মোহরানা

আমাদের নতুন সময় : 11/01/2019

ইকবাল আনোয়ার

রাত গভীর। শীতের রাত। কুয়াশা ঘন অরণ্য বনে বসে আছে। এক প্রস্থ কথা কাটাকাটি হলো, তুমুল। কেহ কারে নাহি ছাড়ে। মোহরানায় এসে থমকে গেলো সব আয়োজন। এখন নীরব সব। এতো অসহ্য নীরবতার চেয়ে অকথ্য কথা কাটাকাটি বরং অনেক স্বাস্থ্যকর। হ্যাজাকের আলোর চারদিকে উলু উড়ছে মরণের লোভে। ঘোলা হয়ে গেছে আলো সেই যে কখন! স্টিলের উল্টোবাটি- পেটে হাত চেপে চাবি টেনে আর চেপে বাতাস বাল্বে চালি করার কথা ভুলে গেছে মুনি বেটা। ঝিঁঝি ডাকে যেনো কান বরাবর। বমি এসে যেতে চায় বরের। মন খারাপ হয়ে গেছে তার ভীষণ।
ত্রিপালের নিচে চটের ওপর ডেকরেটর-টেট্রন পাতলা সাদা চাদরের ওপর কোনো কোনো বরযাত্রী ঘুমায় বেহুঁশ, কাপড়-চোপড় উল্টাপাল্টা। সামিয়ানার ঝালরে মোঘল- ফুলের নকশা আর কারো আনন্দের কারণ নয় এখন। মহিলা যারা এসেছিলেন তারা ভেতর বাড়িতে এখন প্রায় সমাদরহীন প্রান্তে ঠেকে এখানে-সেখানে ঢুলছে। পুরুষের একদল পিঠ পাতার জায়গা না পেয়ে চোখ টানটান করে ঘুম আটকাতে বিড়ি সিগারেট ফুঁকছে। পাশের পুকুরে গিয়ে মুখে ঠা-া জলের ঝাপটা লাগাচ্ছে কেউ। গোপন কোণে নিরীহ মুরব্বি ক’জন, আসমানী ফয়সালার জন্য তাহাজ্জুতে।
গতকাল সকাল থেকেই কলের গান উঠে কনে বাড়িতে। আম গাছে চড়ে চোঙ্গা, অন্দরে মুখ করে। আরেকটা গাব গাছে বেঁধে দেয়া হয় দূর গাঁ তাক করে। রাতে হবে গোলা বাজি ফাটানো। বহুদূর জানান দেবে চর্চর- তারা বাজি। বর এলে ফুটানো হবে বড়ে গোলা, এসব যুবকদের নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনামাফিক সাজানো।
কলের গান। কাঠের বাক্স একটা তিন বাই দুই। গোল কালো থালের মতো রেকর্ড প্লেয়ারে, হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুর চুঙ্গার সামনে মুখ রেখে বসে। ঘোরে গানের তালে কানিয়ে কানিয়ে, থালার ভেতরে, মাঝখানে। যন্ত্রটার এক কোণের হাতলের ঘাড় ভেঙে গলায় পিন আটকে থালে রাখে আর গানের লয় আর কণ্ঠ ভোঁতা হয়ে এলে সময় সময় পাম দেয় গান মাস্টার। প্রথম গান বাজে, চারা গাছে ফুল ফুইটাছে। অন্দর থেকে আপেত্তি আসে। তাদের বায়না, দুল দুল দুলনী। গানটা পাওয়া গেলো না বলে গান মাস্টারকে একটু অপমান পোহাতে হলো, কী সব পচা গান নিয়া আইছে বেডায়, বায়নার টেহা আটকাইলে বালা অইতো।
লাল সবুজ নীল হলুদ পাতলা রঙিন মিষ্টিগন্ধা কাগজ কেটে কোনো তোলা মাজার মার্কা পতাকা সুতলীতে ভাতের আঠায় লাগায়েছে যুবকরা, কিশোররা, শিশুরা নেচেছে দেখে তিড়িংবিড়িং, তাদের ওপরে যারা কলেজে পড়ে তাদের ডিরেকশন, বড়রা খুশি আবার আপত্তিও তোলে, এতো কী!
কলাগাছের গেট পার হলে বরকে ঠকাতে মেয়েরা শুলুক-সিকলী আর প্যাঁচ তৈরি করে গোপন রাখে, হতে পারে শরবতের বা অন্য কোনো পদের চালাকি। বারবারি ঘরে চকি টেবিল একটা চেয়ার ছেড়ে দেয়া হয়। এখানে জায়গীর মাস্টার ঘুমায়। সে এখন পুরনো বাড়িতে ধানের গোলার পাশে টং ঘরে কষ্ট করবে দুই দিন। গানঅলার বাক্স পেটরা আর থাকার জায়গা করা হয় এভাবে। কিন্তু এখন মোহরানায় এসে সব সুন্দর শেষ হতে বসেছে।
ভেতর বাড়িতে কনে ঘেমে নেয়ে গেছে। দুপুরে কি সুন্দর নাকি মিহি কোরাসে প্রাচীন পরম্পরা গীত গেয়ে হলুদ মেখে তারে গোসল করানো হয়। পান গুয়া হাকিমপুরি জর্দা কদ সব সাজানো বাটায়, যার যেমন খায়। খুশির সব রেশ সহসা বিনাশ করে এই মোহরানা। এসব কথা আগে ভেঙে রাখলে হতো না!
কনে এখন এক কোণে। একটা অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতো পড়ে আছে সিন্দুক-খাটে। সে কেমন আছে, তার শরীর মনের অবস্থা কী! কেউ জানবার প্রয়োজন মনে করছে না। হায় এ কেমন বিয়ে বাড়ি হলো, তার জন্যে! সে কী অপয়া তা হলে!
ডেকচিতে পোলাও ঠা-া হচ্ছে। মাংস জমে যাচ্ছে। বাবুর্চি তাগদা দিচ্ছে। কোথা থেকে এতো কুকুর জুটেছে। ওদের তাড়াতে সাহিদার প্রধান বিরক্ত হয়ে লম্বা চেলী কাঠ দিয়ে একটা কালো মোটা কুকুরকে এমন মেরেছে যে মনে হয় ওটা বাঁচবে না। কুকুরদের চিৎকার বিশ্রী জঘন্য নরক তুল্য করে ফেলে যখন পরিবেশ, ঠিক তখন নিরীহ সুন্দর, চিকনচাকন গড়ন, মিষ্টি ভীষণ, হলুদমাখা সাজে যাকে লাগছিলো আরো সুন্দর মনোরম, নতুন পাট খোলা কাতানে কতো বিড়ম্বিত আনন্দ তার! যে কখনো এর আগে শাড়ি পরেনি, যেতো স্কুলে, দু বেনী কিশোরী, দু’দিন আগেও তারে এক্কা দুক্কার ঘর থেকে গাল পেরে নিয়ে আসা হয়েছে, অ ছেমরী তর না বিয়া, কাইল বাদে পরশু, সিনালের মতো নাচতাছস কে!
তার বড় বেশি বলতে মন চাইছিলো, আমার বিয়া! আমারে না জিগাইয়া! আমি পড়তাছি বালা পাশ দিয়া, আমার কী বিয়ার বয়স হইছে? তোমরা ভাত কডা মন চাইলে খাওয়াইবা, নইলে না, টিউশনি করুম, সেলাই কাম কইরা পরুম।
বলতে পারেনি। সে বেহুঁশ হয়ে গেলো এই মাত্র। ধপাশ করে খাট থেকে পড়ে গেলে মাথায় চোট পায়, তাকে শুয়ায়ে রেখে কলাপাতা মাথার নিচে পেতে মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে, কে একজন বলছে সমস্ত ঘর ভিজে গেলো, জলপট্টি দিয়ে ফেলে রাখলে হয় না! সেই সময় কুকুরের দল ক্ষুধায় এবং তাদের একজনকে ‘এটেম টু মার্ডার’ করার প্রতিবাদে ক্ষেপে আবার সকলে চিৎকার করে উঠে, মানুষগুলো চিৎকার না করলেও তার কাছাকাছি আর না পেরে খাওনের জন্য অকথ্য ভাষা উচ্চারণ করে এবং পাম না দেয়ায় হ্যাজাক নিভে যায়। চারপাশ অন্ধকার হলে কুকুররা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বসে। (অনুগল্প)। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]