সময়ের বিকল্প ভাবনা

আমাদের নতুন সময় : 25/11/2018

ফাদার সুনীল রোজারিও

 

একজন কর্মী সর্ব প্রথমে একজন মানুষ। একজন মানসম্পন্ন বা গুনসম্পন্ন মানুষের প্রথম পরিচয় সে সৃষ্টির মধ্যে উত্তম। মানুষের সাথে বিশ্বসৃষ্টির আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। তুলনা চলে না কারণ মানুষের মধ্যে মন আছে, মান আছে, গুণ আছে। অন্য প্রাণীর তা নেই।

প্রাণী জগতের মধ্যে বেঁচে থাকার তাগিদ সব কিছুর আগে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রাণীকুল মূলত বেচেঁ থাকার সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। কোনো কোনো প্রাণী আবার মানুষের তাগিদ পূরণের জন্য গৃহপালিত হয়। নতুবা বনে বনে ঘুরেই বেড়াতো। প্রাণীরা বনেই সুন্দর।

সৃষ্টির মধ্যে মানুষ উত্তম হলেও সৃষ্টিকর্তাকর্তৃক যে গুন ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে ভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে তা কিন্তু অনুশীলন করে অর্জন করতে হয়। যেমন পাখিদের কিন্তু পাঠশালায় ভর্তি হয়ে তার বাবা মার মতো ডাক বা গান শিখতে হয় না। দোয়েল বিভিন্ন ঋতুতে যে বিভিন্ন সুরে গায় বাচ্চারা কিন্তু তা এমনিতেই শিখে ফেলে। মানুষকে শিখতে হলে তাকে পাঠশালায় যেতে হয়। মানুষকে সেঁধে সেঁধে অনুশীলন করে করে শিখতে হয়। পাখিরে দিয়েছো গান তাই সে গায় গান, আমাকে দিয়েছো কন্ঠ আমি সাধি গান। মানুষ উত্তম হলেও সে অসহায়। তাকে বেঁচে থাকার জন্য কাজে যেতে হয়, জমিতে বুনতে হয়, শেখার জন্য পাঠশালায় যেতে হয়। এই যে মানুষকে দেওয়া সৃষ্টিকর্তার ভিন্ন ভিন্ন অনুগ্রহ, এর জন্যই মানুষের অবসর নেই। এই যে মানুষের অবসর নেই, তাকে অনবরত কাজ করতে হয়, এই কাজ করতে গিয়েই সে নিজেকে সমৃদ্ধ করে এবং অন্যকে সাহায্য করে। আর এইভাবে সে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য সফল করে। একজন মানুষ যে কাজই করুক না কেনো- সেই কাজের মধ্যদিয়েই সে আধ্যক্তিকতা অর্জন করতে পারে। যেমন- ডাক্তার তার চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে সেবা করে। মেকানিক তার দক্ষতা দিয়ে যন্ত্রপাতি মেরামত করে। সমাজ সেবক তার সেবা দিয়ে সমাজ উন্নয়ন করে। এই যে আমার প্রয়োজনে অন্যের কাছে যাওয়া আর অন্যের প্রয়োজনে আমার কাছে আসা, এই আসা যাওয়া, দায়িত্বগুলো সুষ্ঠভাবে পালন করার মধ্য দিয়েই একজন ব্যক্তির মধ্যে আধ্যাক্তিকতার পরিমন্ডল তৈরী হয়। একজন কর্মী তার আধ্যাক্তিকতা ও সেবা যতো বিলাবে তা ততো বৃদ্ধি পাবে। সেবা অর্থকড়ি নয় যে বিলালে ফুরিয়ে যাবে।

একজন কর্মীর মধ্যে দুইটা উদ্দেশ্য বা ধারনা থাকে যা কর্মীকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হয়। একটা হলো জব (ঔড়ন) আর অন্যটি হলো সার্বিস (ঝবৎারপব). জব হলো সাধারণ ভাষায় চাকরী করা। আমি পরিশ্রম করি পরিবর্তে আমি পারিশ্রমিক পাই। এই পারিশ্রমিক দিয়ে আমি এবং আমার পরিবার বেঁচে থাকি। আমি খুব সংকীর্ণ অর্থে বলছি যে, এই পরিশ্রম এবং পারিশ্রমিক ছাড়া আমার দায়িত্বের মধ্যে আর কোনো ধারণা নাই। ঝড় এলো আমি ইচ্ছা করলে নৌকাটা রক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু এই ঝুকি নেওয়ার কী দরকার। নাও যাবে নাইয়ার আর মাল যাবে মহাজনের। এটাকেই আমি বলতে চাই জব। আমি পারতাম কিন্তু কী দরকার।

অন্যদিকে সার্বিসটা হলো আমার কাজের পাশাপাশি যখন সেবাটা আমি উপলব্ধি করতে পারি। এই সার্বিসের মধ্যে দুইটা ধারণাই একসাথে আছে। চাকরী এবং সেবা। আমার কর্মের সঙ্গে যখন সেবা যোগ হয় তখনই আমি হয়ে উঠি একজন আধ্যাক্তিক কর্মী। তখন শুধু আমার দায়িত্ব পালনটা মূখ্য থাকে না, কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যোগ হয় আধ্যাক্তিকতা। আর এই আধ্যাক্তিকতা কর্মীর সেবাকর্মের মধ্যদিয়ে যখন প্রকাশ পায়, তখনই বিশ্বে একজন মানুষের আগমন সার্থক হয় এবং সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায় পূর্ণ হয়।

মানুষের মধ্যে সেবার মনোভাব না থাকলে শুধু শুধু দায়িত্ব পালন করে কোনোদিনও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। বিষয়টি এভাবে বলতে চাই যে, সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্টির পুরোটা কিন্তু শেষ করে ফেলেননি। বরং তার এই অসমাপ্ত সৃষ্টিকে যেনো মানুষের প্রয়োজনে মানুষই ফের সৃষ্টি করে যেতে পারে সেই সম্ভাবনা মানুষের হেফাজতে দিয়ে রেখেছেন। বিশ্ব সৃষ্টিতে বা প্রকৃতিতে যে সব উপাদান সৃষ্টিকর্তা উপহার দিয়েছেন বকা তার হেফাজতে রেখেছেন, তা মানুষ প্রয়োজনে আহরণ করে মানুষকে সেবা করতে পারে। এখানে অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেমন- গাছ থেকে আসবাবপত্র ইত্যাদি। আমি একজন কর্মী হিসেবে সেবার মধ্যদিয়ে নতুন নতুন সৃষ্টি করতে পারছি কিনা, একদিন সৃষ্টিকর্তার কাছে সেটার জবাবদিহি করতে হবে। দার্শনিক সাধু টমাস আকুইনাস বলেছেন, ‘তুমি যদি পৃথিবীতে সৃষ্টিসেবা করে যেতে না পারো- তোমার জন্য স্বর্গের দরজা বন্ধ থাকবে।’ সাধু পল বলেছেন, ‘তুমি যদি কাজ না করো তবে তোমার আহার করার অধিকার নেই।’ তুলনামূলকভাবে বলা যায় যে, চার্চকর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ভালো চলার মূখ্য কারণ হলো- কর্মীর মধ্যে কাজ/পরিশ্রম এবং সেবা দুটোই বিদ্যমান থাকে। পাঠকদের প্রতি রইলো শুভেচ্ছা।

লেখক : পরিচালক, রেডিও জ্যোতি, বগুড়া সিটি, বাংলাদেশ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]