সময়ের বিকল্প ভাবনা

আমাদের নতুন সময় : 27/01/2019

ফাদার সুনীল রোজারিও

যীশুখ্রিস্টের জন্মদিন আর বছরের জন্মদিন, খ্রিস্টাব্দ ও তারিখ ভিন্ন হলেও দিন/বার কিন্তু এক। আর আজকে আট তারিখ যখন বছরের প্রথম কলাম লিখতে বসেছি, সেই বারটিও আবার মঙ্গলবার। হতেও পারে কারো কারো জীবনের শুরুর দিনটিও আজ। পাঠকবর্গ- আপনাদের ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের শুভেচ্ছা।
শ্রদ্ধাভাজনদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই জিজ্ঞেস করেছেন- ফাদার লেখালেখি তো করেন, তো বলুন তো বছরটি কেমন যাবে? বলতে পারতাম- আকাশটা ভেঙ্গে পড়বে, নক্ষত্র খসে পড়বে, সবকিছু বিলীন হয়ে যাবে মহাকালের মধ্যে। হতেও তো পারে, কারণ বাইবেলে একটা মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত দেওয়া আছে। যাই হোক বিকল্প ভাবনায় না গিয়ে আসল কথায় আসা যাক। বছরটি কেমন যাবে- এটা অনেকের ভাবনার বিষয়। আর বিষয়টি নিয়ে আসর জমালে প্রথমেই হাত উঠাবে- দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলার জন্যে। এই বিষয়ে গলাবাজি করার জন্যে আরো অনেকেই হাত উঠাবে। বাজার ঘাট, রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে যারা নিয়মিত হাজিরা দেয়- তারা প্রায় সবাই রাজনীতিবিদ। এখানে ডিগ্রি বলে কোনো কথা নেই। দুই বেলা অন্যের জমিতে হাল ধরলেও হারজিতের রাজনীতি নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করতে পারে। কথা কিন্তু ছোটোখাটো নয়। একটা দেশের রাজনীতির উপর নির্ভর করে বাকি প্রায় সবকিছু। এই ধরুন একাদশ নির্বাচনটা যদি প্রান্তে এসে নানা চক্রান্তে পড়ে বানচাল হয়ে যেতো তাহলে দেশের সার্বিক অবস্থা কেমন হতো?
এখনো বলা হলো না বছরটি কেমন যাবে। অনেকেই বলবেন- রাজনীতির ঘোরপ্যাচে পড়ে হরতাল, অবরোধের দিন শেষ হয়ে গেছে। প্রতিবাদের রাজনীতিতে এই পদ্ধতি এখন অচল। তবে রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদ আরো শক্তিশালী হবে। এটা কিন্তু আশার কথা নয়- অনেকটা একদলীয় ব্যবস্থাপনা। যেই ব্যবস্থাই হোক, সাধারণ মানুষ কিন্তু রাজনীতি নিয়ে অযথা সময় বিনষ্ট করবে না। কারণ মানুষ শিখে গেছে আর্থিক উন্নতি কীভাবে হয়। আগে যার ১০ বিঘা জমি ছিলো তার ঘরেও ভাত ছিলো না। আর এখন যার দুই বিঘা জমি আছে সেও স্বাচ্ছন্দে আছে। আধুনিক প্রযুক্তি চলতি বছরে প্রায় সব আর্থিক খাতকে আরো সমৃদ্ধশালী করবে। এতে করে বেশি লাভবান হবে দেশের ব্যবসায়ীগণ। ফলে দেশে ধনীর সংখ্যা আরো দ্রæত বৃদ্ধি পাবে। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটা বড় দাবি ছিলো ধনী গরিবের মধ্যে একটা সমতা তৈরি করা। সরকার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আরো প্রাধান্য পাবে। এদেশের যুব সমাজ বরাবরই সচেতন। তাদেরকে যেসব অঙ্গীকার দেওয়া হবে, তা নিয়ে যুব সমাজ অনেকদিন অপেক্ষা করবে না। কর্মসংস্থান তৈরি করা চারটিখানি কথা নয়। দেশে যেভাবে প্রবৃদ্ধি স¤প্রসারিত হচ্ছে তার সঙ্গে তাল রেখে কর্মসংস্থানও স¤প্রসারিত করতে হবে।
দুর্নীতি এদেশের বড় সমস্যা। জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপে গত বছর বৈশ্বয়িক বিনিয়োগ থেমে গিয়েছিলো। অনুকুল পরিবেশ না থাকলে বিনিয়োগ আসে না। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার তিনটি মূল শর্ত হলো, দুর্নীতি রোধ, নিয়ম কানুন সহজীকরণ ও পরিবহন ব্যবস্থা। দেশীয় সম্পদ ও উদ্যোগ দিয়ে উন্নয়নের রোল মডেলের কাঁটা একটা ডিগ্রিতে এসে স্থির হয়ে যাবে- যদি বিদেশি বিনিয়োগ না আসে। আমার মনে হয় চলতি খ্রিস্টাব্দ হবে বিদেশি বিনিয়োগের বছর। বছরের প্রথম তিনমাস যদি র্নিঝামেলায় কাটে তবেই বিনিয়োগ আসবে। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের শুরুতেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়েছে- এই বার্তাটি বিদেশি বিনিয়োগ আসতে সহায়তা করবে।
দেশের প্রধান আর্থিক জোনটা রাজধানী থেকে বের করতে হবে। চলতি বছর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুর কাজ শেষ হবে। আর তাতে করে বিকেন্দ্রীকরণ সহজ হবে এবং রাজধানীর উপর চাপ কমে আসবে। রাজধানীর উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে গোটা দেশ নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এই নীতি এখন অচল। এক জায়গায় মলম লাগিয়ে গোট শরীরের ক্ষত শুকানো যাবে না। গোট দেশের উন্নতি হলো একটা দেশের মোট প্রবৃদ্ধি। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মাথায় রেখেছেন বিধায় নেতা ও নেতৃত্ব বাছাইয়ে তা প্রতিফলিত হয়েছে। দেশকে শেকড় থেকে শিখড়ে নিয়ে যেতে হলে এটা একটা উত্তম কনসেপ্ট।
দেশে শিক্ষিতের হার বেড়েছে কিন্তু পেশাদারি শিক্ষার হার বাড়েনি। শিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের উপর কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ে। কিন্তু উদ্যোক্তা বাড়াতে হলে সাধারণ শিক্ষিতের হার বড় ফ্যাক্টর নয়- উদ্যোক্তা আসবে পেশাদারি শিক্ষা থেকে। সরকার সবকিছু করে দিবে- এই মনোভাব থেকে জনগণকে ফেরাতে হবে। বৈশ্বিক বাজার মোকাবেলা করার জন্যও পেশাদারি শিক্ষার প্রয়োজন। গোল্ডেন প্লাশ পাওয়ার চেয়ে পেশাদারি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে যেনো ব্যবসার মনোভাব ত্যাগ করে সেবার মনোভাব গ্রহণ করতে পারে। মনে রাখতে হবে- একটা দেশকে ধ্বংস করতে হলে যুদ্ধের প্রয়েজন হয় না- শিক্ষা পদ্ধতি ধ্বংস করাই যথেষ্ঠ। ইদানিং সচেতনশীল অভিভাবকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সন্তানদের পেশাদারি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার মনোভাব। একজন মণীষী বলেছেন, ‘যে শিক্ষার কর্ম নাই, সেই শিক্ষার মুখে ছাই।’ এই কর্মকেই আমরা বলতে পারি পেশাদারিত্ব।
রাষ্ট্র পরিচালনায় পেশাদারিত্ব চলতি বছরে আরো উন্নত হবে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যেই পালিত হবে স্বাধীনতার ৫০ বছরের জুবিলী আর স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর শত বছরের জন্ম বার্ষিকী। এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার দেশের মান উন্নয়নে জোড়ালো ভূমিকা হাতে নিবে। সেই সাথে সরকার বিদেশ নীতিতে গত পাঁচ বছরে যেভাবে এগিয়ে গেছে, আগামী পাঁচ বছরে আরো এগুবে।
শ্রদ্ধেয় পাঠকবর্গ, নতুন বছরটি আপনাদের জন্য বয়ে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও সৃষ্টির উন্মাদনা। সবাইকে শুভেচ্ছা। লেখক : পরিচালক, রেডিও জ্যোতি, বগুড়া সিটি, বাংলাদেশ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]