বর্ণ ব্যবস্থা ও ভগবদ গীতা

আমাদের নতুন সময় : 29/12/2018

আশালতা বৈদ্য

বর্ণ ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সমাজে বিতর্কের শেষ নেই। সমাজে বেশ কিছু হিন্দু আছে যারা জন্মগত বর্ণ ব্যবস্থাকে ঢাল করে নিজেকে উচ্চ হিসেবে দাবি করতে চাচ্ছে। কিন্তু এগুলো কি আদৌও সনাতন ধর্মে অন্তর্গত ছিলো? মোটেও না! এই বিষয়ে ঝৎর অঁৎড়নরহফড় কধঢ়ধষর ঝধংঃৎু ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ঠবফরপ ঈঁষঃঁৎব এর মতামত দেখতে পারেন। তারাও স্বীকার করেন বংশানুক্রমিক বর্ণ ব্যবস্থা বেদে উল্লেখ নেই! ইহা আনুমানিক ১০০০ বছর প্রাচীন। এখন ভগবদ গীতা সাপেক্ষে এই বর্ণ ব্যবস্থাকেই তুলে ধরার চেষ্টা-
বর্ণ কি?
সংস্কৃত ‘বর্ণ’ শব্দের একাধিক অর্থ আছে, তাই এর অর্থগত ব্যখ্যায় আমরা যাবো না। ভগবদ গীতা ১.৪০ তে উল্লেখ আছে ‘স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষেণয় জায়তে বর্ণসঙ্কর’ অর্থাৎ হে বৃষ্ণিজ! স্ত্রীলোকেরা দুষ্ট হলে বর্ণের সঙ্কর উৎপন্ন হয়। এরপর গীতা ১.৪১ তে ‘সঙ্করো নরকায়ৈব কলঘ্নানাং কুলস্য’ অর্থাৎ বর্ণসঙ্কর হলে কল ও কলঘাতকেরা নরকগামী হয়।
প্রথমত স্ত্রীলোকের দুষ্ট হওয়ার সাথে বর্ণ সঙ্কর হওয়ার সম্পর্ক; দ্বিতীয়ত বর্ণসঙ্করের সাথে কলের নরক গমনের সম্পর্ক; দুটো থেকে ইহা পরিষ্কার ‘বর্ণ’ শব্দটি মানুষের উপরে ‘স্বভাব ও কর্ম’ কেন্দ্রীক সম্পর্কে প্রযোজ্য।
বর্ণ ব্যবস্থা কি জন্মগত?
ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈ ঃ ॥ ভগবদ গীতা ১৮.৪১
“হে পরন্তপ! স্বভাবজাত গুণ অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্মসমূহ বিভক্ত হয়েছে” ভগবান এখানে উল্লে­খ করেনি বর্ণ ব্যবস্থা জন্মগত। উলটে বলছেন স্বভাবজাত গুণের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্ম বিভক্ত হয়েছে অর্থাৎ সম্পর্কটি দাঁড়াবে গিয়ে :-
গুণ ? বর্ণ ? কর্ম , অর্থাৎ বর্ণের সাথে গুণ ও কর্মের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কের সূত্রে ‘জন্ম’ হলো অপ্রাসঙ্গিক! কারণ কেউ স্বভাবজাত গুণ কে সঙ্গে করে নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে না বা কেউ জন্ম থেকেই বর্ণ ভিত্তিক কর্ম করতে শুরু করে না।
ব্রাহ্মণ কে?
শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম॥
ভগবদ গীতা ১৮.৪২
“শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য -এগুলি ব্রাহ্মণদের স্বভাবজাত কর্ম”
শম=অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, দম=বহিরিন্দ্রিয়ের সংযম, তপ= তপস্যা, শৌচ= শুচিতা, ক্ষান্তি=সহিষ্ণুতা, জ্ঞান=শাস্ত্রীয় জ্ঞান, বিজ্ঞান=তত্ত্ব উপলব্ধি, আস্তিক্য= ধর্মপরায়ণতা;
অর্থাৎ যার স্বভাবজাত কর্ম অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, বহিরিন্দ্রিয়ের সংযম, তপস্যা, শূচিতা, সহিষ্ণুতা, শাস্ত্রীয় জ্ঞান, তত্ত্ব উপলব্ধি, ধর্মপরায়ণতা সম্পর্কীত তিনিই হবেন ব্রাহ্মণ।
ক্ষত্রিয় কে?
শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম।
দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম॥
ভগবদ গীতা ১৮.৪৩
“শৌর্য, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা, যুদ্ধে অপলায়ন, দান ও শাসন ক্ষমতা এগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম” অর্থাৎ যার স্বভাবজাত কর্মে শৌর্য, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা, যুদ্ধে অপলায়ন, দান ও শাসন ক্ষমতা দেখা যায় তিনিই ক্ষত্রিয়।
বৈশ্য ও শূদ কে?
কৃষিগোরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম।
পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম॥
ভগবদ গীতা ১৮.৪৪
“কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য এই কয়েকটি বৈশ্যের স্বভাবজাত কর্ম এবং পরিচর্যাত্মক কর্ম শূদ্রের স্বভাবজাত”
অর্থাৎ যার স্বভাবজাত কর্ম কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য তিনিই বৈশ্য এবং যার স্বভাবজাত কর্ম সেবা ও কর্তসাধন তিনিই শূদ্র।
লেখক: সম্মানিত ট্রাস্টি, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]