খ্রিস্টীয় শিক্ষার আঙ্গিকে  জীবনটা পাল্টাতে পারি

আমাদের নতুন সময় : 25/11/2018

আলো ডি’রোজারিও

 

১. একবার আমরা তিনজনে মিলে কলার ছড়া চুরি করেছিলাম। সেই ছোটবেলায়, তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। কলা এমন জায়গায় লুকালাম যে কেউ জানতেও পারল না। কলা পাকে, আর আমরা তিনজনে মিলে লুকিয়ে লুকিয়ে খাই। এইভাবে চলল বেশ কয়েকদিন। শেষ দিনে হ’ল কী, বেশ কিছু কলা এক সাথে পেকে গেল। আমরাও তিনজনে সব ক’টা কলাই সাবাড় করে দিলাম। শেষ দিনের এই কলা খাওয়ার ঘটনা ঘটলো স্কুল হতে আসার পর, কিন্তু দুপুরের খাবার ঘন্টা খানেট আগে। দুপুরে খেতে বসে আমি কোন মতে মা’কে বুঝাতে পারলাম কম খাওয়ার কারণ, আমার বড় যেজন পাশের বাড়ির, তারও সমস্যা হ’ল না বুঝাতে। কিন্তু আর একজন, একটু দূরের বাড়ির, ও আমার চেয়ে বয়সে ছোট, সে খেতে বসে বিপত্তি ঘটিয়ে ফেলল, বলে দিল জেরার মুখে ওর মার কাছে, কোত্থেকে কী খেয়ে সে পেট ভরেছে। তারপরের ঠেলা সামলানো কী যে দায় হয়েছিল আমাদের। বিশেষ করে আমার, আমার উপর দিয়েই গেল সব ধমক, হুমকি-ধামকি এমনকি দু’য়েকটা চড় থাপ্পড়ও। এখন ভাবি, ঐঘটনায় শুধু আমি মার খেলাম কেন? কেন বলা হয়েছিল আমার বুদ্ধিতেই এটা ঘটেছিল? আসলে আমাদের তিনজনের দলনেতা তো আমি ছিলাম না, তাহলে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে একসময় পেয়েও যাই। তবে এখনো বলার সময় আসেনি, আরো ঘটনা বলে নেই।

২. তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালে একবার স্কুল হতে বাড়ি আসবার পথে পাশের বাড়ির একজনের সাথে কথা কাটাকাটি হ’ল। বিষয়টি আজ আর মনে নেই। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পাশের বাড়ির ছেলেটি আমার মাথায় খুব জোরে আঘাত করল, স্লেট দিয়ে। আমার মাথা ফেটে রক্ত গড়ালো। শীতের দিনে পরা লাল সোয়েটার রক্তে ভিজে আরো গাঢ় লাল হয়ে গেল। একজন খুব দয়াপরবশ হয়ে আমার যতœ নিলেন, মাথায় কিছু একটা লাগিয়ে কাপড় দিয়ে বাঁধলেন, আমাকে হাত ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ দূরে। সহৃদয় ব্যক্তিটি আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাবার সময় মা’কে নাম ধরে ডেকে বলে গেলেন, ‘তোর ছেলের কোন দোষ নেই। ওকে কিছু বলবি না, আমি পেছন থেকে ঘটনাটি দেখেছি। মা সেই সহৃদয় ব্যক্তির কথা রাখেননি। আমাকে মাথা ফাটানোর জন্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাঠরত সেই ছেলেকে কেউ আর কিছুই বলেনি। আমাদের গ্রামীণ সমাজে এমনটা হয় কেন? এখনো কী হয়?

৩. তখন আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। পড়ি তুমিলিয়া বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। চড়াখোলা গ্রাম হতে আমার এক আত্মীয় খুব চোট-পাট করতে করতে আমার মামার বাড়ি এসে হাজির। আমি তখন থাকতাম মামার বাড়ীতে। তিনি রেগে-মেগে উচ্চ স্বরে অনেক কিছু বলতে লাগলেন একটানা। রীতিমত ভিড় জমে গেল তার কথা শুনে। তিনি যা বললেন তার মমার্থ অনেকটা এরকম: আমি প্রেমপত্র লিখেছি চড়াখোলা গ্রামের এক মেয়েকে। সেই প্রেমপত্র মাঝ পথে ছিনতাই হয়ে গিয়ে পড়েছে ঐ গ্রামেরই এক শিক্ষকের কাছে। শিক্ষক মহোদয় সেই প্রেমপত্র আমার আত্মীয়কে দিয়ে বলেছেন, আমার এই অপরাধের উচিত বিচার করতে। এর একটি বিহিত করতেই এই প্রেমপত্রের খবর শোনামাত্র আমার আত্মীয়টি চলে এসেছেন।

সেই প্রেমপত্রটি তার হাতে ছিল, খুবই মূল্যবান জিনিসের ন্যায় মুঠোবন্দী। অনেক চেয়ে-চিন্তে আমার এক মামা চিঠিটা নিলেন, পড়লেন মনোযোগ দিয়ে, প্রথমে নীরবে। পরে সকলে যেন শুনতে পারেন সেই সুবিধার্থে জোরে। চিঠির শেষে আমার নাম লেখা। অপরাধী ও আসামী হিসেবে আমি সবার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে সকলের দৃষ্টি, সেই দৃষ্টি জিজ্ঞাসার বা কৌতুহলের। আমি নির্বিকার, কিছুই বলছি না। কী আর বলব, আমার নামই তো লেখা। আমার নামে দ্বিতীয় আর কেউ কোথাও আছে নাকি! ইতিমধ্যে চিঠিটি আমার দিদিমার হাতে গেল। তিনি দেখলেন, ভাল করে পড়লেন, শেষে দৃঢ়ভাবে বললেন: এটা আমার নাতির লেখা চিঠি না। হাতের লেখা ওর হাতের লেখার মতো কিন্তু এটা ওর হাতের লেখা না। এখানে দু’টা বানান ভুল আছে। ও ভুল বানানে কিছু লিখে না। দিদিমার দৃঢ়তার কাছে হার না মেনে চড়াখোলার সেই আত্মীয়টি বললেন, ‘তোমার নাতি কতটা ইতর, আমি জানি না? এটা ওরই চিঠি, তা না হলে এমন চুপ মেরে আছে ক্যান, ও তো কোন রা-ই করছে না’।

৪. আমি মুখ খুলিনি, মুখ খুলে কী বলব? কী বললে তারা বিশ্বাস করবেন? আমি তো জানি, আমি সে চিঠি লিখিনি। তারা সকলে বললেই কী সেই চিঠি আমার লেখা চিঠি হয়ে যাবে, যা আমি লিখিনি। আমি বরাবরই এমন, মিথ্যে অভিযোগ তুললে কিছু বলি না। যারা মিথ্যে বলেন তারা এক সময় আর বলেন না, হাল ছেড়ে দেন।

এখন ঐ প্রেমের চিঠি লেখার আসল বিষয়টি খুলে বলা যাক, আমাদের ব্যাচের আগের ব্যাচের একজন চিঠিটি লিখে আমাদেরই এক সহপাঠীকে দিয়েছিল চিঠিটি পৌঁছে দিতে। চিঠিটি পৌঁছাবার আগেই হাতছাড়া হয় অন্য এক সহপাঠী দেখে ফেলাতে। পরে সে সেই চিঠি চড়াখোলার এক শিক্ষকের কাছে জমা দিয়ে দেয়। শিক্ষক মহোদয় চিঠিটি খুলে দেখেন আমার নাম, তাই বিচার করতে দিয়ে দেন আমার আত্মীয়ের কাছে। আমার আত্মীয় চিঠিটি পেয়েই দড়িপাড়ায় আমার মামার বাড়ীতে রওনা দেন। বিপদ আঁচ করতে পেরে প্রেমপত্র লেখক ও প্রেমপত্র বাহক দুজনেই তাদের গ্রামের শিক্ষকের কাছে গিয়ে সব খুলে বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এতসব কিছু আমি পরদিন স্কুলে জানতে পারি, সেসাথে জানতে পারেন সকলেই। আমার নামে অন্য একজন প্রেমপত্র লিখেছে, এটা ছিল সেদিনের টক অব দ্য স্কুল।

৫. এরকম ঘটনা আরো আছে, পরে আরো লিখব। এই পর্যায়ে আমার প্রশ্ন: কেন কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ আনা হয়? একই অভিযোগে কেউ কেউ শাস্তি পায়, সকলে পায় না কেন? ন্যায্যতার প্রশ্নে সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় না কেন? কাউকে কাউকে শাস্তি দিতে, এমনকি বিনা দোষেও, কারো কারো এত বেশী আগ্রহ থাকে কেন? অন্যের কষ্টে আমরা কেউ কেউ বেশী বেশী আনন্দিত হই কেন? কেন আমরা নিরপেক্ষ হতে পারি না? কেন আমরা খ্রিস্টীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ন্যায্য আচরণ করি না? এসব প্রশ্নের উত্তর কম বেশী আমাদের সকলেরই জানা। সমাজে প্রচলিত ধারা হ’ল, ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনদের আলাদাভাবে দেখা, বিত্তশালী ও বিত্তহীনদের বিষয়ও ভিন্নচোখে দেখা। সবল ও বিত্তশালী অপরাধ করে সাজা হয় পাবে না বা পেলেও কম পাবে। অপর দিকে দূর্বল ও অসহায় যারা তারা সামান্য অপরাধে পাবে গুরুতর সাজা। কোন কোন সময় আমরা কেউ কেউ অন্যের ভালো বা উন্নতি সহ্য করতে পারি না। তাই হিংসের বশবর্তী হয়ে অন্যকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করি। এসবই অখ্রিস্টীয় এবং সে কারণে বর্জনীয়। আমরা আমাদের ছোট খাটো ঘটনা থেকে খ্রিস্টীয় শিক্ষার আঙ্গিকে বিচার বিশ্লেষণ করে বড় শিক্ষা নিয়ে জীবনটাকে নিজেই পাল্টাতে পারি। নিজের জীবনকে আরো আলোময় আরো সুন্দর করতে পারি। সেসাথে চেষ্টা করতে পারি অন্যের জীবনকেও আরো ভালো, আরো সুন্দর করতে।

লেখক : ড. বেনেডিক্ট আলো ডি’রোজারিও, সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]