পথশিশু প্রেমিক ব্রাদার লুসিওর সাথে একদিন

আমাদের নতুন সময় : 27/01/2019

সুমন কোড়াইয়া

হাসি মুখে ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের পাশে বিএনপি বস্তির সামনে। তার সাথে আমার সকালের নাস্তা খাওয়ার কথা। তিনি বললেন, ভাই, আপনি তো আমার অতিথি, সকালে আমি শুধু চিড়া খাই কিন্তু চিড়াও শেষ হয়ে গেছে। সকালে আপনি কী নাস্তা খান? আমি বললাম, রুটি বা পরোটা। তিনি আমাকে রাস্তা পার হয়ে একটি হোটেলের সামনে নিয়ে গেলেন। সেখানে মো. ফয়সাল (২৫) পরোটা ভাজছিলেন। তার কাছ থেকে দুটি রুটি এবং দুটি পরোটা নিলেন। সাথে ডালভাজি। ব্রাদার আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ফয়সালের সাথে যে কিনা এক সময় তার ছাত্র ছিল। মানে এক সময় ফয়সাল পথশিশু ছিলেন। এখন প্রতিষ্ঠিত। নিজের একটি খাবার হোটেল আছে।
বিএনপি বস্তিতে প্রবেশ করলাম। বস্তির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি খাল। মনে হলো শিশু ও পঙ্গু হাসপাতালের বর্জ এই দিক দিয়েই যায়। ব্রাদারের বাসা বস্তির ভেতরে কাঠ ও টিনের তৈরি দু’তলায়। মাস শেষে তাকে ভাড়া গুনতে হয় দুই হাজার টাকা। বাসায় ফ্যান নেই। নেই খাট। তবে দুইটি বড় পুরোনো বাক্স দিয়ে খাটের মত বানানো হয়েছে যেখানে কোন মতে ব্রাদারের শরীরটা স্থান পায়। সকালের আলোটা এসে ঘরটাকে আলোকিত করে দিয়েছে। ঠিক যেমন ব্রাদার লুসিও আলো দিয়ে যাচ্ছেন হাজারা হাজার পথ শিশুর জীবনে।
আমরা নাস্তা খাচ্ছিলাম আর আলাপ চললো। জানতে চাইলাম ব্রাদার আপনার শৈশবের কথা বলুন। তিনি জানালেন, ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ ইটালির ন্যাপলি শহরে তার জন্ম। তারা দশ ভাইবোন। তিনি ছয় নাম্বর। তার বাবা এলিও বেনিনাতি, মা আন্টিনেটা মানজিলি। নয় বছর বয়সে বালক লুসিও কাপড় ও জুতার দোকানে কাজের পাশাপাশি তার পড়াশোনা চালিয়েছেন। পাশে ছিল গির্জা। যুক্ত ছিলেন স্থানীয় একটি যুব সংগঠনের সাথে। একটি মেয়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্কও ছিলো। কিন্তু আল্লা আমাকে অন্য দিকে ডাকলো। সেই সময় ইটালির উত্তরাঞ্চলে সেভসোতে একটি কারখানায় একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক মানুষ আহত হয়। ব্রাদার বলেন, ‘তখন আমি বুঝতে পারলাম পৃথিবী কোথায় যাচ্ছে। পৃথিবী প্রাধান্য দিচ্ছে টাকা পয়সা, সামাজিক অবস্থার দিকে। তখন আমার মনে হলো আমার জীবনটা উৎসর্গ করবো। টাকা পয়সা, মান সম্মান দিয়ে কী হবে, একদিন তো মারাই যাবো। আমি মানুষের জন্য জীবন দিব। তখন এক সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হলো। নাম রাউলফলেরো। তিনি ও তার স্ত্রী কুষ্ঠরোগীদের জন্য কাজ করতেন। আমি তাদের কল্যাণমূলক কাজ দেখে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হই। আমি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে পিমে সেমিনারীতে প্রবেশ করি। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে মিশনারী হই ’।
তিনি কয়েক বছর ইটালিতেই পালকীয় কাজ করেছেন। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংল্যান্ডে ইংরেজী শেখার জন্য যান। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি মিশনারী হিসেবে বাংলাদেশের দিনাজপুরে আসেন। বাংলা শেখার পর সুইহারী নভেরা কারিগরি স্কুলের ইনচার্চ ছিলেন চার বছর।
ব্রাদার বলেন, আমি কাজের ফাঁকে আমার সহকর্মীদের সাথে দিনাজপুর শহর দেখার জন্য বাই-সাইকেলে বের হতাম। সন্দেশ আমার খুব প্রিয়। একদিন সন্দেশ খেয়ে দিনাজপুর রেলস্টেশনে গেলাম শহরের বাস্তবতা দেখার জন্য। দেখলাম মা-বাবা ছাড়া ছোট ছোট শিশুরা একা একা থাকে। তাদের খাবার নেই, থাকার জায়গা নাই- এগুলো দেখে আমার খুব খারাপ লাগলো।
ফিরে এসে আমি আমার সুপিরিয়রকে বললাম, আমি পথশিশুদের জন্য কিছু করতে চাই। তিনি বললেন, ময়মনসিংহে তেইজে কমিউনিটিতে ব্রাদারদের সাথে রাস্তায় কাজ করেন। তেইজে ব্রাদারদের কাজ আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি তাদের সাথে দুই বছর কাজ করেছি। পরে পথশিশুদের জন্য কাজ করার জন্য আমাকে মিশনারী হিবেসে ব্রাজিলে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় বছর কাজ করেছিলাম। পরে বাংলাদেশে পথশিশুদের জন্য কাজ শুরু করি ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে।
পথশিশুদের জন্য কাজ করার কারণ কীÑ এই বিষয়ে ব্রাদার বলেন, আমি মানুষের ‘সম্পর্ক’কে খুব গুরুত্ব দেই। যে শিশুরা পথে থাকে- তাদের পিতা-মাতাদের সম্পর্কের অবনতির জন্যই তারা আজ পথে। আপনি দেখবেন, পথের বেশির ভাগ শিশুর পিতা-মাতার মধ্যে সম্পর্ক নাই। চিন্তা করুন, ঠিক কি পরিস্থিতিতে পড়লে একটি শিশু খাবার, আশ্রয়ের জন্য রাস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়? ওদের ভালবাসার পরশ দেওয়ার জন্যই আমি ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’ নামে সংগঠনের মাধ্যমে আজ করে যাচ্ছি। তিনি এক বছর ধরে সিলেটেও পথ শিশুদের জন্য কাজ করছেন। ব্রাদার লুসিও জানান, তিনি বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় আঠার বছর ধরে। তার কাজের পুরো অর্থায়ন হয় দেশীয় উৎস থেকে। যারা তার সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, তারাই শিশুদের শিক্ষা উপকরণ, ওষুধ, কাপড়, খাবার ইত্যাদির জন্য অর্থ দিয়ে থাকেন। এছাড়া ব্রাকের কাছ থেকে তারা কিছু অর্থ নিয়ে থাকেন তাদের কাজের জন্য। তিনি বলেন, অনেকে আমাদের টাকা দিতে চায়। কিন্তু টাকা দিতে আসলে আমরা আগে বলি, আপনাকের পথশিশুর জন্য কাজ করতে হবে, বছরে অন্তত একবার এসে পথশিশুদের সাথে সময় কাটাতে হবে, আপনার দেওয়া টাকা হতে হবে সৎ উৎস হতে আনা। আপনি যদি বৌকে মারেন, ঘুষ খান তাহলে আপনার টাকার দরকার নাই। ‘একবার সেন্ট যোসেফ স্কুলের এক শিক্ষক আমাদের দুই হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আমরা নিয়েছিলেম। কিন্তু সারা বছরে একবারও শিশুদের দেখতে আসেননি। আমরা পরে গিয়ে তাকে টাকা ফেরত দিয়ে এসেছিলাম। শিক্ষক মাইন্ড করেছিলেন। কিন্ত আমাদের কিছুই করার ছিলো না। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম সত্যিকারে পথশিশুদের জন্য তার দরদ নেই। তিনি শুধু ফরমালিটি করতে টাকা দিয়েছিলেন’ বলেন ব্রাদার লুসিও।
তিনি মনে করেন, গির্জা বা মসজিদের পাশে অনেক মানুষ ভিক্ষা করে। তাদের মানুষ ফরমালিটি মেইনটেইন করার জন্য টাকা দেয়। কিন্তু আমারদের কাজটা ফরমালিটি মেইনটেইন করার জন্য না। আমার চাই একটি শিশুও রাস্তায় না থাকুক। রাস্তা খুব খারাপ জায়গা। এখানে পদে পদে বিপদ আসে। মানুষরূপি পশু আক্রমণ করে, পশুপাখি, পোকামাকড় আক্রমণ করে, রোদ-বৃষ্টি, শীত, গরম কষ্ট দেয়। মানুষকে বুঝাতে চাই, পথশিশুর জন্য সবাই যদি দায়িত্ববান হয় তাহলে একদিন শিশুদের আর পথে থাকতে হবে না।
বাংলাদেশে পথশিশুদের অবস্থা কী- এই বিষয়ে তিনি বলেন, ব্রাজিলের তুলনায় এখানে দশগুণ বেশি পথশিশু রয়েছে। অবস্থাও খারাপ। ব্রাজিলের মানুষের তাও সমাজিক দায়িত্ববোধ রয়েছে। এখানকার মানুষ পথের শিশুদের মানুষই মনে করে না। সরকারের পক্ষ থেকে খুব সামান্য কিছু করা হয়। বর্তমানে কমলাপুরে রেলস্টেশনে পথশিশুদের অবস্থা দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে। বলতে বলতে ব্রাদারের চোখ ভিজে উঠে। আবেগাপ্লুত হয়ে যান তিনি।
তিনি বলেন, পথশিশু মানে যে শিশু পরিবার বা পরিবার ছাড়া রাস্তায় থাকে, রাস্তায় ঘুমায়, খায় সেই শিশুকে পথশিশু বলে। আবার কিছু শিশু আছে যারা বস্তিতে থাকে কিন্তু, খাবারের জন্য রাস্তায় যায়, ভিক্ষা করে, কোন কিছু বিক্রি করে। এই রকম শিশুর পরিমাণ ঢাকায় কমপক্ষে তিন হাজার হবে। তিনি বলেন, পথশিশু হয় তিন কারণে। এক হচ্ছে পিতা-মাতার খারাপ ‘সম্পর্ক’ এর কারণে। সম্পর্ক যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে পিতা বা মাতার সন্তানের প্রতি দরদ থাকে না। সেই শিশু সন্তান চলে যায় রাস্তায়। এদের পরিমাণই বেশি। তবে খুব কমই শিশু অতি দরিদ্রতা ও নদী ভাঙ্গণের কারণে পরিবার সহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় এসে আশ্রয় নেয়। আপনাদের কাজের ধরন কী- এই বিষয়ে ব্রাদার লুসিও বলেন, আমরা ঢাকায় কাওরানবাজার, সদরঘাট, কমলাপুর রেল স্টেশন, নিউমার্কেট ও সদরঘাটে আমাদের সেবা দেই। আমরা শিশুদের পড়াশোনা করাই, খেলাধুলা করাই ও স্বাস্থ্য সেবা দেই। আমারে ক্যম্প হয়ে থাকে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। সেখানে কমপক্ষে ১৫জন থাকে। আমি প্রতিটি শিশুর সাথে কথা বলি। তাদের শারিরীক সমস্যা কি তা জানতে চাই এবং সে অনুসারে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেই। অবস্থা বেশি খারাপ থাকলে হাসপাতালে ভর্তি করাই। তিনি বলেন, আমি শিশুদের বুঝাই, তোমাদের জীবনে মূল্য আছে। তোমরা রাস্তায় থাক তাতে কী, তুমি যদি পড়াশোনা কর। সুস্থ থাক। তুমিও বড় হয়ে বড় চাকুরী করতে পার।তিনি জানান, তাদের কাজের লক্ষ থাকে, শিশুটি যেন আর রাস্তায় না থাকে। সেটা শিশুদের বুঝানো। প্রথমে সেকথা শিশুদের বুঝানো হয়। তারা যদি রাজি থাকে তাহলে তাদের বিভিন্ন শিশু আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয় যেমন মাদার তেরেজা হাউজ, বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত শিশু আশ্রয় কেন্দ্র। ব্রাদার লুসিও আরো বলেন, আমি পথশিশুদের জন্য কাজ করলেও আমি কিন্তু একজন মিশনারী। আমি কাজ করি খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ মানুষের মাঝে ছড়ানো জন্য। যীশু বলেছেন, তুমি তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মত ভালবাস। আমি পথশিশুদের নিজের মত ভালবাসি। আমি পথশিশুদের কথা শুনি। তাদের সহমর্মীতা জানাই। ভালবাসা সার্বজনীন। মানুষ ভালবাসা কি সেটা বুঝতে পারে। আমি আমার কাজ দিয়ে খ্রিস্টে বাণী প্রচার করি।
আপনার কাজে কী কী চ্যালেঞ্জে আছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই দেশের কৃষ্টি বাধা দেয়। ছোট বড় এক সাথে কাজ করা, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এক সাথে কাজ করা এবং আমি বিদেশী, আমার চামড়া সাদা এটাও চ্যালেঞ্জ। লোকেরা খারাপ চিন্তু করে। মনে করে আমরা শিশুদের পাচার করবো। এটা আমাদের কষ্ট দেয়। মনে করে খ্রিস্টান বানানোর জন্য আমি কাজ করি। অবশ্যই আমি যীশুর কথা প্রচার করতে এসেছি। যীশু জীবন আনলেন। আমি একতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সংহতি প্রকাশ করতে কাজ করি। আমি যীশুকে প্রচার করি, মুখ দিয়ে নয় কিন্তু কাজ দিয়ে। ঈশ্বর ঈশ্বর বলে লাভ নাই। তার পক্ষে কাজ করাটাই জরুরী। তিনি বলেন, আমার এই দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার ইচ্ছে আছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আমি অক্টোবর মাসে সরকারের নিকট আবেদন করেছি। আমি এদেশকে ভালবাসী।
পথশিশুদের সংখ্যা কিভাবে কমানো যায় এই বিষয়ে ব্রাদার বলেন, পথ শিশু শুধু বাংলাদেশে না, কিন্তু সারা পৃথিবীতে রয়েছে। আমি মনে করি বড় ব্যাপার ‘ভালবাসা’। তারপরও এখানে কিছু আইন কানুন বানাতে হবে। কারণ মানুষ সহজে তাদের বাচ্চাদের ফেলে দেয়। এদেশে সন্তানদের ভরণ পোষণ করার নিয়ম কানুন আছে। কিন্তু অনেকে পালন করে না। অনেকে সহজভাবে একাধিক বিয়ে করে কিন্তু আগের ঘরের সন্তানদের কোন দায়-দায়িত্ব নেয় না। এটা বন্ধ করতে হবে। গরিব হলেও সন্তানরা যদি বাবা-মার সাথে থাকে সেটা সবচেয়ে ভাল। কারণ যদি আমি সন্তানদের ফাইভস্টার হোটেলে রাখি কিন্তু তাদের ভালবাসা নেই, যে ভালবাসা পিতামাতা দিতে পারে, আমিও সেই ভালবাসা দিতে পারি না। কারণ আমি পথশিশুদের আব্বা-আম্মা না। তাই দরিদ্রতা বড় ব্যপার না। বড় ব্যাপার বাচ্চাদের দায়িত্ব নেওয়া। অনেক মানুষ ভালবাসা ছাড়া বিয়ে করে। তারপর বাচ্চাদের দেখাশুনা করে না। এদেশে অনেক মানুষ আছে এক বৌকে ছেড়ে অন্য মেয়েকে নিয়ে চলে যায়। দেখা গেল আগের বৌয়ের ঘরে তিনটি বাচ্চা। সেই মহিলা তার তিন বাচ্চা নিয়ে কী করবেন? তিনি উপায় না পেয়ে রাস্তায় নামেন। তার সন্তান হয়ে যায় পথশিশু। এখানে ভালবাসার সম্পর্ক আসল বিষয়। পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, পরিবার মানে ভালবাসার সম্পর্ক। পরিবারে ভালবাসা না থাকলেই পথশিশুর সংখ্যা বাড়ে।
ব্রাদারের সাথে কথা শেষে। ব্রাদার আমাকে হাসিমুখে বিদায় জানালেন।
যে হোটেল থেকে খাবার কিনেছিলাম সেই হোটেলের কথা মনে আছে? মো. ফয়সাল (২৫) যে এক সময় পথশিশু ছিলেন। মো. ফয়সাল আমাকে জানালেন, তিনি একসময় পথে থাকতেন। ব্রাদার লুসিও তাকে পড়াশোনা, নৈতিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দিতেন। চিকিৎসা দিতেন। তিনি বলেন, আমি ব্রাদার লুসিও ভাইয়ের সেবা ও পরমর্শ পেয়ে আস্তে আস্তে অসৎ সঙ্গ ছাড়ি। নিজেকে সুস্থ রাখি। পড়াশোনা করি। পরে একটা হোটেলে আঠার বছর চাকুরী করেছি। এখন নিজেই এই হোটেল দিয়েছি। আমার জীবনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি আমার অভিভাবক। আমি ব্রাদারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
শুধু ফয়সাল না, ফয়সালের মত অনেক পথশিশু এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত। একজন প্রাক্তনপথ শিশু এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। আরেকজন সাভারে একটি কলেজে পড়ছে। এছাড়া প্রতি মাসে কমপক্ষে দুইজন পথশিশুদের ব্রাদার বিভিন্ন শিশু হোমে পাঠান যেখানে থেকে তারা পড়াশোনা করতে পারে।
এবার ব্রাদার কিভাবে পথশিশুদের সেবা দেন সেটা দেখার জন্য কাওরান বাজার ওয়াসা বিল্ডিং এর নিচে যাই। সেটা ছিল বিকাল বেলা। সেখানে শিশুরা ইতিমধ্যে হাজির হয়েছেন। সাট আট জন স্বেচ্ছাসেবকও আছেন। ব্রাদার লুসিও আসতেই তাকে ‘লেচু ভাই’ ‘লেচু ভাই’ বলে পথশিশুরা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। ব্রাদার লুসিও দারুণ উপভোগ করলেন লেচু ভাই সম্বোধন। তিনি শিশুদের তিনটি দলে ভাগ করে বসিয়ে দিলেন। স্বেচ্ছাসেবকরা শীতের সবজি, শীতের পিঠা ও শীতের ফুল আঁকতে দিলেন। তিনি তার চিকিৎসার সরঞ্জাম নিয়ে মাটিতে একটি প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে বসে পড়লেন। ইতিমধ্যে ব্রাদার সব পথশিশুদের একটি করে টোকেন দিলেন। সেখানে নাম্বার লেখা। ১ বলে ডাকতেই যার টোকেন নম্বর ১ সেই শিশু উঠে গেলো। ব্রাদার শিশুটির নিকট জানতে চাইলো তার কোথাও ব্যথা আছে কিনা। শিশুটি বললো তার বা পায়ে ব্যথা করে। ব্রাদার পা ভাল মত পরীক্ষা করে দেখলেন শিশুটির পায়ে কাঁচের টুকরা ঢুকে আছে। তিনি সেটা বের করে দিলেন, তারপর সেখানে ওষুধ লাগিয়ে দিলেন। শিশুটিকে নিজের স্বাস্থ্য বিষয়ে আরো বেশি সচেতন থাকার পরমর্শ দিলেন।
পথশিশু মো. রবিন (৯) থাকে কাওরানবাজারে একটি বিল্ডিং এর বাহিরে নিচের অংশে। যেখানে সহজে বৃষ্টির পানি পড়ে না। তার যখন বয়স আড়াই তিন বছর তখন থেকেই সে ব্রাদারের ক্যাম্পে আসে। সে বলে, ‘আমার মা তরকারি টুকায়। আব্বা দেশে থাকে। ব্রাদার আমাদের পড়ালেখা শিখায়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে শিখায়। বড় হয়ে আমি ডাক্তার হবো’। কাওরান বাজারের অনেক পথশিশু নেশা ড্যান্ডি খায়, রবিন বলে, আমি ড্যান্ডি খাই না। ব্রাদার বলেছে, ড্যান্ডি খাওয়া ভালো না। তাই আমি এগুলো খাই না। মিম আকতার (১৪) থাকে কাওরানবাজার বস্তিতে। সে বলেন, ব্রাদার অনেক ভাল মানুষ, স্বেচ্ছাসেবকরা অনেক কিছু শেখায়। বড় হয়ে তিনি বড় চাকুরী করে তার মাকে সাহায্য করতে চান। অনার্স পড়–য়া অমৃতা ডি’কস্তা পথশিশু সেবা সংগঠনের একজন স্বেচ্ছাসেবক। তিনি বলেন, যেসব শিশুরা আমাদের সংগঠনে আসে পড়াশোনা করার জন্য তাদের আমরা অআনুষ্ঠানিক পড়াশোনা করাই। যেমন আজ আমরা তাদের শীতকাল বিষয়ে শিখালাম। শিশুদের বলেছি শীতকালে খালি পায়ে না থাকতে, গরম কাপড় পরতে, হাত-পায়ে ক্রিম দিতে এবং শীতের সবজি বেশী করে খেতে। অমৃতা আরো জানান, এই সংগঠনে চেষ্টা করছে পথশিশুদের বিভিন্ন শিশু হোমে পাঠাতে যেন তারা সেখানে গিয়ে থাকার পাশাপাশি পড়াশোনা করতে পারে। ‘যেসব শিশুরা এখন বিভিন্ন হোমে আছে তাদের বেশির ভাগই তাদের নতুন জীবনে খুশি এবং তারা রেজাল্ট ভাল করছে’ বলেন অমৃতা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]