বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বমানবতার ধর্ম

আমাদের নতুন সময় : 26/12/2018

সুখোময় বড়ুয়া

বুদ্ধের জীবন ও দর্শনের মূল বাণী হলো করুণা- মৈত্রী ও অহিংসা। তিনি আজীবন মানুষের দুঃখ-মুক্তিরই সাধনা করেছেন। এই মহাজ্ঞানীর জীবন দর্শনে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার আলোয় অহিংসা, সাম্য ও বিশ্বমানবতার অপরিমেয় মৈত্রীর হিরন্ময় প্রকাশ, যুক্তি আর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত সত্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। তার সাধনালদ্ধ মহাসত্যগুলোর মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব নেই, ঈশ্বর কিংবা দেবতার করুণায় অর্জিত হয়নি আধুনিক বিজ্ঞান মনস্ক ধর্ম। সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতা ও সাধনায় বুদ্ধ অর্জন করেছেন বোধি, যেখানে অন্ধবিশ্বাসের অনুপস্থিতি ও যুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বজ্ঞানের বিশ্লেষণ। তার ধর্মে আছে যুক্তি, আত্মপলদ্ধি-আত্মজিজ্ঞাসা-আত্মত্যাগ, নিজেকে জানার, নিজেকে বিচার করার অনন্য শিক্ষা।
বুদ্ধের মতে, জগতের প্রত্যেকটি জিনিস কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোনো বস্তু স্বয়ং উৎপন্ন হয় না। একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনা থেকে সংঘটিত হয় ও বিস্তার লাভ করে। সবকিছুর উৎপত্তি কোনো ঘটনা থেকে। তিনি তার আবিষ্কৃত ধর্ম কার্যকারণ নীতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এ নীতির প্রেক্ষাপটে বুদ্ধ তার সত্য-সন্ধানীর দৃষ্টিতে জীবন জগতকে অবলোকন করেছেন। তিনি দুঃখের স্বরূপ নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন-‘জীবন দুঃখময়, এ দুঃখের কারণ আছে, এ দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়ও আছে। তার মতে, জগতে সবকিছু পরিবর্তনশীল, বিশ্ব আবর্তিত হচ্ছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তরে এবং জীবন এক অবিরাম নদীর চিরন্তন বয়ে চলা অন্তহীন স্রোত, যেখানে আর্বিভাব ও তিরোভাব জাগতিক নিয়মে ঘটে। এ জগত অনিত্য, এ জীবন অনিত্য এবং কোনো কিছুই অবিনশ্বর নয়।’
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত ধর্ম-মত-পথের অবতারণা হয়েছে, তার মধ্যে গৌতমবুদ্ধ সৃজিত জীবন পরিচালনার রীতি-নীতি ও আদর্শের ধর্মেই রয়েছে আগামী দিনের ‘কসমিক রিলিজিয়াস’র নির্যাস।’ আইনস্টাইন আরও বলেছেন, ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনের গ্রহণীয় যদি কোনো ধর্ম থাকে, তা বৌদ্ধধর্ম।’ যেখানে রয়েছে, পৃথিবীর সৃষ্টি, আদি এবং অন্তের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা মানুষকে নিজের চিত্তের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্বাণের পথে নিজেকে নিয়ে যেতে শেখায়। বুদ্ধ বলেছেন, ‘আমার শিক্ষা জ্ঞাণীদের জন্য। তুমি যদি নিজের মন দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে সেগুলো সঠিকভাবে পড়তে জানো তবে তুমি এই মহাবিশ্বের প্রকৃত শিক্ষা পাবে।’
বৌদ্ধধর্ম প্রাকৃতিক এবং আত্মিক দুটি ধারণাকেই অর্থপূর্ণভাবে একীভূত করতে পেরেছে, যা প্রাকৃতিক ও আত্মিক দু’ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতালদ্ধ জ্ঞান থেকে তৈরি ধর্মীয় অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন হচ্ছে সমগ্র প্রকৃতিকে ভালোবাসারই একটি নামান্তর। অন্যদিকে ধ্যান এবং বুদ্ধের নীতি অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে বা নিজের চিত্তকে জয় করা, অজ্ঞানতাকে দূর করে নিজের মাঝে লুকায়িত পরম জ্ঞান বিশালতাকে আবিষ্কার করা হচ্ছে আত্মিক ক্ষেত্র। মানবমুক্তির দুঃসাহসিক অভিযানে মহামানব বুদ্ধের গয়ার বোধিবৃক্ষমূলে বুদ্ধত্ব লাভ, সারনাথে ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের দেশনার মাধ্যমে জ্ঞানীর ধর্মের সূচনা, অপার মৈত্রী, করুণা, অপ্রমেয় বিশ্বপ্রেম ও মানব কল্যাণের বাণীর প্রচার একটি বর্ণিল মহাকাব্য, একটি ইতিহাস, একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল ধর্মের গোড়াপত্তন। বুদ্ধ বলেছেন, ‘অপ্রমত্ত হও, আত্মদীপ হয়ে বিহার করো।’ আত্মদীপ প্রজ্জ্বলিত করে নিজের মুক্তির জন্য কুশলকর্ম সম্পাদন করো, আত্মশরণ নাও, অন্যের ওপর নির্ভর করো না, নিজেই নিজের প্রদীপ হও। নিজের মুক্তির জন্য ঈশ্বর মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের কর্মসাধনায় আত্মনিয়োগ করো।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]