ভগিনী নিবেদিতার চোখে ভারতীয় নারী

আমাদের নতুন সময় : 29/12/2018

বিদ্যার্থী মনিদীপা মুখার্জী

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় নারীর প্রশংসা করে বলেছিলেন, এত দেশ ঘুরেও ভারতের নারীর মতো পবিত্রতা তার আর কোথাও চোখে পড়েনি। ভগিনী নিবেদিতা সেই গুরুর অনুগামিনী শিষ্যা, তার কাছেও ভারতীয় নারীর মহিমা সারা বিশ্বে সর্বোৎকৃষ্ট। তিনি বলেছেন “হাজার হাজার বছরের সরলতা আর সহিষ্ণুতা ভারতীয় নারীর চরিত্রে কেন্দ্রীভূত। ভারতীয় নারীর ধৈর্য আর কল্পনাশক্তিই ভারতের জাতীয়তাবাদকে গঠিত করেছে আর করবেও। এদের জীবন ভারতের মাটি থেকে উদ্ভূত হওয়া এক মনোরম কবিতার মতো। পাশ্চাত্য সমাজ কয়েক শতাব্দীর মধ্যে যে সংহতি আর একতা হারিয়েছে, ভারতে তা এখনও অক্ষুণœ রয়েছে প্রধানত এই দেশের নারীদের জন্য”।
নিবেদিতার চোখে ভারতের যা কিছু শ্রদ্ধা আর ভক্তির উদ্রেক করত তাদের মধ্যে প্রধান হলো ভারতীয় নারীর জীবন আর চরিত্র। ভারতীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, পৌরাণিকতার আভিজাত্যের গৌরবময় পরিচয় এই নারীদের মধ্যে। নিবেদিতা সমাজের সকল ক্ষেত্রে এই নারীর ভূমিকাকে অনুভব করেছিলেন; দেখেছিলেন এদের আশা, আকাক্সক্ষা, আবেগ, কর্তব্যবোধ, সেবাপরায়ণতা, মমতা , আদর্শ , ধর্মনিষ্ঠা, স্বার্থত্যাগ সবকিছুই ভারতের সনাতন ঐতিহ্যের উপরেই ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ্চাত্য এদের কুসংস্কার বলে যা মনে করত, নিবেদিতা সেই রীতিনীতিকেই কল্যাণময় দিক থেকে সত্যরূপেই দেখতেন।
কোন হিন্দুরমণীকে গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে নমস্কার করতে দেখে বা গঙ্গাজল স্পর্শ করে গঙ্গায় নেমে সুগভীর প্রীতিভরে ঈশ্বরের নাম করতে দেখে নিবেদিতার মুগ্ধতার সীমা থাকত না। প্রাণভরে দেখতেন সেই স্নানরতা মহিলার সুন্দর উপাসনার রূপ। তিনি তার গ্রন্থ ‘ঞযব ডবন ড়ভ ওহফরধহ খরভব’ এ গঙ্গা-যমুনার ও হিন্দুদের চোখে পবিত্র নদীগুলির সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার এক গভীর সম্পর্কের কথা লিখেছেন। হিন্দুরা এই নদীকে দেবতারূপে পূজা করে, এ তাদের অধ্যাত্মবাদের পরিচয়। তিনি লিখেছেন –
“আমরা পাশ্চাত্যবাসীরা প্রাচীন গ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আজ বহু দূরে সরে এসেছি বলেই আমাদের হিন্দুদের রীতিনীতি বুঝতে এত কষ্ট হয়। প্রাচীন গ্রিসে আকাশ জল পৃথিবী সূর্য চন্দ্র প্রকৃতির নানা বস্তু আর শক্তির সঙ্গে কত দেবদেবীর আবির্ভাব আর ক্রিয়াকলাপের কথা প্রচলিত ছিল। এইসব মনে করলে, হিন্দুজাতির নদী আর গৃহের প্রতি প্রীতিকেও সহজেই ধারণা করা যায়।
হিন্দুদের একটা চলিত কথা সন্ধ্যাবন্দনা না করে আহার করা যায় না, স্নান না করে পূজা করা চলে না। সত্যিই নারীরা এসব পালন করে। সেইজন্য তাদের দিন শুরু হয় প্রত্যুষে নদীতে স্নান করে, ভোরের অন্ধকারে সঙ্গিনীদের নিয়ে তারা নদীর ঘাটে উপস্থিত হয়। এই স্নান শুধু শারীরকৃত্য নয়, মানসকৃত্যও বটে। দেহের শুদ্ধির সঙ্গে মনের নির্মলতাও তাদের লক্ষ্য”।
নিবেদিতা ভারতের ঘরে ঘরে দেখেছেন ভারতের মেয়েরা ভিক্ষুককে, সাধু বা ফকিরকে সযতেœ ভিক্ষাদান করে, এটা যেন তাদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। নিবেদিতা এসবের মধ্যে তাদের মমত্ব আর সংহতি দেখতে পেয়েছেন। তিনি লিখেছেন-
“গৃহস্থের আঙিনায় ভিক্ষুক এসে দাঁড়াল; মুখে তার ভগবানের নাম, বা ভজন গান করছে। গৃহস্বামিনী তা শুনে সাধ্য অনুযায়ী তার ভিক্ষাপাত্রে কিছু দিলেন। ভিখারির কোন দাবী নেই, তার অভাব কম- সামান্য কিছু খাদ্য, সামান্য পরিচ্ছদ বা একটু আশ্রয় হলেই চলে। তাতেই সে তুষ্ট … একমুঠো চালের বিনিময়ে ভারতীয় রমণী এদের মুখ থেকে অমূল্য তত্ত্বকথা শুনতে পান। এদের গানের মাধ্যমেই অনুপ্রাণিত হয়ে লোকসঙ্গীতের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় রীতির মধ্যে একটা হৃদয়ের স্পর্শ আর মানুষের প্রতি সমভ্রমবোধ আছে; পাশ্চাত্যে তা যান্ত্রিক।”
নিবেদিতাকে ভারতীয় নারীর এই মমতাময় মাতৃমূর্তি খুব আকৃষ্ট করেছিল। তার কাছে যীশুজননী মেরীর যে পরিচয় খ্রিস্টান সংস্কৃতিতে ফুটে উঠেছে তা প্রাচ্যদেশের জননীরই চরিত্র। ভারতের সন্তান আর জননীর মধ্যে নিখাদ ভালবাসা, স্নেহমমতা, শ্রদ্ধাভক্তি আর কর্তব্যের কোনো তুলনা তিনি খুঁজে পেতেন না। নিবেদিতা বলেছেন-
“শিল্পী র্যানফেলের আঁকা সিস্টিন গির্জার যে প্রসিদ্ধ ম্যাডোনার কথা আমরা বলে থাকি বাম বাহুতে শিশুকে ধরে ঘোমটাপরা সাধারণ বেশভূষায় দন্ডায়মান হিন্দু তরুণী মায়ের পবিত্র স্নেহময়ী মূর্তির কাছে তা দাঁড়াতে পারে না। ভারতে সন্তান যত বড়ই হোক না কেন মায়ের কাছে সে চিরকালই শিশু।’
ভারতীয় সন্তানের মুখে ‘মা মা’ ডাক নিবেদিতাকে খুব আপ্লুত করত। তিনি দেখেছেন- গভীর আনন্দ বা শোকের যে কোন মুহূর্তেই তারা মাকে ডাকে। মায়ের প্রতি এই অনুরাগ আর ভক্তি হিন্দুদের মনে পরমেশ্বরের বিশ্বপ্রসারী মাতৃভাবে সমাহিত। তাই তিনি লিখেছেন এমন একটি উদ্বেল ভালবাসা , যা কখনও আমাদের প্রত্যাখ্যান করে না, এমন একটি আশীর্বাদ যা চিরকাল আমাদের সঙ্গেই থাকে , এমন এক সান্নিধ্য যা থেকে আমরা কখনও দূরে যেতে পারি না, এমন একটি হৃদয় যেখানে আমাদের অবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা, অপার মাধুর্য, অচ্ছেদ্য বন্ধন, অমলিন চিরশুভ্র শুচিতা -এইই হলো মাতৃমহিমা।’




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]