সনাতন ধর্মে উদারতা ও জাতিভেদ

আমাদের নতুন সময় : 29/12/2018

নিতাই চাঁদ তালুকদার এফ.সি.এ

সনাতন মানে যার আদি অথবা অন্ত নেই, চিরকালই যা নতুন, তাই সনাতন। সনাতন ধর্মের উৎপত্তিকাল সম্পর্কে সঠিক করে বলা যাবে না। খ্রিস্টের জন্মের ৫০০০ থেকে ৬০০০ বছর পূর্বেও এ ধর্মের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। বলা যায় পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম এটি, অথবা প্রাচীনতম ধর্মসমুহের একটি। এ ধর্মের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রবর্তক নেই। নানা সময়ে মুনি ঋষিদের গভীর তপস্যায় ঈশ্বর সান্নিধ্যের ফলে লব্ধ দিব্যজ্ঞান দ্বারা এ ধর্ম বিকশিত হয়েছে। ঈশ্বরের অংশ হিসেবে নানা সময়ে অবতারগণের আর্বিভাব হয়েছে। তাদের প্রদর্শিত পথ, মুখ নিঃসৃত বানী ইত্যাদি বিশাল এ ধর্মের স্রোতধারায় মিলিত হয়েছে। ফলে এ ধর্মের বিধি বিধান কখনই স্থির থাকেনি, বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞান, নানাবিধ শাস্ত্র অব্যাহতভাবে এসে যুক্ত হয়েছে। এখানে করনীয় এবং বর্জনীয়কে কখনই চিরকালের জন্য স্থির করে দেয়া হয়নি, বরং ইশ্বর লাভের জন্য সকল পথ, সকল প্রার্থনাকে সানন্দে অন্তর্ভূক্ত করা এবং চর্চার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সকল মত ও পথকে গ্রহন করার এই যে বিপুল ঔদার্য, এটিই সনাতন ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য।
এই সনাতন ধর্মই হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত। সিন্ধু নদের অববাহিকায় যে জাতি বাস করত, তারা হিন্দু নামে পরিচিতি লাভ করে। সিন্ধু শব্দের বৈদিক উচ্চারণ ‘হিন্দু’। ফলে সিন্ধু অববাহিকায় তথা বিশাল ভারতবর্ষের সকল অধিবাসীই ‘হিন্দু’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। হিন্দুরা যে অঞ্চলে বাস করে, সেই ভারতবর্ষ তের শতক থেকে ‘হিন্দুস্থান’ হিসেবে পরিচিত হয়। হিন্দুদের প্রাত্যাহিক জীবনাচরনের সবকিছুই কালক্রমে হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। সুতরাং হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্মের উৎস যেমন বিশাল ও অবাধ, তেমনি এ ধর্মকে নিয়ে চিন্তার ক্ষেত্র, মত প্রকাশের ক্ষেত্রও অবাধ। এর ফলে অজানা কাল থেকেই মুনি, ঋষি, মহামানব, সমাজ সংস্কারকদের নানা অলংকরনে এ ধর্ম সমৃদ্ধ হয়েছে।
বেদ সনাতন ধর্মের আদি ধর্ম গ্রন্থ। বেদকে স্বয়ং ভগবানের মুখ নিঃসৃত বানী বলা হয়। এজন্য বেদকে অপৌরুষেয় বলা হয়। বেদের অপর নাম শ্রুতি। চার বেদের মধ্যে ঋকবেদ সর্বপ্রথম রচিত হয়। এর রচনাকাল খ্রিষ্টের জন্মের ২০০০ বছর আগে বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। বেদে দেবতাদের পূজা অর্চনা সম্পর্কেই আলোকপাত করা হয়েছে। বৈদিক যুগে সাধারনত ইন্দ্র, বরুন, সোম এবং অগ্নির পূজা করা হত এবং যজ্ঞ, হোম, বেদপাঠ এসবই ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সে কালে কোন মূর্তি পূজা বা মন্দিরের অস্তিত্বের বিষয়ে সুষ্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়না। কালক্রমে অন্যান্য দেবদেবী ও তাঁদের পূজা অর্চনার প্রচলন হয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব যুগে ইউরোপ থেকে আর্যরা ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের পর পর বৈদিক ধর্ম বা ব্রাহ্মন্যবাদের সূচনা হয়। বৈদিক ধর্ম হিন্দু ধর্মের নামান্তর তবে এখানে বেদের উপরই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আর্যদের আগমনের পর আর্য ও ভারতবর্ষের আদি জনগোষ্ঠী যারা সামগ্রিকভাবে অনার্য হিসেবে পরিচিত, তাদের মাঝে সংঘাত সৃষ্ঠি হয়। আর্য দেবতা ও অনার্য দেবতা বা আর্য অনার্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মাঝেও অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন শিব প্রথমে অনার্যদের দেবতা হলেও পরে আর্য দেবতা হিসেবে পূজিত হন। দেবীরা যেমন, কালী, মনসা অনার্যদের পূজিতা ছিলেন। শিবের স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে পরিচিতি পাবার পর তারা আর্যদের দ্বারা পূজিতা হন। একইভাবে নানা ব্রত অনুষ্ঠান অনার্যদের ধর্মীয় আচার হলেও পরে আর্যরা এসব আচারকে তাদের জীবনাচরনের অন্তর্ভূক্ত করে। এভাবে আর্য অনার্য মিলিত স্রোতধারা অনেক দেবদেবীর সৃষ্টি করেছে, হিন্দু ধর্মকে বৈচিত্রময় করে তুলেছে।
এসব বৈচিত্রের কারণেই হিন্দু সমাজে এলাকাভিত্তিক কিছু কিছু সুনির্দিষ্ট পূজা পার্বনের প্রাধান্য দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাঙালিরা দুর্গাপূজা, কালীপূজা সাড়ম্বরে পালন করলেও ভারতের অন্য অঞ্চলে তা এত ব্যাপকভাবে পালিত হয় না। তামিলনাড়ুতে তিরুপতি ও মুরুগান খুব প্রিয় দেবতা। দিল্লীতে রামনবমী ব্যাপকভাবে পালিত হয়। মহারাষ্ট্রে গনেশ পূজা, দশেরা, হোলি সাড়ম্বরে পালিত হয়। গাইযাত্রা, ইন্দ্রযাত্রা নেপালে বড় ধর্মীয় উৎসব। শ্রীলঙ্কায় থাই পঞ্জাল একটি বড় ধর্মীয় উৎসব। পৌষ সংক্রান্তি থেকে ৩ দিনব্যাপী এই উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। এভাবে দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, লোকাচার প্রভৃতি কারণে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করা হয়। একেক অঞ্চলের ধর্মীয় উৎসব অন্য অঞ্চলে সমভাবে উদযাপিততো হয় না বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অপরিচিত। সামাজিক আচার যেমন জন্ম, মত্যু, বিবাহ, ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠানেও অঞ্চল ভেদে ভিন্নতা দেখা যায়। পারিবারিক পর্যায়েও ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা যায়। বিভিন্ন পরিবারে তাদের ইস্ট দেবতা, পছন্দের দেবতা বা মহাপুরুষের পূজা অর্চনা করা হয়ে থাকে। এভাবেই বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বিশ্বাস এবং কৃষ্টি অনুযায়ী দেবতার আবির্ভাব ও আরাধনার জন্য গোষ্ঠীভিত্তিক মন্দির তৈরি হচ্ছে।
সনাতন ধর্মের অনুসারীরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বহু দেব দেবীর মাধ্যমে তার বহু রূপকে প্রকাশ করে থাকেন। শ্রী রামকৃষ্ণও খ-তার মধ্য দিয়ে পূর্ণতার প্রকাশকে সত্য বলে বর্ণনা করেছেন। একটি বিশাল পাহাড়ের কাছে গিয়ে ৫ জন লোক পাহাড়ের ৫টি ছবি তুলে নিয়ে আসল। একটির সাথে আরেকটির আপাত মিল না থাকলেও ৫টি ছবিই সত্যকে ধারণ করে আছে। ছবিগুলোর সম্মিলনে পাহাড়ের পূর্ণতা প্রকাশ পাবে। তেমনি ঈশ্বরের বিশালত্ব বা ব্যাপকত্ব কোনো এককভাবে প্রকাশ অসম্ভব। সনাতন ধর্মে তাই সকল খ-তাকে সত্য বলে, সুন্দর বলে গ্রহণ করা হয়েছে। খ- খ- সত্যের মিলনে ঈশ্বরের পূর্ণতা মহিমাময় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এ সত্যের পাশাপাশি আরেকটি গভীর সত্য সহস্র বছরে বিরাজিত রয়েছে, সেটি হলো চিন্তার বৈচিত্রে সনাতন ধর্ম বহু বর্ণময়, ঐশ্বর্যম-িত হয়ে উঠলেও জাতি হিসেবে হিন্দু দিন দিন খ- খ- হয়েছে, ক্ষয় প্রাপ্ত হয়েছে। সকল প্রকার বিশ্বাসের সমাহার ঘটিয়ে ঈশ্বর ধারনাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জটিল করে তোলা হয়েছে। কিছু মৌলিক বিষয় যেমন, আত্মার অবিনশ্বরবাদ বা পূণর্জন্মে বিশ্বাস, একেশ্বরবাদ, গোমাংস ভক্ষণ না করা, অশৌচ পালন ইত্যাদি বিষয়ে হিন্দুধর্মের মিল থাকলেও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে এক অঞ্চলের সাথে আরেক অঞ্চলের বা এক শ্রেণির সাথে অন্য শ্রেণির অমিল, নানাবিধ পূজা, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্থানে প্রকট পার্থক্য ইত্যাদি কারণ একটি শক্তিশালী হিন্দু জাতি গঠনের পক্ষে বিরাট অন্তরায়।
‘যত মত, তত পথ’, একথা বলে ঈশ্বর ভাবনাকে উন্মুক্ত করে দিয়ে, ঈশ্বরকে নিয়ে সকল ধারনাকে সত্য বলে স্বীকার করে নিয়ে, গ্রহণ করে হিন্দু ধর্ম যে উদারতা দেখিয়েছে, জাতি হিসেবে হিন্দুরা এটি গ্রহন করে ঐক্যবদ্ধ না হয়ে খ-িত হয়েছে। বিভিন্ন মতে, বিভিন্ন পথে ঈশ্বর আরাধনা বা ঈশ্বর কল্পনা যুক্তি দিয়ে, তত্ত্ব এবং তথ্য দিয়ে অভ্রান্ত প্রমাণ করা গেলেও এর প্রায়োগিক দিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোটি কোটি মানুষের মনে সকল মত এবং পথকে একই রকম সত্য বলে বিশ্বাস করার মত উদার মানসিকতা তৈরি অবাস্তব এবং অসম্ভব। ফলে চিন্তার বৈচিত্রের ফলে বিভিন্ন মতের তৈরি হয়েছে এবং এক মতের অনুসারীরা কেবল তাদের মতকেই অভ্রান্ত বিশ্বাস করে তার চর্চা করেছে এবং অন্য মত ও পথকে বর্জন করার চেষ্টা করেছে। অনেকে এই বহুমতের গোলকধাঁধায় পড়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন, ফলে অনেকেই ধর্ম এবং ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে অনীহা বোধ করেন, কেউ কেউ ধর্মত্যাগও করেছেন। এই বর্জন এবং বিভ্রান্তির ফলেই যুগ যুগ ধরে শত শত খ-ে হিন্দু সমাজ বিভক্ত হয়েছে এবং দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। ঈশ্বর সাধনার সকল সত্যপথকে স্বীকার করে নিয়ে কেবলমাত্র একটি সহজ ও স্পষ্ট পথ অনুসরনের নির্দেশনা যদি ধর্ম থেকে আসে, তাহলে বিশাল হিন্দু জাতি একটি ছাতার নীচে সংগঠিত হতে পারবে। তাদের বিশ্বাস দৃঢ়মূল হবে, চেতনা সংহত হবে, ঐক্য সুদৃঢ় হবে। অবশ্য কেবল বৈচিত্র এবং ভিন্নতা হিন্দু সমাজের দুর্বলতার একমাত্র কারণ নয়, জাতিভেদ হিন্দু সমাজের ঐক্যের পথে আরেকটি বড় অন্তরায়। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, নবাবগঞ্জ উপজেলা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]