গৌতম বুদ্ধের সার্বজনীন সমাজ চিন্তা

আমাদের নতুন সময় : 23/01/2019

ড. অমল বড়ুয়া

বুদ্ধ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু সমাজ প্রতিষ্ঠা করেননি। তার ধর্ম সমাজহীন ধর্ম। নির্দিষ্ট কোনো সমাজ ব্যবস্থার তিনি প্রর্বতক নন বলে সুনির্দিষ্ট কোন বিধি বিধানও তার দ্বারা প্রচারতি হয়নি। দেখা গেছে একই পরিবারের বিভিন্ন লোক ভিন্ন ভিন্ন মতাবলম্বী। ব্যক্তি জীবনে কেউ হয়তো বুদ্ধের উপাসনা করেন, তার প্রর্বতিত নৈতিক নিয়ম মেনে চলেন। কিন্তু সামাজিক বিধি বা আচার আচরণ তার অন্যরকম। স্বামী বুদ্ধের অনুরাগী, স্ত্রী জৈন নিগ্রন্থদরে উপাসনা করেন অথবা পিতা ব্রাহ্মণের নীতি নির্দেশ মেনে চলেন। ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে ছেলে বুদ্ধের নিকট নীতি কথা শুনতে যান নিয়মিত। পালি সাহিত্যে এমন বহু ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
এই কারণে তখনকার ভারতবর্ষে নির্দিষ্ট বৌদ্ধ সমাজ গড়ে উঠেনি। যে সামাজিক নীতি নিয়ম সমাজ জীবনকে কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রাখতে পারে বুদ্ধ ভক্তদের মধ্যে তা ছিল না। সেই কারণে বুদ্ধোত্তর কালে দেখা গেছে পৃথিবীর সব ব্রাহ্মণদের জন্য যেমন একই ধরণের সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর নিয়ম রয়েছে বৌদ্ধদের জন্য তা নেই। বৌদ্ধেরা যে দেশে গেছেন তৎ তৎ দেশের সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলেছেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল বৌদ্ধদের একই রকমের সমাজব্যবস্থার প্রচলন নেই, যেমন অন্যান্য সমাজের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে বাঙালি বৌদ্ধদের বিবাহ পদ্ধতি, অন্নপ্রাশন, জন্ম-মৃত্যু প্রভৃতি সামাজিক ঘটনাগুলি প্রায় হিন্দু সমাজের অনুরূপ। ধর্মে এরা বৌদ্ধ কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা এদের স্বতন্ত্র নয়। মনে হয় এই ধরনের ব্যতিক্রম ইতিহাসে শুধুমাত্র বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এই অর্থে বৌদ্ধদের সমাজ জীবন ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।
সামাজিক বন্ধন নেই বলে তবে কি এরা সমাজ বহির্ভূত জীব? তা নয়, এদের সমাজ আছে তবে এটা ক্ষুদ্র সমাজ নয়, বৃহৎ মানব সমাজ।
ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে সমাজ আগে, তারপর ধর্ম এবং সকল ক্ষেত্রেই ধর্ম সমাজকে অনেকগুলি কঠোর নিয়মের দ্বারা একত্রে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু বৌদ্ধদের সমাজ নেই কিন্তু ধর্মই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছিলো একদা। বহু যুগ ধরে এই বাঁধন বহু সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনকে নানা দিক থেকে যে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল তার প্রমাণ আজও পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ভারতের মাটিতে তো এ দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
এখন খুঁজে দেখা প্রয়োজন ধর্মের বা গৌতম বুদ্ধের কোনো বাণী বা কথা এতগুলি মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছিল? এই বাঁধন তার নৈতিক আচার আচরণের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আসলে যথার্থ অর্থে বুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মমত প্রকাশ করেননি। তিনি প্রচার করেছিলেন কতকগুলি নৈতিক নিয়ম। যেগুলি তখনকার দিনের মানুষ খুব আগ্রহভরে তাদের জীবনে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ব্যক্তিজীবনে তারা যেমন এতে শান্তি পেয়েছিলেন তেমনি সমাজ জীবনকেও ঐক্যসূত্রে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তার কাছে আসতেন উপদেশ শ্রবণ করার জন্য। তার কথাগুলি ছিল খুবই যুক্তিগ্রাহ্য। তাছাড়া তিনি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে কোনো উপদেশ প্রদান করতেন না। এই ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রয়োগবাদী প্রবক্তা। ব্যক্তি জীবনে এবং সেই সঙ্গে সমাজ জীবনে যা উপকারে লাগানো যায় তেমন উপদেশ তিনি জনগণকে দিতেন। এতে মানুষ ভারী সন্তুষ্ট হতো। শুধু তত্ত¡ কথায় তিনি তার বাণী ভারপ্রাপ্ত করে তুলতেন না। তিনি সকলকে বলতেন তার কথা যুক্তি সহকারে বিচার করে দেখতে। যদি ভালো বলে বিবেচিত হয় তবে গ্রহণ করতে। জোর করে কারো উপর তিনি কোন কথা চাপিয়ে দিতেন না।
তৎকালে তার যে কথাগুলি সমাজের সকল শ্রেণির মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল তা হচ্ছে মেত্তা, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা।
মেত্তা বা মৈত্রী শব্দটির অর্থ হচ্ছে সকলকে সমভাবে ভালবাসা, যে ভালোবাসা মাতা তার একমাত্র সন্তানকে দিতে পারে। শিষ্য সংঘের প্রতি বুদ্ধের নির্দেশ ছিল মেত্তা বা মৈত্রী যেন মানুষের মনে ক্ষণস্থায়ী আবেগে কখনো পরিণত না হয়। পরন্তু এটা হবে মানুষের প্রতি মানুষের মনের স্থায়ী আবেদন। এই মন সর্বক্ষণ অনুরণিত হবে মানুষের সেবা ও শুভ চিন্তায়। এর প্রকাশ প্রতিফলিত হবে মানুষের সকল কথায় এবং কাজে। এই অবস্থায় মানুষের মন যখন রমিত হয় তখন সমাজের মঙ্গল না হয়ে পারে না। বুদ্ধের মতে মেত্তা বা মৈত্রী মানুষের মনের নৈতিক চেতনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই চেতনার দ্বারা যারা অনুপ্রাণতি হবেন তাদের পক্ষে পরের হিত চিন্তা ব্যতীত অন্য চিন্তা সম্ভব নয়। এতে মন থেকে রাগ দ্বেষ দূরীভূত হয়ে জীবনে দেখা দেয় প্রশান্ত সূর্যের স্নিগ্ধ আভা।
বুদ্ধ বলেছেন দুর্গত মানুষকে দেখে চিত্তে যে ব্যথার সঞ্চার হয় তাই করুণা। নিপীড়িত মানুষের প্রতি এই করুণার বারি বর্ষণ করার জন্য বুদ্ধ তার শিষ্যদের বারবার অনুজ্ঞা প্রদান করেছেন। করুণা অনুশীলনের সকল মহিমা নিহিত রয়েছে পরম শত্রæকে একান্ত বলে গ্রহণ করার মধ্যে।
বিবাদের প্রবৃত্তি মানুষের সহজাত। শুধু মানুষ কেন এই অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে অন্যান্য প্রাণীদরেও মুক্তি নেই। সুতরাং বিবাদ থেকে বিরোধ, বিরোধ থেকে অশান্তি। একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করুণা অনুশীলন করলে মানুষের মন থেকে বিবাদের প্রবণতা সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়।
মুদিতা শব্দের অর্থ হতে পারে সহানুভূতি। অন্যের কোনো সম্পদ প্রাপ্তিতে আপন মনে যে নিবিড় আনন্দের সঞ্চার হয় তাই মুদিতা। অন্যের প্রাপ্তিকে শান্ত মনে স্বাগত জানানোই এর প্রধান কাজ।
করুণা চিত্তে আবর্তিত হয় অপরের দুঃখ অবলোকন করে আর মুদিতার আবর্তন সম্ভব হয় অপরের সম্পদ অবলোকন করে। করুণার অবলোকন তখনই সম্ভব হবে যখন জগতের দুঃখে আমাদের মন ব্যথিত হয়ে উঠবে। ব্যথিত মনে করুণা এবং মুদিতা হবে শান্তির প্রলেপ। অন্যের সম্পদ সহর্ষ চিত্তে অনুমোদন করে নিতে না পারলে অন্তরে জাগবে ঈর্ষার ঝড়। মুদিতার অনুশীলন পরস্পর সহাবস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শুধু গ্রহণ করতে পারে না, বরং আমাদের মানসিকভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বলোকে পৌঁছে দেবে।
উপেক্ষার সর্বজন স্বীকৃত অর্থ হচ্ছে অন্তরে অনুভূত না-সুখ, না-দুঃখ অবস্থা। উপেক্ষা শব্দটিকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর দ্বারা বোঝানো যেতে পারে নিরপেক্ষ দৃষ্টি অথবা যথার্থভাবে অবলোকন করা অথবা স্ব-স্ব রূপে দেখা। জীবনের উত্থান পতনের পথে এ হচ্ছে সাম্যাবস্থা। নিন্দা-প্রশংসা, সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, গৌরব-অগৌরব জীবনের সমুখে যা কিছুই আসুক না কেন উপেক্ষা চিত্ত তাতে অবিচলিত থাকবে। সকল অবস্থাতে অবিচলিত থাকা এর প্রধান কাজ। এটা তার লক্ষণও বটে।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষার ভাবনা সেদিন মানুষের মনে যে ভাবনা ও সাহসের সঞ্চার করেছিল তা দিয়েই গঠিত হয়েছিল সমৃদ্ধ সমাজ জীবন। এই অবস্থায় মানুষের মনে কখনো অকুশল চিন্তা প্রবেশ করতে পারে না। সমগ্র অন্তর দিয়ে সে তখন বিশ্বজনের হিত কামনায় মত্ত হয়ে ওঠে। এবং এতেই সমাজ জীবনে নেমে আসে শান্তির প্রস্রবণ ধারা।
সমাজ জীবনের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই অথচ এই চারটি নৈতিক অনুশাসন তাদের দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলো। ফলে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক শ্রেণিহীন সমাজ ব্যবস্থার। এতে পরস্পররে মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুসর্ম্পক ঘৃণা বিদ্বেষ ভুলে পরস্পর পরস্পরকে ভাতৃরূপে আলিঙ্গন করেছে। ধর্ম নিয়ে ছিল না কোনো সংকীর্ণ চিন্তা। ধর্মকে রক্ষা করার জন্য ছিল না সংগ্রাম। বিশ্ব মানবতার উদার আকাশে তাকে মুক্তি দিয়ে নিজেদের জীবনকে তারা করেছিলো কঠোর নৈতিক নিয়মের সুবৃহৎ বলয়ের মধ্যে। এইভাবে সমাজহীন জীবনের চতুর্দিকে নেমে এসেছে সমৃিদ্ধর প্লাবন। ভারতের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সে প্লাবন ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]