শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার আলোকে মানবতাবাদ ও বিশ্বশান্তি

আমাদের নতুন সময় : 24/10/2018

সমীরণ বড়ুয়া

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব এই উৎসবকে ঘিরে সারা বিশ্বে বৌদ্ধ বিহারে ও গৃহে নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংস্কৃত ভাষায় প্রবারণা শব্দ হতে পালি প্রবারণা শব্দের উদ্ভব হয়েছে। মূলত প্রবারণা শব্দের অর্থটা হচ্ছে প্র-প্রকৃষ্ট রূপে ধারণ করা, গ্রহণ করা, মনের রাগ, দ্বেষ, মোহ ও অশুভ চিন্তা চেতনাকে বর্জন করা। ত্যাগের মাধ্যমই পরিশীলিত ও পরিশুদ্ধ হওয়া, দান, শীল, ভাবনা, সমাধি ও প্রজ্ঞা উৎপাদনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি হওয়া। আত্মসংযম করা, আত্মপলব্ধি, আমন্ত্রণ, পাপ-দেশনা, দোষ ত্রুটি স্বীকার করা। মিলনোৎসব, আশার তৃপ্তি পূরণ, অভিলাস পূরণ এবং এক ভিক্ষু- অপর ভিক্ষুর কাছে আত্ম নিবেদনের মাধ্যমে সংশোধিত হওয়াটাই হলো প্রবারণা। মূলতঃ আশ্বিনী পুর্ণিমাই হচ্ছে বৌদ্ধদের কাছে প্রবারণা পূর্ণিমা। এই শুভপ্রবারণা পূর্ণিমার আলোকে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সুপ্রিয় পাঠকদের জানার সুবিধার্থে এখানে কিঞ্চিত আলোকপাত করছি।
আজ সারা বিশ্বে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নিয়ে চলছে নানা ভেদাভেদ, হত্যা, নিধন যজ্ঞ। ফলে বিভিন্ন দেশে ধর্মমতাবলম্বীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে হানাহানি, নারী ধর্ষণ, অত্যাচার, অনাচার, দমন- নিপীড়ন, নির্যাতন, মানবাধিকার চরম লঙ্ঘন ও বিপন্ন মানবতার মত লোম হর্ষক নারকীয় ঘটনা। হিংসায় উন্মুক্ত এই অশান্ত বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে মানবপুত্র মহাকারুনিক তথাগত ধর্মরাজ গৌতম বুদ্ধের অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হতে হবে। সামাজিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও পরিবেশকে সুন্দর শান্ত ও স্থিতিশীল রাখতে হবে। যদিও এটা খুবই দূরুহ কাজ। তবে গৌতম বুদ্ধের ধর্ম, প্রঞ্চনীতি, চতুরার্য্য সত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গসহ বুদ্ধের সকল আদর্শ ও নীতিকে সমুন্নত রাখতে পারলেই প্রতিটি দেশে শান্তি ফিরে আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এবার প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য বিষয়ে আলোকপাত করছি। তথাগত অর্হৎ গৌতম বুদ্ধ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বারনসীর অন্তর্গত সারনাথের মৃগধাবে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু সংঘের কাছেই সর্বপ্রথম ধর্ম চক্র সূত্র দেশনা করেন। এই ধর্ম দেশনা শ্রবণ করে কৌন্ডন্যের ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হযেছিল। “যংকিঞ্চি সমুদয় ধম্মং সববন্তং নিরোধ ধর্মং”। অর্থাৎ তার জাত বিষয় সদেব মনুষ্য লোকের সীমা অতিক্রম করে একত্রিশ লোকভূমিতে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে সাধুবাদ ধ্বনিতে সারাবিশ্ব আলোকিত হয়ে উঠেছিল। এমনকি কোটি দেবতা এবং ব্রহ্মা অন্য কোন্ডন্যের সাথে স্রোতাপন্ন হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্ররেই তথাগত গৌতম বুদ্ধ ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস শুরুর করল।
এই বর্ষাবাসের শুরু থেকেই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্ম শ্রবণে মনো সংযোগী হয়ে বুদ্ধের কাছে দেশনা শ্রবণ করত। বুদ্ধের পঞ্চবগীয় শিষ্যের মধ্যে বপ্পভিক্ষু বুদ্ধের মুখ নিসৃত ধর্মদেশনা শ্রবণ করে বিমুক্ত সুখ লাভ করেন। পরে তিন মাসের মধ্যে পাঁচজন ভিক্ষুই অনাত্ব লক্ষণ সূত্র শ্রবণ করে বিমুক্ত হন। ভিক্ষুগণ বললেন রূপ অনাত্মা, রূপ আত্মা নহে। যদি রূপ আত্মা হয়, তবে পীড়ার কারণ হত না। রূপে এ রূপ অধিকার করা যেত, আমার রূপ এ রূপ হোক, এ রূপ না হোক, যেহেতু রূপ আত্ম নহে। সেহেতু রূপ পীড়ার কারণ হয়ে থাকে। আমার রূপ, এ রূপ থেকে অনুরূপ হোক- এ অধিকার লাভ করা যেত না। বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিভাজন সম্পর্কে ও একই কথা বলেছেন। হে ভিক্ষুগণ- তোমরা কি মনে কর, রূপ নিত্য না অনিত্য। অনিত্য তা দুঃখ নাকি সুখ। দুঃখ ভান্তে। যা অনিত্য তা পরিবর্তনশীল। এই যে সর্বরূপতা আমার নয়। আমি আমার নই। আমার এই আত্মা ও নয়।
বিষয়টি সম্যক প্রজ্ঞার দ্বারা দর্শন করতে হবে। বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ও বুদ্ধ তাই বলেছেন, এভাবে বিষয় দর্শন করলে শ্রতবান আর্যশ্রাবক রূপে নির্বেবেদ জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়। সংস্কার ও বিজ্ঞান উদাসীন হয়। উদাসীনতার কারণে স্পৃহায় হয়। বিরাগ হেতু বিমুক্ত হয়। বিমুক্ত হলে- বিমুক্তি হয়েছিল বলে জ্ঞান উৎপন্ন হয়। এতে জন্মের বীজ ক্ষীণ হয়। ব্রহ্মচর্য ব্রত পরিসমাপ্তি হয়। আর জন্ম হবে না বলে মনে স্থির সিদ্ধান্ত হয়। এভাবে প্রকৃষ্ঠ রূপে জানতে প্রারে। গৌতম বুদ্ধ উপরোক্ত দেশনা কালে ভিক্ষুগণ প্রসন্ন চিত্তে শ্রবণ করে বেশ আনন্দিত হন। এই ভাবে এই মহাবিশ্বে ৬১ জন অরহত আত্মপ্রকাশ করেন।
হানাহানি বা কোনো জাতি নিধন নয়। মহামতি গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, অদ-নীয়ও নিরাপরাধকে দোষী সাব্যস্ত করে যে ব্যক্তি দ- বিধান করে । সেই ব্যক্তি ইহজন্মে সহসা দশবিধ অবস্থার ঘৃণ্যতর পাপ ভোগ করে থাকে। তীব্র যন্ত্রণা, ধনক্ষয়, অঙ্গচ্ছেদ, পক্ষাঘাতাদি, কঠিন ব্যাধি ও চিত্ত বিক্ষেপ গ্রস্থ হন। কোনো বৌদ্ধ- মানুষ নয় কোন প্রাণীকেও হত্যা করতে পারবে না।
তাই মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি যারা নির্যাতন নিপীড়ন চালাচ্ছে- তাদের প্রতি বাঙালি বৌদ্ধদের পক্ষে অনুরোধ জানাচ্ছি যে, তা এখনই বন্ধ করুন। অবিলম্বে রোহিঙ্গাদেরকে স্বসম্মানে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নিতে উদাত্ত আহ্বান জানাই। পরিশেষে বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলে, প্রাকৃতিক ভয়াবহ ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা খড়া থেকে পরিত্রাণ পেতেই মহামতি গৌতম বুদ্ধের ধর্ম, আদর্শ ও নীতিকে সমুন্নত রাখতে প্রতিটি দেশে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে মানুষের মধ্যে সুখ, শান্তি ফিরে আসবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মধ্যে আজ শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত কবিতার ভাষায় যদি বলি- “পাষানের মৌনতটে যে বাণী রয়েছে চিরস্থির। কোলাহল ভেদ করি শত শতাব্দীর”। সকলকে শুভপ্রবারণা পূর্ণিমার মৈত্রিময় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সকল দুঃখিত প্রাণী দুঃখহীন হউক। সকল ভয়ার্তপ্রাণী ভয়হীন হোক। সকল রোগার্তপ্রাণী রোগহীন হোক। জগতের সকলপ্রাণী সুখি হোক।
লেখক : আধ্যাত্মিক সাধক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক প্রাবন্ধিক শিক্ষাবিদ। প্রধান পরীক্ষক বাংলা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]