ঘরের কাজের যক্ষপুরীতে বন্দি নারী

আমাদের নতুন সময় : 04/10/2018

লিহান লিমা

বাল্যকালে শিশু কন্যাটির হাতে তুলে দেয়া রান্না-বাটি খেলা পরিণত বয়সে হয়ে ওঠে অমোঘ নিয়তি। ছেলে সন্তানকে গাড়ি আর মেয়েকে হাঁড়ি-পাতিল তুলে দেয়ার মাঝেই নারীর অধিকার শব্দটিকে চাপা দিয়ে দেয়া হয়। চিরাচরিতভাবেই ঘরের কাজের দায়িত্ব বর্তায় মা কিংবা স্ত্রী’র কাঁধে। নারীর সারাদিনের পরিশ্রম পুরুষের তা‘িছ¡ল্যতায় পরিণত হয় ১০ মিনিটের কাজে। মা-ভক্ত কিংবা আদর্শ স্বামী হিসেবে পরিচিত হওয়া পুরুষটিও দিন শেষে এক কাপ চায়ের জন্য নির্ভর থাকে নারীর ওপর। রান্না করাসহ ভাত বেড়ে দেয়ার দায়িত্বটাও যেন শুধুই নারীর। মুখে বলা ১০ মিনিটের কাজের দায়িত্ব নেয়ার সাহস হয় না পুরুষের।
২০১৪ সালে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জরিপ অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের নারীদের বার্ষিক মজুরিবিহীন গৃহকাজের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা।’ এতে আরো বলা হয়, ‘গৃহিণীদের কাজ পরিবারগুলো যদি বেতনভুক্ত কর্মীদের দিয়ে করাত তাহলে বছরে ১১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতো, যা দেশের জিডিপির ৮৭ শতাংশের সমান।’ কিন্তু গৃহিণী নারী বলতেই বোঝানো হয়, ‘কিছু করে না।’ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গৃহিণী কিংবা চাকরিজীবী নারী, ঘরের কাজের ক্ষেত্রে কারোরই ছুটি মেলবার জো নেই। পড়াশোনা, চাকরি ও সন্তান সামলানো নারীকে দশভূজা দুর্গা বানানোর চেষ্টা চললেও শিবরুপী পুরুষটি বাহিরের কাজ করেই বড় ক্লান্ত হয়ে যান, যার পরিশ্রান্তির দায়িত্ব পড়ে অফিস-সংসার সামলানো নারীর ওপর।
বিবিএস পরিচালিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপে চাকরিজীবী নারীর ঘরের কাজকে ‘দ্বিগুণ বোঝা’ বলা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, কায়িক পরিশ্রম বেশি করার কারণে পুরুষের চেয়ে নারীর ডায়াবেটিস ও রক্তের উচ্চ/ নি¤œচাপের ব্যাপকতা বেশি। ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ পুরুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও নারীদের মধ্যে এ হার ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। উচ্চ/ নিম্নরক্তচাপে পুরুষের মধ্যে এর ব্যাপকতা ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হলেও নারীদের মধ্যে তা ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এই পুরুষরাই বিদেশে গিয়ে ঘরে-বাইরে কাজ করে। বিদেশফেরত শিক্ষিত যুবকের মুখে শোনা যায়, ‘যেখানকার সমাজব্যবস্থা যেমন’ বুলি। সমাজের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গা বাঁচানোর এই অজুহাত ‘সমাজ’ বলতে কি বোঝায় তা জানতে বড়ই ই‘েছ করে। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা মানুষগুলোই যদি সমাজের অংশ হয় তবে আমি, তুমি, আমরা মিলিয়েই তো হয় সমাজ। ব্যক্তি, পরিবার, পরিজন মিলেই গড়ে ওঠে সমাজের আদর্শ আকৃতি। ব্যক্তির চিন্তা, চেতনা, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে সমাজের পরিবর্তন হওয়া অবধারিত নয় কী।
বিশ্বব্যাংকের জরিপ বলছে, গৃহস্থালির ৯০ শতাংশ কাজ ভারতীয় নারীদের করতে হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি মূল্যায়নবিষয়ক সংস্থা ম্যাককিনজি গ্লোবাল বলছে, এসব কাজে পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়লে নারীর কর্মসংস্থান ১০ শতাংশ বাড়ত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, কর্মজীবী পুরুষের হারের সঙ্গে মেলালে বিশ্বে আরও ৭০ কোটি নারী কর্মজীবী হতো। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বলছে, মহানগরীতে ঘণ্টায় ১ তালাক হচ্ছে। তালাকের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঘরে বাহিরে কাজ করতে গিয়ে স্ত্রীর হাঁপিয়ে ওঠা ও সঙ্গীর প্রতি অশ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হওয়া। তাই ঘরের কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশদারিত্বই পারে কর্মক্ষেত্রে সমতা, পারিবারিক জীবনে শান্তি আনতে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com