মূর্তি পূজার রহস্য ?

আমাদের নতুন সময় : 29/12/2018

নির্মল বিশ্বাস

মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল। পার্থিব জগতে আমাদের চঞ্চল মন নানা কামনা বাসনা দিয়ে আবদ্ধ। আমরা চাইলেই এই কামনা বাসনা বা কোন কিছু পাবার আকাক্সক্ষা থেকে মুক্ত হতে পারি না। তীব্র গতির এই মনকে সংযত করা, স্থির করার ব্যবস্থা করা হয় এই সগুন ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে আমরা কখনই ঈশ্বরের বিশালতা বা অসীমতকে আমদের সসীম চিন্তা দিয়ে বুঝতে পারব না। বরং সর্বগুণময় ঈশ্বরের কয়েকটি বিশেষ গুণকেই বুঝতে পারব। আর এ রকম এক একটি গুণকে বুঝতে বুঝতে হয়ত কোনো দিন সেই সর্ব গুণময়কে বুঝতে পারব। আর মূর্তি বা প্রতিমা হলো এসকল গুণের রূপকল্প বা প্রতীক। এটা অনেকটা গনিতের সমস্যা সমাধানের জন্য ‘ক’ ধরা। আদতে ‘ক’ কিছুই নয় কিন্তু ‘ক’ ধরেই হয়ত আমরা গনিতের সমস্যার উত্তর পেয়ে যাই। অথবা ধরুন জ্যামিতির ক্ষেত্রে আমরা কোনো কিছু বিন্দু দিয়ে শুরু করি। কিন্তু বিন্দুর সংজ্ঞা হলো যার দৈর্ঘ, প্রস্থ ও ভেধ নেই কিন্তু অবস্থিতি আছে যা আসলে কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এই বিন্দুকে আশ্রয় করেই আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা থেকে হিমালয়ের উচ্চতা সব মাপতে পারি। আবার ধরুন ভূগোল পড়ার সময় একটি গ্লে­াব রেখে কল্পনা করি এটা পৃথিবী আবার দেয়ালের ম্যাপ টানিয়ে বলি এটা লন্ডন, এটা ঢাকা এটা জাপান। কিন্তু ঐ গ্লোব বা ম্যাপ কি আসলে পৃথিবী? অথচ ওগুলো দেখেই আমরা পৃথিবী চিনেছি।
তেমনি মূর্তির রূপ কল্পনা বা প্রতিমা স্বয়ং ঐসকল দেবতা নন তাদের প্রতীক, চিহ্ন বা রূপকল্প। এগুলো রূপকল্প হতে পারে কিন্তু তা মনকে স্থির করতে সাহায্য করে এবং ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে ধারণা দেয়, শেখায় ঈশ্বর সত্য। সব শেষে পরম ব্রহ্মের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে। হিন্দু ধর্মে পূজা একটি বৈশিষ্ট্য। কল্পনায় দাঁড়িয়ে সত্য উত্তরণই পূজার সার্থকতা। আমাদের ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে। নিরাকার ঈশ্বরের কোনো প্রতিমা নেই, থাকা সম্ভবও না। যারা ঈশ্বরের অব্যক্ত বা নিরাকার উপাসনা করেন তাদের বলে নিরাকারবাদি। আর যারা ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা করেন তারা সাকারবাদি। এজন্য গীতায় বলা আছে, যারা নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন তারাও ঈশ্বর প্রাপ্ত হন। তবে নির্গুণ উপাসকদের কষ্ট বেশি। কারণ নিরাকার ব্রহ্মে মনস্থির করা মানুষের পক্ষে খুবই ক্লেশকর। কিন্তু সাকারবাদিদের সাকার ভগবানের উপর মনস্থির করা তুলনামূলকভাবে সহজ। এই সাকার ভগবানের চাহিদা মেটাই “মূর্তি” গুলো। এছাড়া এই মূর্তিগুলি আমাদের পরম ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণ ও কার্যকারীতা সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
আবার কাঠমাটির প্রতিমা যে ঐ সকল দেবতা নয়, তার প্রমাণ মেলে পূজার পর প্রতিমাগুলোকে জলে বিসর্জন দিয়ে, যদি প্রতিমাকেই ঐ সকল দেবতা মনে করা হত তাহলে নিশ্চয় কেউ তা জলে বিসর্জন দিত না!
তাই হিন্দুরা দেবমূর্তি পুতুল নয়, তা চিন্ময় ভগবানেরই প্রতীক। সনাতন ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে। যারা ঈশ্বরের অব্যক্ত বা নিরাকার উপাসনা করেন তাদের বলে নিরাকারবাদি। আর যারা ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা করেন তারা সাকারবাদি।
এজন্য স্বামী বিবেকানন্দের বলেছেন- “পুতুল পূজা করে না হিন্দু, কাঠ মাটি দিয়ে গড়া, মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে, হয়ে যাই আত্মহারা’’
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]