কী দোষ ছিলো শিশু সাফায়াতের?

আমাদের নতুন সময় : 07/12/2018

মাহফুজা অন্যান্য

গত কয়েকদিন ধরে
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী
অধিকারীর আত্মহত্যার খবরে মন অনেকটা বিষাদগ্রস্ত, মন থেকে সরাতে পারছি না মিষ্টি মুখের ছবিখানি। কিশোরী এক মেয়েকে ক্ষমা করতে পারেননি শিক্ষকেরা। বোঝেনি ওর বয়ঃসন্ধি মনোভাব। আর তাই পুরো পৃথিবীকে থোড়াই কেয়ার করে বুঝিয়ে দিলো অরিত্রীরা কারো শাসনের ধার ধারে না! এই বয়সী ছেলেমেয়েরা একটু জেদি হয়, হয় ভীষণ অভিমানী। আমরা কেউ কখনোই তা ভেবে দেখিনি! ঘরে বাইরে তাদের ভুলে আমরা সবসময়ই কড়া শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে থাকি। এমন ব্যবহার করা হয় যেন আমরা কেউ কোনোদিন ভুল করে শিখিনি। যে এই বয়সে জীবনে ভুল না করেছে সে কি করে শিখেছে, সে কি করে বড় হয়েছে? মনে কতো কি প্রশ্ন,শুধু কি অরিত্রীরাই ভুল করে, আমাদের কি কোনো ভুল নেই? যে স্কুলে মোবাইল অ্যালাউড নেই, তবে কি করে মোবাইল নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকলো অরিত্রী? দায়িত্বরত শিক্ষক কীভাবে তার দায় এড়াবেন? এই যে দেশে বড় বড় কতো অনৈতিক ঘটনা ঘটছে এগুলো নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত পদের লোকজন কতোটুকু ভাবছে? কতোটুকু সমাধান দিতে পারছে? এক শ্রেণির মানুষ শুধু ক্ষমতা দেখাতে পারেন কোমলমতি নারী ও শিশুদের উপর। তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে তারা তাদের ক্ষমতা প্রকাশ করে। এছাড়া তাদের আর কোনো যোগ্যতা নেই!
এসব ঘটনা মাথায় একবার ঢুকলে কোনোকিছুতেই ভোলা যায় না সহজে। আমার এমন স্বভাবের জন্য কাছের মানুষেরা সবসময় বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াই। আমার নাকি সুখে থাকতে ভূতে কিলায় স্বভাব। নিজের সংসার ফেলে লোকের চিন্তা করে বেড়াই আমি। কেউ কি আমাকে খেতে দেয়, পড়তে দেয় আরো কতো কি শুনতে হয় রোজ…।
মাঝেমাঝে তারা আমাকে বিপুল আয়োজনে শিক্ষা দিতে আসে। আমি নাকি অতীত ভুলতে পারি না! তারাও আমাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে মানসিক নির্যাতন করে। আর সে কথা বলতে গেলেই বলে ‘ভুলে যাও সব, এটা তো গতকালের ঘটনা’!
গতকালের ঘটনা কি আজ ভোলা যায়? চাইলেই কি সব ভোলা যায়? আজও লিখছি গতকালের ঘটনা! কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কী দোষ ছিলো নিষ্পাপ শিশু সাফায়াতের? যাকে পিতার হাতে জীবন দিতে হলো? কেন ওর মাকে হারাতে হলো ছোট্ট চোখের মণিকে? কেউ কি পারবে ওর মায়ের বুকে সন্তানটি ফিরিয়ে দিতে? কেউ কি পারবে তার প্রিয় সন্তানকে এভাবে হারাতে?
বলছি বুধবার বাংলামোটর এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটির কথা। শিশুটির পিতা নাকি নেশাগ্রস্ত, মাতাল। দুইটা বিয়ের পরও একটা স্ত্রীও টেকেনি। তার মাতলামি, অত্যাচার, নিপীড়ন,নির্যাতনের জন্য স্ত্রী দুজনই চলে গেছে। অবশেষে মাদকাসক্ত বাবার অযতেœর শিকার হয়ে জীবন দিতে হলো তিন বছরের নিষ্পাপ এক শিশুর।
আমার প্রশ্ন হলো ওই মাদকাসক্তের বাবা, মা, ভাই-বোন, আত্মীয়রা কেউ কি জানতেন না লোকটি মাদকাসক্ত? কেন তারা ঘটনাটি গোপন করে একটা জীবন কেড়ে নিলো? কেন তারা একটি পরিবার ধ্বংস করলো? যার দুইটা স্ত্রী (চলে গেছে) তারা কি কখনও মাদকাসক্তের মা, বোন, ভাইকে জানায়নি তার ছেলে অথবা ভাই মাদকাসক্ত? অবশ্যই তাদের জানার কথা। জানার পরও কেন তারা দায়িত্ব নিয়ে তার সুচিকিৎসা করায়নি? কেন ছোট ছোট দুটো বাচ্চার নিরাপদ আশ্রয় দেয়নি তারা? বাচ্চা দুটিকে তাদের মায়ের কাছে কেন পাঠানো হয়নি?
জেনেশুনে বাচ্চা দুটিকে মাদকাসক্তের কাছে রেখে সকলেই বড় ধরনের অপরাধ করেছে। একজন অসহায় নারী যার সম্বল শুধু দুটি সন্তান তার একটি সন্তান অবহেলা আর অযতেœ মেরে ফেলার অপরাধে মাদকাসক্ত এবং তার পরিবার সমানভাবে দায়ী।
চার দেয়াল আমাদের যেমন নিরাপত্তা দেয়, আবার কখনও কখনও চার দেয়াল আমাদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়। একজন মাতালের কাছে চার দেয়াল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অপরপক্ষে অসহায় মানুষগুলো চার দেয়ালের ভেতরই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ওই পরিবারটির অন্য সব সদস্য যদি একটু সচেতন হতো কিংবা আত্মীয়-স্বজন বাচ্চা দুটির কথা ভাবতো তাহলে হয়তো মাদকাসক্তের স্ত্রী ও সন্তানেরা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতো। মাতাল লোকটিকেও সুচিকিৎসা করে সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যেতো। এজন্য দরকার কাছের মানুষদের সচেতনতা, সহানুভূতি ও সহযোগিতা। কাছের মানুষগুলো আগে থেকে একটু পাশে দাঁড়ালেই হয়তো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতো একটি পরিবার। আসুন, আমরা সকলেই সকলের পাশে দাঁড়াই…।
লেখক : শিক্ষক ও কবি




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]