বৌদ্ধধর্ম ও বিশ্বশান্তি ড. সুকোমল বড়ুয়া

আমাদের নতুন সময় : 24/10/2018

ধর্মীয় জীবন প্রচারের শুরুতেই মানব কল্যাণে মহামতি বুদ্ধের কণ্ঠে মহাপ্রেমের মহাবাণী উৎসারিত হয়েছিল। বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করার পর পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, হে ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখ ও মঙ্গলের জন্য এমন ধর্মপ্রচার করো যেই ধর্মের আদি, মধ্যে এবং অন্তে কল্যাণ; সেই অর্থযুক্ত, ব্যঞ্জনযুক্ত পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত কর। সুতরাং এ বাণী থেকেই ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে মহামানব বুদ্ধের মহত্ত্ব এবং বিশালতার পরিচয় পাওয়া যায়।
সকল প্রাণী সুখি হউক, ভয়হীন ও নিরূপদ্রব হউক’, এই মহামৈত্রীর মহাবাণী প্রথম বুদ্ধের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল। এ বিশাল প্রেমের মধ্যে আমরা দেখি পৃথিবীর সব মানুষ, সব জীব, সব সম্প্রদায় এক এবং অভিন্ন। এখানে কোনো প্রাণীকে ছোট বা তুচ্ছ করে দেখা হয়নি। সূত্রনিপাত গ্রন্থের মৈত্রীসূত্রে এ বিষয়টি বিবৃত হয়েছে এভাবে: ‘সভয় অথবা নির্ভয়, হ্রস্ব অথবা দীর্ঘ, বৃহৎ অথবা মধ্যম, ক্ষুদ্র অথবা স্থূল, দৃশ্য অথবা অদৃশ্য, দূরে অথবা নিকটে যেসব জীব জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণ করবে সেসব প্রাণী সুখি হউক’।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বুদ্ধের দুটি বাণী বিশ্ববাসীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করেছিল। সে দুটি বাণীর মধ্যে একটি হচ্ছে মুক্তির জন্য ঈশ্বর বা পরনির্ভরশীল না হওয়া, আর অন্যটি হলো আত্মনির্ভরশীল হওয়া।
তাই তিনি সবসময় তার শিষ্যদের বলতেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা মুক্তির জন্য পরনির্ভরশীল হয়ো না, অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না, নিজেই নিজের প্রদীপ হও, নিজে নিজের শরণ গ্রহণ কর।’ শিষ্যদের তিনি আরো বলতেন, মুক্তির জন্য কোনো গুরু নয়, কোনো দেবতা নয়, অথবা কোনো ভগবানও নয়, কেবল স্বীয় কর্ম সাধনার ওপরই নির্ভর করো। জগতে এর চেয়ে ইচ্ছা ও কর্ম স্বাধীনতার মহৎ বাণী আর কী থাকতে পারে? বুদ্ধের এ বাণীর মধ্যেই রয়েছে সর্বজীবের কর্ম ও দুঃখমুক্তির পূর্ণ আশ্বাস।
বুদ্ধের শিয় জীবনের মানুষের মুক্তি যেমন কাম্য, তেমনি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কথাও অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক মর্যাদা অথবা শিক্ষামূলক গুরুত্বকে বুদ্ধ কখনো খাটো করে দেখেননি। কারণ বুদ্ধ জানতেন প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের মনকে বড় করে এবং ভালোমন্দ বিচার করার শক্তি দেয়। বুদ্ধ আরো জানতেন জাগতিক ইন্দ্রিয় ভোগের উপাদান অথবা ভোগবাদের অতুচ্ছ আগ্রাসন মানুষকে কখনো নৈর্বাণিক সুখ কিংবা জীবন যন্ত্রণার মুক্তিপ্রদান করতে পারে না।
আজ পৃথিবীব্যাপী যে পুঞ্জীভূত ক্রোধ, দুঃখ সহিংসতা ও জিঘাংসা তা দেখলে মনে হয় আজ এই মুহূর্তেই বুদ্ধের অহিংস বাণীর প্রয়োজন। বুদ্ধ চেয়েছিলেন মানব সমাজকে সর্ববিধ দুঃখের হাত থেকে উদ্ধার করতে। পৃথিবীতে তিনিই একজন সাধারণ ধর্মপ্রবক্তা প্রথম আন্তর্জাতিক মানুষ যিনি দেশ ও জাতির গ-ি অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বের, সমগ্র জীব জগতেও মানুষের দুঃখ, বেদনা, অধিকার, মুক্তি এবং জীবন যন্ত্রণার কথা ভেবেছিলেন। মহামতি বুদ্ধের চিন্তাধারাকে ভারতীয় ও গ্রিক দার্শনিক চিন্তাবিদরা এবং প্ররবর্তীকালে রুশো গান্ধী এবং মাও সেতুংও স্বাগত জানিয়েছিলেন। সুতরাং আজকের বিশ্বের রাজনীতিতে অথবা সমগ্র বিশ্বজুড়ে যখন আগ্রাসনের যুদ্ধংদেহি মনোভাব, ঠিক তখনই চীন, মধ্য আমেরিকা, এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ কিংবা এ উপমহাদেশের মতা, সার্বভৌমত্ব, ধর্ম ও রাষ্ট্র পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে আমাদের চিন্তার মুক্তির প্রশ্নটি নিয়ে। আড়াই হাজার বছর আগেও মহামানব বুদ্ধ সেই সামগ্রিক মুক্তিটি চেয়েছিলেন।
বুদ্ধ ধনবাদী তথা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে যেমন উৎসাহিত করেননি তেমনি বর্ণ ও বৈষম্যবাদী সমাজকেও কখনো স্বাগত জানাননি। কারণ বুদ্ধ জানতেন ধনবাদ কিংবা পুঁজিবাদ কখনো মানুষের জীবনে সামগ্রিক সুখ আনতে প্রারে না। দিতে পারে না মানব জীবনকে পূর্ণ নিরাপত্তা, তাই বুদ্ধ চেয়েছেন মধ্যম পন্থার মাধ্যমে ‘সকলের জন্য অধিক সুখ প্রতিষ্ঠা।’ বুদ্ধের এ নীতিকে সে সময়কার বিশিষ্ট দার্শনিক চিন্তাবিদরাসহ নীতি ও সমাজবিজ্ঞানীরা বেশ সাদরে গ্রহণ করেছিলেন, যেমন পশ্চিমা নীতিবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ড মিলও তাই বলেছিলেন। তার সুখবাদে বলছেন- “এৎবধঃবংঃ যধঢ়ঢ়রহবংং ভড়ৎ ঃযব মৎবধঃবংঃ হবি ড়ভ ঢ়বড়ঢ়ষব”। এ মতবাদে মানবতাবাদ জীবনদর্শনের সর্বজনীনতা ফুটে উঠেছে। মূলত বুদ্ধবাণী ধ্বনিত হয়েছে। বুদ্ধ চেয়েছিলেন জীবনের সব ক্ষেত্রে সমঅধিকার, সব মানুষের পূর্ণ গণতন্ত্র এবং সব মানুষের কর্মশক্তির প্রতিফলন ও মূল্যায়ন।
চলুন আমরা আজ সবাই শান্তি ও মঙ্গলের পথে অগ্রসর হই। বিশ্ব মানবতার জন্য কাজ করি। আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার এই শুভ দিনে আমাদের মন থেকে সব ধরনের পাপ, হিংসা, বিদ্বেষ এবং সব ধরনের অমঙ্গল দূর হোক। বিশ্ব মানবতা উপকৃত হোক। বিশ্বের সব জীব সুখি হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টার




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]