‘আমাদের নির্বাচন ভারত মেনে নেয়ার কে?

আমাদের নতুন সময় : 06/01/2019

অসীম সাহা : “আমাদের নির্বাচন ভারত মেনে নেয়ার কে? চীন বা ওআইসি মেনে নেয়ার কে? আমাদের নির্বাচনে তারা স্বীকৃতি দেবে কেন?” কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির উপদেষ্টাম-লীর সদস্য মনজুরুল আহসান খান! আমি চীন বা ওয়াইসির কথা বলবো না! কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা সকলেরই জানা। তবে ভারত সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, সে-সম্পর্কে বলবো, ‘একেবারে মোক্ষম কথা’। মনজুরুল আহসান খানরা সবসময় ঠিক ঠিক কথা বলেন। তারা কিছু লোককে এখনো কমিউনিজমের আফিম খাইয়ে ভুলিয়ে রাখার সফল জাদুকর। একেবারে পিসি সরকারের মতো। জাদুর কাঠি তাদের হাতে নয়, মুখেই আছে! তা না হলে প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা এখনও তাদের সংগঠন করে? কথার ফুলঝুরি ফোটাতে ওস্তাদ মনজরুল আহসান খান সেই ফুলঝুরিতে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
মনে হচ্ছে, যেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ফিরে গেছি আমরা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান হানাদারবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আগুন জ্বালিয়ে, ঘরবাড়ি লুট করে, মানুষকে হত্যা করে এবং নারীদের সম্ভ্রমহানি করে দেশটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছে। আর বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে উজ্জীবিত দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিশেবে ‘যার যা কিছু আছে’ তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য ট্রেনিং শুরু করে দিয়েছে। এ-অবস্থায় যখন এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদর-আলশামসবাহিনী এবং মুসলিম লীগসহ আরো বেশকিছু স্বাধীনতাবিরোধী দল পাকিস্তান-সেনাবহিনীর সহায়তায় বাঙালিনিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছে, তখন পূব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিসহ প্রগতিশীল সব দল বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক মেনে আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনে যেমন, তেমনি প্রবাসী সরকারের সঙ্গেও বিশাল সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে সর্বক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন। তখন পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি ছিলেন কমরেড মণি সং। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়দানসহ মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং এবং অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী নারী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিশাল অবদানে শুধু আমেরিকা, চীন ও মধ্যপ্রচ্যের মুসলিম দেশগুলো ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশ আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে আমরা মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের অসম সাহসী গেরিলা, ৩০ লাখ শহিদ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং ভারতের নিয়মিত বাহিনীর ১০ হাজার সৈন্যের পবিত্র রক্তদানে ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করেছি। ইন্দিরা গান্ধীর কথায় প্রথমে ভুটান এবং তার পরপরই ভারত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে লাল-সবুজের বিজয় কেতন ওড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। আমি ভাবছি, তখন যদি কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি থাকতেন মনজুরুল আহসান খান, তা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-অর্জনের কী হতো? তিনি যদি বলে দিতেন, “ভারত আমাদের সহযোগিতা করার কে, আমাদের লোকদের মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং দেয়ার কে, সর্বোপরি বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার কে?” তা হলে অবস্থাটা কী হতো?
তিনি যদি আরো বলতেন, “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে ভারত নাক গলানোর কে? আমাদের ব্যাপার আমরাই দেখবো। আমাদের দেশের জনগণ দেখবে, কী করে পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়।” তা হলে? এতো বড় দেশপ্রেমিক তখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন কি ভারতের স্বীকৃতির জন্যে? ভারতীয় হস্তক্ষেপের জন্যে? যেমন করে তখন পিকিংপন্থিরা মুক্তিযুদ্ধকে বলতো ‘দুই কুকুরের লড়াই’। যারা এই কথা বলে মূলত পাকিস্তান, আমেরিকা ও চীনের অবস্থানকে সমর্থন করেছিলো। এখন ২০১৮-এর নির্বাচনের পর নতুন বছরে এসেও মনজুরুল আহসান খানের কণ্ঠে প্রায় সেই একই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি! খান সাহেব বলে কথা! আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানের পরে অবার নতুন করে আরেক খানের কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছি, “ভারত আমাদের স্বীকৃতি দেবার কে?” পরান জুড়িয়ে যাবার কথা! সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর অস্তিত্বের সংকটে ভোগা এই সব জংধরা লোকগুলো ডিগবাজি খেলার পর বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর কথা বলে, বঙ্গবন্ধুর সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলে, জিয়ার খালকাটা বিপ্লবের সারথি হয়ে এখন ড. কামাল হোসেনের কাঁধে সওয়ার হওয়ার চিন্তা করে পরোক্ষভাবে ধনের শীষের স্বপ্নের ওপর গড়ান দিয়ে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছেন! যাদের সভাসমাবেশ হলে লোকসমাগম দেখে কৌতুক বোধ হয়, অবস্থা বুঝতে পেরে যাদের অনেক নেতা সময়মতো তাদের দল ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গণতন্ত্রের পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার গঠন করতে চলেছেন, তখন এই ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’ ‘বিপ্লবী’ বিপ্লবের ডাক দিচ্ছেন! তিনি ঐক্যফ্রন্ট না ভেঙে দেয়ার পক্ষে। কেন? তিনি কি ঐক্যফ্রন্টের হাল ধরবেন আর ড. কামাল হোসেন যা পারেননি, তা করে দেখিয়ে দেবেন, ‘বিপ্লব কারে কয়?” তা হলে আসুন। পেছনের দরোজা দিয়ে নয়, সামনের দরোজা দিয়ে আসুন। দেখুন, শেখ হাসিনার খেলার কাছে আপনি ও আপনারা কতো নাবালক ও কতো শিশু? শুধু আপনার কাছে একটাই অনুরোধ, শেখ হাসিনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ‘সখি, বিপ্লব কারে কয়’ বলার পর যেন আবার না বলে ফেলেন, ‘সেকি কেবলি যাতনাময়?”
লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]