• প্রচ্ছদ » » কলকাতা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ


কলকাতা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

আমাদের নতুন সময় : 11/01/2019

ভজন সরকার

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করে ঢাকা ফিরেন সেদিনই। প্রাথমিকভাবে কথা ছিলো দিল্লি থেকে ঢাকা আসার পথে কলকাতায় আরেকবার যাত্রাবিরতি করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাবেন বঙ্গবন্ধু। কলকাতার দমদম বিমানবন্দরসহ অন্যান্য প্রটোকলও প্রস্তুত রাখাই ছিলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আকাশপথ থেকেই বার্তা দিলেন, তিনি ঢাকাতেই ফিরবেন। ফলে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ পশ্চিমবঙ্গে আর নামা হয়নি তার।
কিন্তু দেশে ফিরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়ভার গ্রহণ করার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বিদেশ সফর করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি ৬ তারিখ থেকে শুরু করা ৩ দিনের সফরে বঙ্গবন্ধু ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। লোক সমাগমের দিক থেকে সে জনসমুদ্রের আয়তনের রেকর্ড আজ পর্যন্ত অক্ষত আছে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গরদের শাড়ি পরে তার ভাষণের অনেকখানিই বাংলায় করেছিলেন সেদিন।
আকাশবাণী ও দূরদর্শন থেকে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরার জনসভার ধারাবিবরণীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো মহালয়া- পাঠখ্যাত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও পঙ্কজ সাহা এই তিনজনকে। কবি, ধারাভাষ্যকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব পঙ্কজ সাহা এক সাক্ষাৎকারে সেদিনের সে জনসভার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে যে…
শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিলেন। তারপর জনতার সে বিশাল ¯্রােতের মধ্য থেকে একটু পর পর আরো কবিতা পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছিলো শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব জনতার সে অনুরোধে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠ করে শোনাতে লাগলেন। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে শেখ মুজিবের রবীন্দ্র কবিতাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। কলকাতা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সে ঐতিহাসিক জনসভা নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে কিন্তু রবীন্দ্রভক্ত শেখ মুজিবের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি’।
জনসভা চলাকালীন সময়েই পঙ্কজ সাহাকে দূরদর্শন থেকে জরুরি তলব করা হয় অফিসে ফিরে আসতে। দিল্লি থেকে নির্দেশ দেয়া হয় তিন ঘণ্টা পরেই একটি আলোচনা অনুষ্ঠান করার যা দূরদর্শন ও ঢাকা টেলিভিশন থেকে একযোগে প্রচার করা হবে। আলোচকদের নামও বলে দেয়া হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার, সাহিত্যিক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেন, নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র প্রমুখ। পঙ্কজ সাহা সে অনুষ্ঠান নিয়ে তার স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচার হচ্ছিলো। আলোচনার প্রসঙ্গক্রমে হঠাৎ করে ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার এবং সাহিত্যিক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেন একটু বিপত্তি করে ফেললেন কিছু আশঙ্কার কথা বলে। উনারা দু’জনেই পূর্ববঙ্গের মানুষ। ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন অনেক বছর। সত্যেন সেনও পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন বহু বছর। তারা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছিলেন যে, তারা এ অঞ্চলের মানুষের অনুভূতি, আবেগ ও পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছে থেকে। তাই যদি তাদের ভুল না হয় তবে বলা যায় শেখ মুজিবের এ জনপ্রিয়তা বেশিদিন স্থায়ী হবে না, শেখ মুজিবুর রহমান বিপদের সম্মুখীন হবেন। অনুষ্ঠানটি যেহেতু সরাসরি প্রচারিত হচ্ছিলো, তাই কোনো কথা সেন্সর বা বাদ দেয়া যাচ্ছিলো না। অথচ শেখ মুজিব ও অন্যরা কলকাতা অতিথি ভবন থেকে এবং দু’দেশের কোটি কোটি মানুষ অনুষ্ঠানটি দেখছিলেন। তাই অনুষ্ঠান সঞ্চালক হিসেবে বার বার বলছিলাম, আপনাদের এ আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হোক আমরা এ কামনা করি। শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘজীবী হউন’।
বিস্ময়করভাবে জ্ঞানী গুণী এ দু’মনীষীর কথা একটুও ভুল প্রমাণিত হয়নি। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। শুধু হত্যা করাই হয়নি, তার হত্যার বিচারের সব পথও সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করা হয়েছিলো। কে জানতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যারা বেঁচে যাবেন এবং ক্ষমতায় আসবেন দু’দশক পরে? কে জানতো বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে বাংলাদেশেই?
সেদিন পঙ্কজ সাহার সাক্ষাৎকার শুনছিলাম আর ১৯৭৫ এর পরের বাংলাদেশের কথা ভাবছিলাম। ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার কিংবা সাহিত্যিক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেনের সেদিনের সে আশঙ্কার কথা মাত্র সাড়ে তিন বছর পরে কী রকম অকাট্য সত্য হয়েছিলো? আসলেই বাংলাদেশ নামক এ গাংগেয় বদ্বীপের মানুষ কী এ রকমই হুজুগে? লালন-হাসন কিংবা অসংখ্য সুফীসাধকের পথ কতো সহজেই গ্রহণ করে তেমন কোনো বাদবিসম্বাদ ব্যতিরেকেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুঝুক বা না বুঝুক, সে চেতনার জন্য অস্ত্র হাতে নেয়, আবার মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরেও অনেকেই নির্বিকার থাকে, দীর্ঘ ২১ বছর লাগে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনকের হত্যার বিচার করতে!
বাংলাদেশের সৌভাগ্য ’৭৫-এর সেই নির্মমতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর কন্যাদ্বয় জীবিত ছিলেন। ঘাতকের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে ঘাতকদের বিচার হয়েছে। জাতির কপাল থেকে মুছে গেছে কলঙ্ক রেখা। কিন্তু এখনো দেশে-বিদেশে ঘাতকদের প্রেতাত্মারা মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। বাংলাদেশকে আবার ’৭১-এর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আশার কথা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বার বার তুলে ধরে।
লেখক : বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, কবি ও কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]