হুমায়ূন আহমেদের অসমাপ্ত রচনা ‘নবীজি’

আমাদের নতুন সময় : 07/12/2018

(পূর্বে প্রকাশের পর)

তখনকার আরবে অভিজাত মহিলারা নিজের শিশু পালন করতেন না। শিশুদের জন্যে দুধমা ঠিক করা হতো। দুধমা’রা আসতেন মক্কার বাইরের বেদুইনের ভেতর থেকে। দুধমা’র প্রচলনের পেছনে প্রধান যুক্তি, আভিজাত্য রক্ষা। দ্বিতীয় যুক্তি, শিশুরা বড় হতো মরুভূমির খোলা প্রান্তরে হেসে-খেলে। এতে তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকত। অর্থনৈতিক বিষয়ও মনে হয় ছিল। সম্পদের বণ্টন হতো। হতদরিদ্র কিছু বেদুইন পরিবার উপকৃত হতো শহরের ধনীশ্রেণীর কাছ থেকে। অতি ভাগ্যবানদের কেউ কেউ মরুভূমির সবচেয়ে দামি উপহার এক-দুইটা উট পেয়ে যেত।

নবীজীর জন্যে দুধমা খোঁজা হতে লাগল। আমিনার আ. অর্থনৈতিক অবস্থা তখন শোচনীয়। সম্পদের মধ্যে আছে মাত্র পাঁচটা উট এবং একজন মাত্র ক্রীতদাসী। ক্রীতদাসীর নাম ‘বাহিরা’। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু পরিবারের এতিম ছেলের জন্যে কে আসবে দুধমা হিসেবে!

নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র প্রথম দুধমা’র নাম আইমান। তিনি আবিসিনিয়ার এক খ্রিষ্টান তরুণী। অনেক পরে এই মহিলার বিয়ে হয় যায়েদ বিন হারিস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সঙ্গে। যায়েদ বিন হারিস রদ্বিয়াণল্লাহু তায়ালা আনহু নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পালকপুত্র ছিলেন।

আইমানের পরে আসেন থুআইবা। তৃতীয়জন হালিমা। যিনি বানু সাদ গোত্রের রমণী। নবীজীর দুধমা হিসেবে আমরা হালিমা রা. কেই বেশী জানি। আগের দু’জনের বিষয়ে তেমন কিছু জানি না।

হালিমা রা. আনহার অবস্থাটা দেখি। বানু সাদ গোত্রের সবচেয়ে দরিদ্র মহিলা ছিলেন তিনি। ঘরে তার নিজের খাওয়ারই ব্যবস্থা নেই। বুকেও দুধ নেই যে নিজের শিশুটিকে দুধ খাওয়াবেন। মক্কায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তিনি দত্তক নেওয়ার মতো কোনো শিশু পেলেন না। কে এমন দরিদ্র মহিলার কাছে আদরের সন্তান তুলে দেবে! প্রায় অপারগ হয়েই তিনি মহাসম্মানিত শিশু মুহম্মদকে নিয়ে নিলেন।

পরের ঘটনা নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনীকার ইবনে ইসহাক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ভাষ্যে শুনি- ‘মা হালিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন. যেই মুহূর্তে আমি এই শিশুটিকে বুকে ধরলাম, আমার স্তন হঠাৎ করেই দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি তৃপ্তি নিয়ে দুধ পান করলেন। উনার দুধভাইও তা-ই করলেন। দুজনই শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন। আমার স্বামী উঠে গেলেন মেয়ে উটটাকে দেখতে। কী আশ্চর্য, তার শুকনো ওলানও দুধে পরিপূর্ণ। আমার স্বামী দুধ দুয়ে আনলেন। আমরা দুজন প্রাণভরে সেই দুধ খেয়ে পরম শান্তিতে রাত্রে ঘুমালাম।

পরদিন সকালে আমার স্বামী বললেন, হালিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, আপনি কি কিছু বুঝতে পারছেন? আপনি এক পবিত্র শিশুকে (ইষবংংবফ ঙহব) ঘরে এনেছেন?’ মহাসম্মানিত শিশু মুহম্মদ ছল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুধভাইয়ের নাম আবদুল্লাহ রা.। আবদুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর তিন বোন- শায়মা, আতিয়া ও হুযাফা। বোন শায়মা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা সবার বড়।

শিশু মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উনার বড়ই পছন্দ। সারা দিনই তিনি চাঁদের তুকরা শিশু কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এখানে-ওখানে চলে যান। একদিন বিবি হালিমা রা. মেয়ের উপর খুব বিরক্ত হলেন। মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন, দুধের শিশু কোলে নিয়ে তুমি প্রচন্ড রোদে রোদে ঘুরে বেড়াও। এটা কেমন কথা! বাচ্চাটার কষ্ট হয় না!

শায়মা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তখন একটা অদ্ভুত কথা বললেন। তিনি বললেন, মা, আমার এই ভাইটার রোদে মোটেও কষ্ট হয় না। যখনই আমি উনাকে নিয়ে ঘুরতে বের হই, তখনই দেখি আমাদের মাথার উপর মেঘ। মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখে।

নবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেঘের ছায়া দান বিষয়টি জীবনীকার অনেকবার এনেছেন। উনার চাচা আবু তালেবের সঙ্গে প্রথম সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রাতেও মেঘ উনাকে মাথায় ছায়া দিয়ে রেখেছিল।

(এখানেই লেখাটি সমাপ্ত হয়েছে। ক্যান্সার আক্রান্ত হুমায়ূন আহমেদ দুর্ভাগ্যবশত শেষ করে যেতে পারেননি তার দীর্ঘদিনের আকাঙ্খিত বইটি। অসমাপ্ত এবং অপ্রকাশিত রেখেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।)




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]