• প্রচ্ছদ » » উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্য : মুখবন্ধের বদলে


উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্য : মুখবন্ধের বদলে

আমাদের নতুন সময় : 11/01/2019

অনিকেত মৃণালকান্তি, আগরতলা

বছর ষোলো সতেরো আগে, কৈশোরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা কাগজের পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত উপন্যাসের এক পঙক্তি খুব দাগ কেটেছিলো আমার মনে। সেখানে একটি মেয়ে তার মায়ের কিশোরীবেলায় লেখা চিঠি পাঠ করে রোমাঞ্চিত হচ্ছে! চিঠিতে সেই বিশেষ পঙক্তিটি ছিলো এমন-‘তোমাকে বাদ দিয়ে কোনো সুন্দরই আমি একা দেখতে পারি না আর’।
গত দশ বছর আমি প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠ করেছি উত্তর-পূর্ব ভারতের লেখকদের লেখা। সেই উপন্যাসের মাথুর মেয়েটির মতো সুন্দরের মন খারাপ বা সুন্দরের জন্য মন খারাপ কাকে বলে, তা উপলব্ধি করেছি এই পাঠে, বারবার! বাংলার পাশাপাশি সংখ্যায় বেশি বা অল্প পড়েছি ককবরক, মণিপুরি, অসমিয়া, চাকমা ইত্যাদি ভাষার সাহিত্যও। এই পাঠে, মনে হয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশেরওÑসাহিত্যের সাথে এখানকার বাংলায় লেখালেখি করা মানুষদের মানসজগতের যে মিল, তা পদ্মপাতায় জলের মিলের চেয়ে খুব বেশি নয়! বরং ঢের বেশি সাদৃশ্য, একরকম বা কাছাকাছি প্রায়, উপরে উল্লেখিত করা ভাষাভাষীদের সাথে।
যাবতীয় তর্ক-বিতর্ক, সন্দেহ, চক্রান্ত ইত্যাদির সম্ভাবনা মনে রেখে এবং মেনে নিয়ে নিজস্ব মতামত স্পষ্ট করে, সহজ অথচ জরুরি কথাটা বলি, সেটা এই যে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্য বাংলায় লেখা হলেও কোনোভাবেই তা বৃহৎ বাংলার সাহিত্যের অংশ নয়। ব্রিটেনের বাইরে, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা বা নিউজিল্যান্ডের ইংরেজি সাহিত্যের মতো তাও কিছুটার বেশি আলাদা সাহিত্য! ইংরেজি ভাষায় লেখা বলেই তা যেমন ব্রিটিশ দীপপুঞ্জের সাহিত্য নয়, তেমনি বাংলা ভাষায় লেখা বলেই আসাম বা ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্য তথাকথিত মূল ধারার বাংলা সাহিত্য নয়।
গত পঞ্চাশ-চল্লিশ-তিরিশ বছরে সেই দুই (এমন ভাগ করা অসমীচীন?) ধারার সাথে এই বিরল ভূমিখ-ের লেখকদের অন্তর্জগত ও বহির্জগতের দূরত্ব-ব্যবধান ক্রমশ বেড়েছে বৈ কমেনি। দেশভাগজনিত প্রব্রাজন-প্রচরণের স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা এখানকার তিরিশ-চল্লিশ বছর বয়সী কবি-লেখকদের নেই। তাই দেশের বাড়ির স্মৃতিচারণার বদলে, গঙ্গার ঘাটে আড্ডা দেবার পরিবর্তে এঁদের লেখার চরিত্ররা পর্ণমোচি রাবার বনে ‘আং নন হামজাগ’ বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে! বাংলায় বললেও বলে সিলেটি, কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের বিভাষায়। কোনো আরোপিত মিশ্রসংস্কৃতি নয়, বরং মানবজাতির এক অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক পরিম-লে বাস করেন আজ এখনকার-এখানকার বাংলাভাষী লেখকেরা।
এই লেখায় ‘বাঙালি লেখক’ না বলে বারবার ‘বাংলাভাষী লেখক’ শব্দবন্ধ দেখে কারো মনে খটকা লাগতে পারে, অদীক্ষিত (এই ভূগোলের সাহিত্যে) পাঠক-সমালোচকের ভ্রু কুঁচকে উঠতে পারে! এই ‘আলো হাওয়া রৌদ্রে’র বাসিন্দা সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ, মানস দেববর্মণ, রাতুল দেববর্মণ, বিমল সিংহ, সমরজিত সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ, দেবীপ্রসাদ সিংহ, নন্দকুমার দেববর্মা বা চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং প্রমুখের লেখার সাথে পরিচয় না থাকলে এই খটকা বা ভ্রুকুঞ্চন স্বাভাবিক! ভিন্ন ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ভাষিক পরিম-ল থেকে দ্বিভাষিক-ত্রিভাষিক কবি-লেখকেরা বাংলা সাহিত্যে যে ভিন্ন অভিজ্ঞতার জগত (শুধু বহিরঙ্গ নয়, অন্তরঙ্গেও) উন্মোচন করেছেন, যে বৈচিত্র নিয়ে এসেছেন, তা কি আর অস্বীকার করা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই ব্রহ্মকমল ফুলের মতো ফুটে উঠেছে উত্তর-পূর্বের বাংলা সাহিত্য।
লেখককে নিজের আঞ্চলিক অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য লেখায় নিজস্ব ভূগোলের ফুল-পাখি-নদী-পাহাড়ের নাম ইচ্ছে করে উল্লেখ করতে হবে এমন কোনো কথা যে নেই, সেটা সব বিচক্ষণ বোদ্ধা পাঠক-সমালোচকই মানেন! কিন্তু তারপরেও অঞ্চলের জল, মাটি, ভাষা, সংস্কৃতির নিজস্বতার ছাপ একজন লেখকের লেখায় আসবেই, আসাটাই স্বাভাবিক। আজ যাকে আমরা উত্তর-পূর্বের বাংলা সাহিত্য বলছি, তা এ কারণেই বাংলা ভাষার সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধিকারী হয়েও ক্রমশ নিজস্বতা নিয়ে, বহিঃপ্রকৃতির পাশাপাশি অন্তঃপ্রকৃতিতেও তা পৃথক চারিত্রধর্ম অর্জন করেছে।
ইচ্ছে করেই এতোক্ষণ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে বলিনি। এ যাবৎকাল, উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে যে-সব গবেষক কাজ করেছেন, লিখেছেন, সেই লেখক-গবেষকদের অধিকাংশের লেখা পাঠ করে এটাই মনে হয়ছে, উত্তর-পূর্বের বাংলা সাহিত্য মানে, শুধু এক রাজনৈতিকভাবে সীমানাচিহ্নিত ভূগোলে চর্চিত হওয়া সাহিত্য! কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী অবস্থান, তথাকথিত মূলধারার সহস্রমন উপেক্ষাজাত লক্ষ টন অভিমান সম্পূর্ণ মিথ্যা নয় মানি; কিন্তু শুধু রাজনৈতিক কারণে যে ভৌগোলিক বিচ্ছিনতা, তা দিয়ে এই ভূখ-ের সাহিত্যকে চিহ্নিত করতে গেলে শ্রেণিবদ্ধ করতে গেলে উত্তর-পূর্বের লেখদের সামর্থ্যরে প্রতি ভয়ানক অবিচার করা হয়। আমরা জানি (অনেকেই মানেন না) দিনের শেষে সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠিত হতে হয় নিজ গুণেই, কোনো ঈগল মার্কা লেবেল লাগিয়ে নয়।
দূর অতীতে, ইউরাল পর্বত বা টাইগ্রিস ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে আর্যদের যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, তা থমকেছে নাগা বড়াইল জম্পুই লুসাই পাহাড়-প্রাচীরে। আত্মত্রাণ বা সুন্দরের সন্ধান, যা-ই হোক না কেন, সেই যাত্রা শেষ হয়েছে এই নীল পাহাড়, সোনালি নদীর দেশে এসেই। সেই থেকে, আর্যভাষার বংশধর বাংলা, নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে অস্ট্রিক ভোট চীনীয় ভাষাগুলির সাথে। সেই মিথস্ক্রিয়াধীন জীবন, ‘কণ্ঠে পারিপার্শ্বিকের মালা নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্য নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছে! এখন এই সাহিত্য আত্মবিশ্বাসী, সম্ভ্রান্তও বটে। বহু দশকের অর্জন নিয়ে এই ভূখ-ের বাংলা সাহিত্য আজ সচেতন, আত্মপ্রতিষ্ঠাকামীও। এ কারণেই শিরোনাম ‘ভারতে’র স্থানে ‘ভারতের’। এই ‘র’টি’ কারো অংশ নয়Ñসম্পূর্ণ। উপন্যাসের সেই চিঠি লেখা মেয়েটির মতো আমিও, একা সুন্দর দেখবো না বলে এই লেখার অবতারণা করলাম। লেখক :




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]