বৌদ্ধধর্মীয় অনুশাসনে প্রবারণা উৎসবের ইতিবৃত্ত

আমাদের নতুন সময় : 23/01/2019

সুখময় বড়–য়া

প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুশাসনের অন্যতম এক ধর্মীয় উৎসব। আত্মন্বেষণ ও আত্মসমরপনের তিথি। এটি গৌতম বুদ্ধ তার ভিক্ষু সংঘের জন্য প্রবারণা অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন- ভিক্ষু তিন মাস বর্ষাবাস ব্রত পালনোত্তর আসে প্রবারণা। বর্ষাবাস ব্রত পালন কালে ভিক্ষুসংঘ সদ্ধর্মাচারের গভীরভাবে অনুধ্যান ও অনুবেদনে ব্যাপৃত থাকেন, তাই প্রতিটি বিহারে ভিক্ষুসংঘ পরস্পরের সাথে বাস করেও বর্ষাবাসকালীন প্রায় একাচারী জীবন যাপন করেন। কারণ এ সময় বর্ষা ব্রতের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ভিক্ষুসংঘ পরস্পরের সাথে আলাপচারিতা বর্জন করতেন গৌতম বুদ্ধ এরূপ নিস্প্রাণ মৌন ব্রত অবিধেয় বলেছেন।
গৌতমবুদ্ধ শ্রাবস্তীতে অনাথপিÐ শ্রেষ্ঠীর আরামে অবস্থানকালে কৌশল জনপদে বর্ষাবাস যাপনকৃত ভিক্ষুসংঘের জীবনাচার বিধি অবগত হয়ে বুদ্ধ বর্ষাবাস তিনমাস বর্ষাবাস ব্রত পালনোত্তর প্রবারণা পালনের সূচনা হয়। যা আজও যথাযথ শ্রদ্ধা, ধর্মীয় মর্য়াদায় ও আন্তরিক অনুশীলনের মাধ্যমে ভিক্ষুসংঘের ধর্মাচারের ধারায় গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে।
প্রবারণার শাব্দিক অর্থ প্রকৃষ্ট রূপে বারণ বা নিষেধকরণ। সেই নিষেধযোগ্য বিষয়সমূহ হলো- আচরণীয় ক্ষেত্রে ত্রæটি নৈতিক স্খলন এবং সর্বোপরি চিত্তের মল (লোভ, বিদ্বেষ ও মোহ) এগুলোর নিরোধমূলক অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকলে এগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়। প্রকৃত অর্থে এগুলোই হলো (লোভ, বিদ্বেষ ও মোহ) মানুষের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে মূল অন্তরায়। এই অন্তরায় হতে দুরে থাকার জন্য চঞ্চল চিত্তের জন্য দরকার পরিশুদ্ধ অবলম্বন। তাই ‘প্রবারণার’ আর একটি অর্থ হলো ‘বরণ’ অর্থাৎ শুভ, শুদ্ধ, সুন্দর ও সুআচারকে বরণ। বৌদ্ধ পরিভাষায় বলা যায়, অকুশলকে বারণ এবং কুশলকে বরণই হলো প্রবারণা। বলাবাহুল্য শুধু কৃতকর্মের জন্যই প্রবারণা নয়। গৌতম বুদ্ধের অনুজ্ঞা মতে চিত্তের অন্তলীন কামনা-বাসনা অথবা অনুমেয় ও আশান্বিত মনোবাসনার জন্যও প্রবারণা আবশ্যক। ত্রিপিটকের মহাবর্গ গ্রন্থে দেখা যায় বুদ্ধ ভিক্ষুদের বলেছেন- ‘ভিক্ষুগণ দৃষ্টশ্রæত ত্রæটি বিষয়ে প্রবারণা করিবে’।
প্রবারণার আর একটি বিশেষ গুণ হলো- এর মাধ্যমে সাংঘিক জীবনের পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতা, অপরাধ প্রবণতা দূরীকরণ এবং বিনয়আনুবর্তিতা সুদৃঢ় করণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেদিক থেকে প্রবারণার সরলীকৃত স্বরূপ হলো ‘আত্মশুদ্ধি ও উৎসব’।
ভিক্ষু সংঘ এই তিথিতে পরস্পরের কাছে স্ব-স্ব দৃষ্টশ্রæত অপরাধ প্রসঙ্গে মার্জনা কামনা করেন এবং জ্ঞাতসারে যদি কোনো অপরাধ ঘটে যায় তার জন্য বিনয় সম্মত প্রতিবিধান প্রদানের কাজটিও প্রবারণায় হয়। সুতরাং মহান ভিক্ষুসংঘের জীবনে প্রবারণার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবে কখন থেকে কীভাবে যে ফানুস উৎসবের সংযোগ হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা দুস্কর। শাস্ত্রে ফানুসের বৃত্তান্ত বিশেষভাবে দৃষ্টও হয় না। নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানে বুদ্ধের সময়ে ফানুস উৎসবের আয়োজন হতো এরকম কোনো ইঙ্গিত মেলে না। এছাড়া ফানুসের কথা কোথাও সরাসরি উল্লেখ নেই। জাতকে কার্তিকোৎসবের কথা দেখা যায় যা কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হতো।
এ উৎসব দু-তিন দিন স্থায়ী হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে এটিই অনুমিত হয় যে, সে সময় যেহেতু কঠিন চীবর দানোৎব (যা প্রবারণার পর হতে শুরু হয়) এত জাঁকজমক করে আয়োজন হতো না। এছাড়া বর্ষাবাস বর্ধিত করায় এবং আষাঢ়ীপূর্ণিমায় বর্ষাবাস ব্রত শুরু করতে না পারলে শ্রাবণীপূর্ণিমায় শুরু করার বিধান রয়েছে। সে হিসেবে বর্ষাবাস সমাপনোত্তর এটি কার্তিক উৎসব বলে ধরা হয়। এখানে বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও আনন্দ উৎসবের আয়োজন হতো। হয়ত তারই ধারাবাহিকতায় আজকের প্রবারণা পূর্ণিমায় বহুবিধ সামাজিক আনন্দ উৎসবের সংযোজন। যার ফানুস উত্তোলন একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এটি আজ শুধু ধমীর্য় বিষয় নয় অন্যতম একটি সামাজিক উৎসব। ফানুস উৎসব উপভোগ করার জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধ বিহারগুলোতে সমবেত হয়। প্রবারণা উৎসবের দিন সমাপনোত্তর ফানুস (আকাশ প্রদীপ) উড়িয়ে বৌদ্ধরা বিশ্বের সকলের সুখ, শান্তি ও সকল অন্ধকারকে পশ্চাতপদ করে আলোকিত সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির বিশ্বময় করার আর একটি প্রয়াসও বটে ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]