বৌদ্ধ মধুপূর্ণিমা দান, ত্যাগ, সেবা ও মানবতার শিক্ষা

আমাদের নতুন সময় : 26/12/2018

ড. সুকোমল বড়ুয়া

ভাদ্রপূর্ণিমা তিথিই বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে মধুপূর্ণিমা নামে পরিচিত। বৌদ্ধরা এদিন বিহারে গিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু এবং নানা ধরনের পুষ্প, ফল ও খাদ্য ভোজ্যাদি দান করে থাকেন।
বিশেষ করে বৌদ্ধ বালক-বালিকা, শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী ও বৃদ্ধ-প্রৌঢ়সহ সব শ্রেণীর নর-নারীরা এ দিন বৌদ্ধ বিহারগুলোতে গিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু দান করার উৎসবে মেতে ওঠে। এ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিটি বৌদ্ধবিহার ও বিহারের প্রাঙ্গণগুলো মধুদানের এক আনন্দঘন পরিবেশে মুখর হয়ে ওঠে।
বুদ্ধের অপরিসীম মৈত্রী প্রভাবে এই দিনে বনের পশুপাখি ও জীবজন্তুরা তাদের স্বভাবজাত হিংস্রতা পরিহার করে মহামানব বুদ্ধকে অহিংসা, দান, সেবা ও শ্রদ্ধার আদর্শ প্রদর্শন করেছিল। এমনকি অরণ্যের বন্য হস্তীসহ সেখানকার নানা ধরনের পশুপাখি ও জীবজন্তু বুদ্ধকে নানাভাবে তিন মাস সেবাযতœ করেছিল।
ভাদ্র মাসের এই পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধজীবনের বানরের মধুদানের এক বিরল ঘটনা জড়িয়ে আছে। সে দিনের বানরের এই মধুদান একটি নিছক ঘটনা মনে হলেও এর থেকে আমরা একটি পশুর ত্যাগ, সেবা ও দানচিত্তের এক মহৎ শিক্ষা পেয়ে থাকি।
বনের একটি বানর হয়ে বুদ্ধকে দান দিয়ে যেখানে তার মহৎ উদার ও ত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে, সেখানে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হয়েও বিপন্ন মানুষের প্রতি সেই উদারতা, ত্যাগ, দান, সেবা দেখাতে পারছি না। পারছি না মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মৈত্রী, করুণা, দয়া প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলির আদর্শ ও আচরণ দেখাতেও।
আজ মানুষের প্রতি মানুষের সেবা, দান, ভালোবাসা ও সহানুভূতি তেমন নেই বললেই চলে। মানুষের আর্তনাদ ও অভাব-অনটন দেখেও মানুষ তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায় না। মানুষ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শন করছে না। মানুষ মানুষের জীবন সংহার করছে দেখেশুনে। মানুষ যেন তার মানবিক গুণাবলি থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। এটাই কী মানুষের ধর্ম?
মানুষের প্রেমভরা হৃদয় যেন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। এ রকম হওয়ার তো কথা ছিল না। যেখানে বনের একটি বানর বুদ্ধকে মধু দান করে তৃপ্তি পেয়েছে, আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে; এমনকি বন্য হস্তিও যেখানে বুদ্ধকে তিন মাস সেবা করে অপার আনন্দ অনুভব করেছে, সেখানে আমরা জীবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও মানুষের প্রতি সেই দান, ত্যাগ, ভালোবাসা দেখাতে পারছি না। এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে?
আজ বিবেকের কাছে প্রশ্ন জাগে আমরা কি দান দিয়ে, মানুষকে সেবা দিয়ে এবং অপার ত্যাগে আমাদের চিত্তকে কি প্রীতিতে প্রসারিত করতে পারি না? আমরা কি পারি না অসহায়, নিঃস্ব, হতদরিদ্র এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি মৈত্রী, করুণা ও ভালোবাসায় আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করতে? আজ বাংলাদেশসহ বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে এমন প্রশ্নগুলোই আমাদের বারবার ভাবিয়ে তুলছে।
শুভ মধুপূর্ণিমা আমাদের সেই মহৎ শিক্ষাই দিচ্ছে- আমরা যেন আমাদের মানবীয় গুণাবলিতে পুনঃরুজ্জীবীত হই, সিক্ত হই এবং দানে, ত্যাগে ও পরপোকারে বিশ্ব মানবতায় এগিয়ে যাই।
অতএব, বৌদ্ধদের এসব পূজা-পার্বণ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আমরা মানুষের জন্য, বিশ্ব মানবতার জন্য নানা ধরনের দান, সেবা ও ত্যাগের মহৎ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, যেখানে আমাদের সব ধরনের সংকীর্ণতা এবং হিংসা, দ্বেষ, লোভ ও চিত্তের হিংস তা দূরীভূত হয় এবং মৈত্রী, দয়া, দান, সেবা, উদারতা প্রভৃতি মানবিক গুণাবলিতে আমাদের চিত্ত যেন করুণাসিক্ত হয়। এগুলো ধর্মের সর্বজনীন শিক্ষা।
এ জন্যই বুদ্ধের শিক্ষা হল জীবনের সব ক্ষেত্রে অকৃত্রিম উদার চিত্ত হওয়া, বিবেক-বুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলা এবং দান-ত্যাগ-সেবায় নিজকে পরিপূর্ণ করা। কারণ অজ্ঞানতা, মূর্খতা মানুষের কখনও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মন্দ ও অকুশলকর্মে মানুষ কখনও মহৎ হতে পারে না। এমনকি এসব অপকর্মে দেশ ও সমাজ কখনও উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগোতে পারে না। পারে না বিশ্ব মানবতাকে উপকৃত করতে। অন্ধকার দিয়ে যেমন আলোকে আহ্বান করা যায় না, তেমনি অকুশল এবং মন্দকর্ম দিয়ে কখনও সৎ, শুভ ও মঙ্গলকে আলিঙ্গন করা যায় না। এটাই হচ্ছে বৌদ্ধ যুক্তিবিজ্ঞানের মূল কথা। অতএব, চলুন আমরা আজ মহামতি বুদ্ধের এই শিক্ষা থেকে জীবন প্রতিষ্ঠার সব গুণ ও আদর্শ গ্রহণ করি। দান, সেবা ও ত্যাগে জীবনকে মহিমান্বিত করি। বিদ্যা ও জ্ঞানে আমাদের জীবনকে ধন্য ও সার্থক করি।
লেখক : প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]