেও রেখে দিলাম। ২০১০ জাতীয় শিক্ষা নীতিতে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারটি পরিস্কাভাবে বলা আছে। সেখানে সপ্তাহে তিনদিন ধর্মক্লাশের কথা বলা হয়নি। আমার মনে হয় স্কুলে প্রতিদিন যদি ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয়- তাহলে আপত্তি করার মতো কোনো অভিভাবক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এক সময় মিশন স্কুলে সপ্তাহে একদিন হাফস্কুল শেষে খ্রিস্টান ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা খ্রিস্টযাগের ব্যবস্থা ছিলো। খ্রিস্টযাগে সেবক হওয়া, পত্রপাঠ ও গান চালাতে হত। ল্যাটিন ভাষায় সেবকের প্রার্থনা মুখস্ত ছিলো। খ্রিস্টযাগের সময় ফাদার উপদেশের মধ্যে কিছু ধর্মশিক্ষা দিতেন। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বাড়িতে গেলে মা আবার জিজ্ঞেস করতেন- আজকে ফাদার কী শিক্ষা দিয়েছেন। উত্তর না দিয়ে মার সামনে থেকে দূর হওয়া কঠিন ছিলো। প্রতি বছর বাইবেল কুইজ হতো। ধর্মপল্লী পর্যায়ে বিভিন্ন দল তদারকি করতেন শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ। ফাইনাল কুইজ হতো ধর্মপ্রদেশের কেন্দ্রে। কী যে আনন্দ করেছি তা এখন আর বলে কয়ে শেষ করা যাবে না। ধর্মপল্লীতে বছরে একবার খ্রিস্টান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্জন ধ্যানের ব্যবস্থা ছিলো। অনুদানসরূপ চাল, ডাল, আলু, মরিচ নিয়ে সেই নির্জন ধ্যানে যোগ দিতাম। ফাদার সজ্জি, পিমে, তার উপদেশে যা বলতেন সব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। আজকে কী এই নিয়ম চালু আছে? রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের ১৬তম পালকীয় কর্মশালার মূলসুর ছিলো, ‘মঙ্গলবাণীর নবপ্রচার : আমাদের করণীয়।’ আমার মনে হয়, পরিবার থেকেই এই মূলসুরটির চর্চা শুরু করতে হবে।

লেখক: পরিচালক, রেডিও জ্যোতি

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]