আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন : একটি বিশ্লেষণ

আমাদের নতুন সময় : 09/11/2018

ড. সেলিম জাহান : গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী-কালীন নির্বাচন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দেশটির ডেমোক্রেটিক দল আবার ক্ষমতার মধ্যস্থানে অনেকখানি হারানো জায়গা পুনর্দখল করে নিয়েছে। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটরা আমার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কোন কোন রিপাবলিকান অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপালের আসনটি তারা লাভ করেছে। নানান পর্যায়ের নির্বাচনী আসনে তারা হেরেছে বটেÑতবে জোর লড়াইয়ের পরে এবং খুব অল্প সংখ্যক ভোটে। মনে হচ্ছে সুপরিবর্তনের সুবাতাস যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবার বোধহয় বইতে শুরু করেছে।

তবে এ নির্বাচনে ইতিহাস গড়ার ব্যাপারটি বোধহয় নির্বাচনের ফলাফলের বাইরে আরেকটি বৃহত্তর মাত্রিকতায়। প্রথমত এ নির্বাচনে মানুষ বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেছে। গত ৫৪ বছরে এমনটা দেখা যায়নি। তারা অতিষ্ঠ হয়ে গেছে বর্তমান প্রশাসনকে নিয়ে এবং বুঝেছে যে পরিবর্তন চাইলে তাদের ভোটের মূল্য অনেক। দ্বিতীয়ত শহরের উপকণ্ঠে বা শহরতলী, যা শিক্ষিত মধ্য বা উচ্চবিত্তের পরিবার অধ্যুষিত এবং যেটা রিপাবলিকান প্রশাসনের একটি বড় খুঁটি, সেখানে মানুষ এবার বিপুল হারে  ডেমোক্রেটদের ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত এ নির্বাচনে যে কোন মানবগোষ্ঠীর বহুতা সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধাশীল মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। সে কারণে এ নির্বাচনে আদি-আমেরিকারানরা প্রতিনিধি পরিষদের আসন গ্রহণ করেছেন, নির্বাচিত হয়েছেন মুসলিম ধর্মালম্বিরা, কংগ্রসে এসেছেন তরুণরা, যুক্তরাষ্ট্র বাছাই করে নিয়েছে তার প্রথম সমকামী রাজ্যপালকে।

তবে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচনে সত্যিকারের ইতিহাস গড়েছেন নারীরা। কংগ্রেসের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২৯ বছরের এক নারী প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য সবাইকে হতবাক করে দিয়েছেন। দু’জন মুসলিম মহিলাও তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন। আদি-আমেরিকান যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তিনিও নারী। ক’জন নারী প্রার্থী রাজ্যপালের লড়াইও জিতেছেন। শুধু প্রার্থী নন, এসব বিজয়ী নারীদের নির্বাচনী প্রচারনা যাঁরা চালিয়েছেন, তাঁদেরও এক বড় অংশ নারী। তবে এই সব নারীরাই ডেমোক্রেটÑরিপাবলিকান দলে নারী বিবর্জনই মূল ছিলো বলে মনে হয়।

এই যে শুভ প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে, তা’ কিন্তু একটি প্রতিহত করার প্রচেষ্টা-উদ্ভুত। গত দু’বছরে রিপাবলিকান শাসনের মূল কলকাঠিই ছিল আস্থা নয়, বরং ভীতি ও শঙ্কার বীজ ছড়িয়ে দেয়া, অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং বিভাজনের ওপরে ভর করা; বিশ্বায়ন নয়, বরং অন্তর্মুখী মনোভাব গ্রহণ করা; নিশ্চিতকরণ নয়, বরং সবাইকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া। এই পথ ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছে, শ্বেতাঙ্গ-শ্রেষ্ঠত্বকে সমর্থন করেছে, বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করেছে, চীনে-জুজুর ভয় দেখিয়েছে। এর কোনটিই মৌলিক আমেরিকান ধ্যান-ধারণার সঙ্গে যায় না।

সেই সঙ্গে নীতি সমর্থন সব গেছে ধণিক শ্রেণির প্রতি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা খর্ব করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্যের আপাতন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অসমতা। বৈষম্যের শিকার হয়েছে নারীরা, কৃষ্ণাঙ্গরা, আদি-আমরিকানরা, অভিবাসীরা। একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দেয়াল তুলে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে, জন্মসূত্রেও আমেরিকান নাগরিকত্ব দেয়া হবে না বলে শাসানো হয়েছে এবং খলরাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে খর্ব করার জন্যে। ফলে এমন একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে জনগণ এটাকে প্রতিহত করার জন্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচনকে বেছে নিয়েছে।

অনেক পর্যবেক্ষকই বলছেন, ডেমোক্রেটিক দল প্রতিনিধি পরিষদ ছিনিয়ে নিয়েছে বটে, কিন্তু সিনেট তো নিতে পারেনি। সুতরাং সর্বাঙ্গীন জয় তো হল না। তাঁরা কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন যে, আইন প্রণয়ন করতে গেলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয়েরই অনুমোদন প্রয়োজন। সুতরাং প্রথমত বর্তমান প্রশাসনের যে কোন অপচেষ্টা বাধা দেয়ার মতো একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো। দ্বিতীয়ত প্রতিনিধি পরিষদের কতকগুলো বিশেষ ক্ষমতা আছে যা প্রশাসনের দৃশ্যমানতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার জন্যে একান্ত জরুরী। যেমন, প্রতিনিধি পরিষদ প্রশাসনের যে কাউকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে ডেকে পাঠাতে পারে, যে কারো কর জমা দেয়ার প্রমাণপত্র দাখিল করতে বলতে পারে, অন্য কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন ষড়যন্ত্রমূলক আঁতাত হয়েছে কি-না তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৮ সালের মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচন কোন শেষ কথা নয়, একমাত্র কথা তো নয়ই। কিন্তু এটি একটি শুভ প্রক্রিয়ার একটি সুদৃঢ় শুভ সূচনা। বহু হৃত মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার জন্যে, বহু নষ্ট করে দেয়া প্রক্রিয়াকে শক্ত ভূমির প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে এবং বহু অশনিসঙ্কেত রোধ করার জন্যে গতকাল দেয়া মার্কিন জনগণের রায় একটি ঐতিহাসিক পালাবদল শুরু করুকÑশুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষের এটাই কামনা। সম্পাদনা : রেজাউল আহসান




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com