হিরোদের জিরো টলারেন্স!

আমাদের নতুন সময় : 11/01/2019

অসীম সাহা : নতুন মন্ত্রিরা দপ্তর বণ্টনের পর চেয়ারে বসেই সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেক চমৎকার চমৎকার কথা বলেছেন। অধিকাংশ মন্ত্রী তাদের ভবিষ্যৎ-কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে কথার বলেছেন, নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথাও ভোলেননি। তবে কোনো কোনো মন্ত্রী আবার চমৎকৃত হবার মতো কথাও বলেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, দুর্নীতির ব্যাপারে তারা জিরো টলারেন্সনীতি মানে ‘শূন্য সহনশীলতা’র নীতিতে অবস্থান নিয়ে দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করবেন। মন্ত্রিরা রাজকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এখন হিরো। তাই ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা তারা বলতেই পারেন।

এবারের মন্ত্রিসভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অধিকাংশই নতুন মন্ত্রী রেখেছেন। মন্ত্রিত্বের ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা একেবারে জিরো! প্রশাসন চালাতে গেলে আমলাদের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। সেক্ষেত্রে আমলারা তাদের কতোটুকু সহযোগিতা করবেন, সে-ব্যাপারে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যদি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আমলা হন, তা হলে মন্ত্রিরা সহযোগিতা পাবেন। আর যদি তারা আত্মপ্রেমিক হন, তা হলে মন্ত্রিরা জিরো টলারেন্সের অবস্থানে থাকলে তাদেরই জিরো হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। গত দশ বছরে কতো  মোবাইলনির্ভর আমলাতোষক মন্ত্রী দেখেছি, যারা সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ১০বার চিন্তা করেন। চিন্তা করেন এই জন্য নয় যে, সিদ্ধান্তটি কতো ভালো দেয়া যায়। তারা সংশয়ে দুলতে থাকেন, করা যায়, কী যায় না? করলে যদি আবার কোনো বিপদে পড়তে হয়, তা হলে? আমলারা নতুন নতুন আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের ভয় দেখিয়ে মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তহীনতায় বাধ্য করেছেন, এমন সংবাদ তো আমরা হরহামেশাই পত্রপত্রিকায় সংবাদ হিসেবে উঠে আসতে দেখেছি। ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ কথাটা তো আর এমনি এমনি চালু হয়নি!

তাই জিরো টলারেন্স কথাটা শুনতে যতো ভালো লাগে, তার বাস্তবায়নের চিন্তা করতে গেলে শরীরে এক ধরনের শিহরন খেলা করে যায়। যে-দেশে মানষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি, সরকারি কর্মচারিরা নিজেদের দেশের জনগণের সেবক ভাবতে শেখেননি, বরং প্রভু ভেবে তার অপ্রয়োগের চিন্তায় সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন, তাদের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক প্রশাসন উপহার পাওয়া শুধু কঠিন নয়, দুরূহও বটে! সেক্ষেত্রে মন্ত্রিত্বের আসনে বসেই যারা জিরো টলারেন্সের কথা বলে দুর্নতিবাজদের সতর্ক করার চিন্তা করছেন, তাদের কথা শুনে দুর্নীতিবাজরা নিশ্চয়ই মনে মনে হাসছেন। কারণ দুর্নীতিবাজরা একটি সিন্ডিকেট। ‘সারা অঙ্গে ঘা, মলম লাগাবো কোথায়’ অবস্থা হলে মন্ত্রীরা তো নাস্তানাবুদ হয়ে পিঠটান দিতে বাধ্য হবেন। তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বঁচি’ অবস্থায় মন্ত্রিত্বের ঢিলে কাছা আগলাতে আগলাতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠে যাবে, মন্ত্রিত্ব করবেন কী? যাদের সাহস নয়, দুঃসাহস আছে, একমাত্র তারাই এ-ব্যাপারে সফল  হতে পারবেন। নিজেরা যদি স্বচ্ছ থাকেন এবং জনগণের কাছে নিয়মিত জবাবদিহির ব্যাপারটা স্মরণে রাখেন, তা হলে জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা জিরো টলারেন্সে সফল হতে পারবেন, অন্যথায় নয়।

আর একটি বিশেষ কথা মনে না রাখলেই নয়, তা হলো, মন্ত্রীপদে বসে নিজেদের বাহাদুর ভাবা ছাড়তে হবে। গত ১০ বছরে দেখেছি, সুযোগ পেয়ে মন্ত্রিরা কীভাবে শুধু নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার হয়, এমন লোকদের পক্ষেও কাজ করেছেন, যারা আওয়ামী লীগের জন্য কখনো শুভকামনা করেননি। অথচ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী হাজার ভালো কাজ নিয়ে গেলেও তারা সে-কাজ নিয়ে হয় টালবাহানা করেছেন অথবা একেবারেই করেননি। এমনকি সব নিয়ম মেনে মন্ত্রীর দপ্তরে ফাইল নিয়ে গেলেও সে-কাজে তারা আগ্রহ দেখাননি। আমার দুএকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তার সাক্ষর হয়ে আছে। নিজেরা অবৈধভাবে অনেক কাজ করেরও তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত কাজে তাদের অবহেলা আমাকে বিস্মিত করেছে। আর জনগণের দুর্ভোগকে হাসিমুখে উপেক্ষা করার ইতিহাস তো অনেক মন্ত্রীর মজ্জাগত। বিশেষত যারা দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যার পথটিকে প্রশস্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিরোধীশক্তিকে নিয়ে দল গঠন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদান্যতায় মন্ত্রী হয়ে তারা জনসাধারণকে যেমন উপেক্ষা করেছেন, তেমনি কবি-লেখক-সংস্কৃতিজীবীদের ন্যায়সঙ্গত দাবিকেও উপেক্ষা করেছেন। নেত্রী যে তাদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে যথার্থ কাজটি করেছেন, সেটা বুঝতে পেরে তারা এখন থেমে নেই। তলে তলে প্রতিশোধ নেবার জন্য সব ধরনের প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন! ১০ বছরে সাধের মুখের গ্রাস শেখ হাসিনা এমন করে কেড়ে নেবেন, সেটা তারা ভাবতে পারেননি বলে এখন ভেতরে ভেতরে ফুঁসছেন। সময়-সুযোগ পেলে বিষধর ফণা বের করে ছোবল দিতে একটুও দেরি করবেন না। মন্ত্রিসভায় নতুন যারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাদের সকলেই আওয়ামী লীগের। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বাইরে থেকে আসা বিভীষণদের যে নেত্রী ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন, সেটি তাঁর সাহসী সিদ্ধান্তের আর একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। নতুন মন্ত্রিদের বড় বড় কথা না বলে নেত্রীর হাতকে আরো বেশি শক্তিশালী করার জন্য যা কিছু করা দরকার, তাই করতে হবে, যাতে উচ্ছিষ্টভোগীরা সুবিধা না পেয়ে জোট থেকে চলে গেলেও নেত্রী কোনো ধরনের বিপদে না পড়েন। আপনারা এখন যারা প্রশাসনের হিরো, মানে মন্ত্রিরা, তারা এ-ব্যাপারে সবার আগে জিরো টলারেন্স দেখান, পরে না হয়  অন্যকিছু করবেন।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]