সময়ের বিকল্প ভাবনা

আমাদের নতুন সময় : 25/12/2018

ফাদার সুনীল রোজারিও

মানুষের বয়স বেড়ে গেলে ফেলে আসা দিন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে ভালোবাসেন, আবার অতীত-বর্তমানের তুলনাও করে থাকেন। সেকালেরটাই ভালো ছিলো- এমন মন্তব্যও করেন। আমি তার থেকে মোটেও আলাদা নই। সেকালের বড়দিন আর একালের বড়দিন উৎসব পালনের মধ্যে তফাৎ আছে। ঐ যে বললাম, সেকালেরটাই ভালো ছিলো- আমি কিন্তু সেই দলের। বছরের শেষ, ‘সময়ের বিকল্প ভাবনা’ কলামে সেই ব্যক্তিগত ভাবনাটাই পাঠকদের দিতে চাই। সেই ভালো ছিলো তার মেলা কারণ দেখাতে পারি। সেদিনের বড়দিন আমরা উদ্যাপন করতাম, দেহ-মন-অন্তর দিয়ে ধারন করে। বড়দিন শুর হতো কমপক্ষে এক মাস আগে। মা বলতেন, বিলের তলা থেকে কালো মাটি আনতে হবে। পাড়ার কয়েকজন মিলে রওনা হতাম চলন বিলের দিকে। সেই কালো মাটি দিয়ে বাড়ির বৌ-ঝিরা বেড়া, পিড়া, ঢোয়া লেপা পোছা করতেন। মাটির রং আলাদা হওয়ায় তারা এক ধরনের ডিজাইনও তৈরি করতেন। পিড়া-বেড়ায় ফুল আঁকার মূল রং ছিলো বাজারের নীল, ইটের ভাটার লাল ইট এবং সবুজ রংয়ের জন্য সীমের পাতা। বৌ-ঝিরা রাত জেগে নিখুঁতভাবে বেড়া পিড়ায় ফুল আঁকতেন। আমরা ছোটোরা রাত জেগে বৌদির হাতে ধরা পাঠ সোলার ব্রাশের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। এদিনের আর্ট কলেজে পড়া বৌ-ঝিরা পিড়া বিয়েয় ফুল আঁকেন না। এখন অঁজ-পাড়া গায়ের বাজারেও বড়দিনের নক্সা কিনতে পাওয়া যায়। বৌ-ঝিদের কাজে একটা বাড়তি আনন্দ ছিলো, আর তা হলো একটা নীলাম্বরী বা টিয়া রংয়ের শাড়ির আবদার। বাজারে তাঁতের বোনা এই নীলাম্বরী এবং টিয়া রংয়ের আর কোনো বিকল্প ছিলো। আর আমাদের বেলায় কোনোবার একটা ইংলিশ প্যান্ট বরাদ্দ হতো। নতুবা দাদার ছোটো হয়ে যাওয়া প্যান্ট শার্টটা নিয়েই খুশি থাকতে হতো। বড়দিনের কিছুদিন আগে যমুনা পাড় থেকে আনার আলী নামে একজন বাইদ্যা আসতো। বৌ-ঝিদের কাছে ছিলো প্রিয় এই আনার আলী। আনার আলী নিজেই বাছাই করে দিতো কাঁচের চুড়ি কার হাতে কী রং মানাবে। নিজের নিখুঁত হাতে চুড়ি করাতে গিয়ে বেশ কিছু ভাংতো।
বাড়ির কর্তা-কর্তীরা ভালোই জানতেন কোন ধানের পিঠা ভালো হয়। তাই আমন ধান ঘরে ওঠলে আলাদা জাতের কিছু ধান আলাদা করে রাখা হতো পিঠার গুড়ির জন্য। পিঠার ধান না থাকলে পাড়ার কারো বাড়ি থেকে ধান বদল করে আনা হতো। আজকের দিনে ঐসব ধান নিখোঁজ হয়ে গেছে। প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকী ছিলো। রাত যতো গভীর হতো, দূর থেকে ভেসে আসতো ঢেঁকীর শব্দ। এখনকার বৌ-ঝিরা ঢেঁকীতে পা দেবে না। ঢেঁকী এখন আসলেই স্বর্গে চলে গেছে। এখন ধান বানার মোবাইল কল বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভানে। কোনো কোনো বাড়িতে দেখেছি ব্লেন্ডার দিয়ে চালের গুড়ি তৈরি করতে।
আমাদের এলাকায় জসীম গাছির খুব সুনাম ছিলো। পদ্মা পাড়ের এই লোকটি প্রতি বছর শীতের শুরুতে দল বল নিয়ে খ্রিস্টান পাড়ায় হাজির হতো। খেজুর গুড়ের গ্রামের পুরো অর্ডারটা তাকেই সামলাতে হতো। তার কাছে ঝোলা এবং পাটালি এই দুই ধরণের গুড়ই পাওয়া যেতো। এলাকায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিলো। এখন আর নেই। তখনকার সেই গুড়ে কোনো ভেজাল ছিলো না। আর এখন বাজারে বিশুদ্ধ গুড় পাওয়াই দায়। গুড়ে যে এখন কতো উপাদান মেশানো হয় তা না দেখলে অনুমান করা যাবে না।
দুইটা কলাগাছ আগে থেকেই পছন্দ করে রাখা হতো। বড়দিনের পুরো এক মাসের নানা প্রস্তুতির পর ২৪ তারিখের জন্য যে কাজটি বাকি থাকে তা হলো কলাগাছ কেটে বড় ঘরের সামনে আর্চ তৈরি করা। কলা গাছের গায়ে গাঁদা ফুল ও লাল-নীল কাগজ দিয়ে সাজানো হয়। একটা গাছের মাঝামাঝি দুইটা কাঠি পুঁতে তার উপর বসিয়ে দেওয়া হতো মাটির মুছি। সন্ধ্যা হলেই মুছিতে সরষের তেল ঢেলে বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। কারণ ঐ আলো দেখে শিশু যীশু ঘরে আসবেন। বাড়ির কর্তীরা ততক্ষণে পিঠা তৈরির আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পিঠাতে যেনো বদচোখ না লাগে সেজন্য সাবধান থাকতেন- কোন বাড়ির কে কখন কীভাবে এসে পড়ে। হেঁশেলে আমাদের ছোটোদেরও যাওয়া বারণ ছিলো। মধ্যরাতের মিসা ঠিক মধ্যরাতেই শুরু হতো। একালের মতো সেকালে পুলিশ পাহারার কোনো ঝামেলা ছিলো না। কোনো অঘঠন ঘটছে বলে মনে পড়ে না। ২৫ তারিখ সকালের মিসার পরই আপনা থেকে শুরু হয়ে যেতো কীর্তন প্রতিযোগিতা। এরপর কীর্তন দল যার যার মতো ছড়িয়ে পড়তো নিজের মিশন ছাড়িয়ে অন্যান্য মিশনে। তিন/চারদিন পর বাড়তি ফিরতো। বড়দিনের কীর্তন এখন হারানোর পথে। মিশনে গণ প্রধানের বৈষম্য থাকার কারণে বৈঠকী সমাজও বিভক্ত ছিলো।
তবুও বড়দিনে বৈঠক খাওয়া ছোটোদের জন্য ছিলো মহা আনন্দের। এবাড়তি থেকে সেবাড়ি যাওয়ার পথে ঢোলটা কাঁধে নিয়ে বেসুরা তালে বাজানোর একটু সুযোগ পেতাম। এই সেই করতে করতে এক সময় পেশাদারি ঢোলক বাদকও হয়ে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন ধরে বৈঠকী আয়োজন চলার পর এক দুইটা বাড়ি রেখে দেওয়া হতো তিন রাজার পর্ব দিনের জন্য। পূর্ব দেশীয় তিন পন্ডিতের পর্ব দিনের মধ্যদিয়েই শেষ হতো বড়দিনের উৎসব।

ফিস ফিস করেই কথাটা বলতে চাই- সেকালে খুব কমই দেখেছি বৈঠকে বসে নেশা করতে। অন্দর মহলে ডেকে বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে হয়তো সামান্য পরিবেশন করা হতো কিন্তু প্রকাশ্যে নয়। বৈঠক খেতে গিয়ে কেউ মাতাল হয়ে পড়েছে সেকালে এমনটি কখনো দেখেনি। কিন্তু একালে এখন নেশা খাওয়া ও মাতাল হওয়া খুব স্বাভাবিক কান্ড হয়ে গেছে। ফলে হট্রোগল হাঙ্গামাও ঘটে। গ্রামে মুরুব্বী আর নেই। চাকুরিজীবী, যুব সমাজ ও মধ্যবয়সীরাই এখন আয়োজক। একালে বড়দিনের পুরো বাজেটের মধ্যে বোতল সংস্কৃতি একটা বড় হিসাবের খাত। এইসব কারণ ও অকারণে সেকালের বড়দিনই আমার কাছে ভালো ছিলো। পাঠকবৃন্দ সবাই ভালো থাকুন। সবার প্রতি রইলো বড়দিনের শুভেচ্ছা।
লেখক: পরিচালক, রেডিও জ্যোতি, বগুড়া সিটি, বাংলাদেশ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]