মানুষের স্বীয় কর্মই দুঃখ মুক্তির একমাত্র পথ

আমাদের নতুন সময় : 26/12/2018

মিলন চাকমা

প্রাচীন যুগের মানুষ হয়েও বুদ্ধ ছিলেন কর্মবাদী, আধুনিক ও মুক্তচিন্তার মানুষ। কারণ, কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে কঠোর সাধনার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন বোধিজ্ঞান। বুদ্ধ কখনও জন্মকে প্রাধান্য দেননি। জীবনকে পরিচালিত করার জন্য মানুষের স্বীয় কর্মই অন্যতম। তাই অদৃষ্টবাদ বা ঐশ্বরিক শক্তির ওপর কর্ম পরিচালিত হয় না। চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিশুদ্ধ চিত্ত, নৈতিক বিবেচনায় জীবনের গতিপথকে সৎকর্ম সম্পাদনে উজ্জীবিত করা যায়। অশুভ কর্মকে বর্জন করে সৎকর্মকে পাথেয় করে মুক্তির পথ অন্বেষণে মনুষ্য জন্মকে দুর্লভ করার সার্থকতা। নিজ কর্মের দ্বারা মানুষ স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অরহত ফল লাভ করতে পারে এমনকি নির্বাণ সাক্ষাতের পথে আলোকময় অভিযাত্রায় সামিল হওয়া যায়।
বুদ্ধ মানুষের অসীম শক্তি, একাগ্রতা, অধ্যবসায় নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন, মানুষ নিজেই নিজের আশ্রয়, অন্য আশ্রয় আর কি থাকতে পারে? নিজেকে সুসংযত করলেই দুর্লভ আশ্রয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ সুসংযত জীবন পরিচর্যা মানে বুদ্ধ নির্দেশিত একটি আলোকিত পথের সন্ধান, যা মধ্যম পথ বা পালিতে ‘মজঝিম পটিপদা’। মধ্যমপথ বলতে চরমসুখ ও চরম কৃচ্ছতা সাধন বা আত্মনিগ্রহের মাঝামাঝি পথ। বুদ্ধ কোনো চরমপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বনকেই সঠিক মনে করতেন। বোধিপ্রাপ্তির লক্ষ্যে কঠোর তপস্যাকালীন সময়েই এ জ্ঞান প্রাপ্ত হন তিনি এবং এই মধ্যমপথ অবলম্বনের মাধ্যমে বুদ্ধ আলোকপ্রাপ্ত হন। এই পথেই জীবন পরিচালনা করা উত্তম মঙ্গল।
বুদ্ধ দুঃখ মুক্তির জন্য আটটি পথ বা মার্গ অনুসরণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন, যা তিনটি স্কন্ধের অর্ন্তগত- শীলস্কন্ধ, সমাধিস্কন্ধ এবং প্রজ্ঞাস্কন্ধ। আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গের তিনটি মার্গকে শীলের মূল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই তিনটি হলো- সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম ও সম্যক জীবিকা। তিনটি মার্গকে সমাধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হলো- সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। দুটি মার্গকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রজ্ঞা হিসেবে। প্রজ্ঞার এ দু পথ হলো- সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সঙ্কল্প। তাই সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধিকে অষ্ট বিশুদ্ধ পথ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সুতরাং নীতি, আর্দশ, মানবিক মূল্যবোধের জীবনাচরণে মানুষকে কর্মে, মননে, চিন্তাচেতনায় শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনে নিজেকে সমর্পণ করে বুদ্ধ নির্দেশিত অষ্টমার্গে নিজেকে উৎসর্গ করলে জীবন সুন্দর ও পরিপূর্ণতা লাভ করে, অনির্বাণ চেতনায় জাগ্রত থেকে মানুষ পেতে পারে অমৃতের সন্ধান।
মহাকারুণিক বুদ্ধ সুদীর্ঘ ৪৫ বছর তার অহিংসা সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্বপ্রেমের বাণী মানবতার কল্যাণে প্রচার করেছেন। তার মতে, মৈত্রী হচ্ছে বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর কল্যাণ কামনায় ব্রতী হওয়া। তিনি বলেছেন, ‘মা যেমন সন্তানকে আপন জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তদ্রুপ জগতের সর্বজীবের প্রতিও মৈত্রী প্রদর্শন করবে।’ মানুষ হিসেবে তিনি সব প্রাণীকে সমভাবে, সমজ্ঞানে দেখেছেন। মৈত্রী ও করুণা বুদ্ধের মানবতাবাদের প্রকৃষ্ট দিক। বুদ্ধের বাণীসমগ্র কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকূলের কল্যাণের জন্য এ ধর্ম। মৈত্রী ভাবনায় মহামানবতার মৈত্রীর সুর বিশ্বের সমস্ত প্রাণীকূলের মঙ্গল কামনায় অনুরণিত হয়। বুদ্ধ মানবতার মুক্তিসাধনে অজেয় এবং একজন শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। তার মানবতাবাদী জীবন দর্শন সর্বমানবের হিত সাধনে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। গ্রিকদার্শনিক সক্রেটিস ও কল্যাণমূলক দর্শন ব্যাখ্যা করেছিলেন। সক্রেটিসের দর্শন ছিল একটি আদর্শকে সামনে রেখে সৌহার্দ্যপূর্ণ, সম্প্রীতি ও শান্তির মোড়কে সমাজ প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে বুদ্ধ বিশ্ব শান্তি বির্নিমাণে মানুষের কল্যাণের পাশাপাশি সমস্ত প্রাণীসত্তার মঙ্গল কামনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। জাতিভেদ ও বর্ণবাদকে তিনি ধিক্কার দিয়েছেন। ধনী, দরিদ্র, উঁচু, নীচু, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় সবাই তার সাম্যনীতির সুশীতল ছায়ায় ঠাঁই পেয়েছেন। বুদ্ধের আধুনিক, উদার চেতনা মানবসভ্যতার বৃহত্তর কল্যাণে বিশ্বব্যাপী উজ্জ্বল বাতিঘর হিসেবে আলোর পথ দেখাবে। হিংসা দ্বন্দ্বযুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে একটি অহিংস সমাজ ব্যবস্থা, মৈত্রীময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় মহামানব বুদ্ধের কালজয়ী-যুগান্তকারী মানবতাবাদী দর্শন বিশ্বে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনুক, বুদ্ধের অহিংসার বাণী ছড়িয়ে যাক সবার মাঝে। অনাবিল, অকৃত্রিম, শর্তহীন প্রেম, শুচিশুভ্র পূর্ণতায় মানব চেতনাকে বিকশিত করুক।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]