প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে ‘নারীবাদ’

আমাদের নতুন সময় : 04/10/2018

সুমনা রায় চৌধুরী

বেশীরভাগ পুরুষের, শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও দেখি, নারীবাদের কথা শুনলে রীতিমতো চমকে ওঠেন। নারীবাদ বলতে তারা ভাবেন এবং বোঝেন, বিয়ে করতে না চাওয়া, ঘর সংসারের কাজে ফাঁকি দিতে চাওয়া, হাফপ্যান্ট পরতে চাওয়া, মদ/ সিগারেট খেতে চাওয়া, পুরুষদের ঘৃণা করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি নিজে মদ বা সিগারেট কোনোটাই খাই না, হাফপ্যান্ট পরি না, ঘরের কাজ করতেও আমার কোনো অসুবিধে নেই, তবুও আমি আগাগোড়া একজন নারীবাদী। কারন অক্সফোর্ড ডিকশনারি ‘নারীবাদের‘ ডেফিনেশন দিয়েছে, ‘ঞযব ধফাড়পধপু ড়ভ ড়িসবহ’ং ৎরমযঃং ড়হ ঃযব মৎড়ঁহফ ড়ভ ঃযব বয়ঁধষরঃু ড়ভ ঃযব ংবীবং.’ আরো সহজ করে বললে, নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার পক্ষে থাকার নাম নারীবাদ। আরোও সহজ করে বললে, নারীবাদী সে মানুষটিই, যে নারী এবং পুরুষ দুজনকে সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।
তবু কেন জানি না, নারীবাদ সম্পর্কে বেশীর ভাগ পুরুষ এবং নারীর মধ্যে ভয়াবহ রকমের ছুৎমার্গ বা ভয় আছে। এ ভয় শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে আছে। অনেকে নারীবাদ নিয়ে খুব নিম্নমানের রসিকতাও করেন। কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু দীপুর সাথে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় কথা উঠলো নারী-পুরুষের সমতার প্রসঙ্গে। আমার বন্ধুটি বললো, যতই বল মেয়েরা ছেলেদের সমান, তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। এই যেমন ধর আমি আমার শার্টটা খুলে ফেলতে পারবো সবার সামনে, তুই কি পারবি তোর শার্ট খুলে ফেলতে? বন্ধুটিকে সেদিন বলেছিলাম, পোষাকের সাথে সমঅধিকারের কি সম্পর্ক বোঝা তো আমায়! আরো একটা প্রশ্ন, তোর শার্ট খোলাকে আমি যতটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবো, তুই কি আমার শার্ট খোলাকে ততটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবি? পারবি না। কারন তোর দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা তোকে মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখায় নি। শুধু তোকে নয়, এই সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে মেয়েদের শরীর একটা ট্যাবু। কিন্তু ছেলেদের খোলা বুক খুব বীরত্ব। তাই তো সলমান খানের খোলা বুক বাহবা যোগ্য, কিন্তু কোনো নায়িকার ক্লিভেজ যৌনতার বস্তু। যেদিন তোমরা পুরুষেরা মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে শিখবে, সেদিন কথা দিলাম আমিও তোরই মতো শার্ট খুলে রাস্তায় হাটতে রাজি। বন্ধুটি আর কথা বাড়ায়নি।
এই কদিন আগে ফেসবুকে আমারই এক পোষ্টে আরেকজন পুরুষ বীর বলেছিলেন, ‘আপনি বলছেন নারী পুরুষ সমান, তাহলে পুরুষরা রাস্তায় দাড়িয়ে প্রগ্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না কেন?’ প্রশ্নটা খুবই নিম্ন মানের এবং অদ্ভুত লেগেছিলো। শারীরিক গঠন অনুযায়ী পুরুষরা দাড়িয়ে প্রগ্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না। এই সাধারন শরীরবিজ্ঞানের মধ্যে নারী-পুরুষ সমান নয় কথাটা কিভাবে প্রযোজ্য আমি বুঝতে পারিনি। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়। নারী-পুরুষের সমতার কথা বললে বেশীরভাগ পুরুষ এবং নারীরাও এধরনের অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরেন!
পুরুষদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। কিন্তু সেইসব নারী, যারা মনে করো নারীবাদ মানে সংসার না করা, লিভ টুগেদার করতে চাওয়া, সিগারেট খাওয়া, হাফপ্যান্ট অথবা নগ্ন হয়ে হাঁটার ফন্দি, তোমাদের এখনো অনেক কিছু জানার বাকী। তোমাদের জানার বাকী- আজকে থেকে এই একশ বছর আগেও নারীর কোনো ভোটাধিকার ছিলো না। রাষ্ট্রের নাগরিক রূপে গণ্য হত না নারী। ঘরের বাইরে বেরোনোর কোনো অধিকার ছিলো না। লেখাপড়া শেখার অধিকার ছিলো না। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে যে যে অধিকারগুলো প্রয়োজন তার কোনো কিছুই ছিলো না। আজকে যে তুমি আমি বাইরে বেরোতে পারছি, ছেলেদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে লেখাপড়া, চাকরী-নোকরী করতে পারছি, শপিং, সিনেমা, ফেসবুক করতে পারছি, সেটা একদিনে অর্জন হয়নি। যুগ যুগ ধরে এই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে নারীবাদীরা তোমাকে আমাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
যে পুরুষদের তালে তাল মিলিয়ে তুমি নারীবাদ নিয়ে কৌতুক করছো বা আতংকিত হ‘েছা, সেই পুরুষদের দ্বারা এখনো তুমি ঘরে ঘরে পারিবারিক হিংসার শিকার। রাস্তায় ইভ টিজিং, এসিড এট্যাক, ধর্ষন, বৈবাহিক ধর্ষনের শিকার। এই পুরুষের কাছে এখনো তোমার সতীত্বের মাপকাঠি তোমার যোনী। পুরুষ রচিত ধর্মগ্রন্তুগুলো তোমায় পাপ বলে আখ্যা দেয়। প্রতিমাসে তোমার পিরিয়ডের মতো একটি সাধারন শরীরবৃত্তীয় ঘটনাকেও অপবিত্র বলে আখ্যা দেয়। তাই মেয়ে, নারীবাদ মাথায় চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয়, নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্ধেষী হয়ে ওঠাও নয়। নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী। চোখের ছানির মতো পুরুষতান্ত্রিকতাও একপ্রকার সামাজিক ছানি এবং নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ওষুধ। সময় থাকতে এই বোধটুকু মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নাও এবং তারপর নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তাকে নাহয় ছুড়ে ফেলে দিয়ো। কিন্তু আগামী আরো কয়েক যুগ অব্দি তোমার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে নারীবাদীদের তোমার প্রয়োজন আছে। লেখক: পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। সূত্র: ফেসবুক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com