আজ শ্রীপ মী : সরস্বতী-পুজোর প্রথম দিন

আমাদের নতুন সময় : 10/02/2019

মানবর্দ্ধন পাল : আজ শ্রীপ মী ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালির জ্ঞান-বিদ্যা ও প্রযুক্তি-সংস্কৃতির দেবী সরস্বতীর আরাধনার দিন। কতো স্মৃতি মনে পড়ছে এই সরস্বতীপুজো নিয়ে! এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ষাট বছরের জীবনের অনেক স্মৃতি। সেই বাল্যকাল থেকে এই প্রৌঢ়জীবন পর্যন্ত।

দীর্ঘ এই জীবনে শিক্ষকতা করেছি প্রায় চৌত্রিশ বছর। বাকি ছাব্বিশ বছরের মধ্যে বছর বিশেক শিক্ষা-জীবন। সম্প্রদায়গত ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য কোথাও তেমন যুক্ত না থাকলেও এই শিক্ষা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যতোদিন যুক্ত থেকেছি, ততোদিন এই সরস্বতীপূজোর সঙ্গেও যুক্ত থেকেছি। শৈশব থেকে জেনে এসেছি যে, সরস্বতী বিদ্য-বুদ্ধি-জ্ঞানের আধারÑ সংস্কৃতির অধিষ্ঠাত্রী। তাঁর আশীর্বাদ-অভিশাপের ওপরই নির্ভর করে মেধা-মননে সাফল্য ও ব্যর্থতা!

তবে যতো বড় হয়েছি ততোই ভক্তিবাদের চেয়ে যুক্তিবাদ আমার মধ্যে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। কারণ ভক্তি ভাববাদেরই নামান্তর; আর যুক্তির দীপশিখা বিজ্ঞান ও বস্তুবাদের সোপান। তাই অতীন্দ্রিয় প্রীতির চেয়ে সংস্কৃতির প্রেমই আমাকে আকর্ষণ করেছে বেশি। একারণে যে কোনো পূজা-পার্বণে আধ্যাত্মিকতার চাইতে আনুষ্ঠানিকতাই আমাকে টানতো বেশি। সেই আনুষ্ঠানিকতাতে থাকতো সংস্কৃতির উপাদান।

সরস্বতী জ্ঞানদা বলে বাঙালি-অধ্যুষিত অ লে সনাতন বাঙালির প্রতিঘরে তো বটেই, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দেবীর পুজো হয়। এমন কি শিক্ষা-বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ছাত্রজীবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পুজোতে যাওয়ার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। বাড়িতেই পুজো হতো। সকালে উঠে কাঁচা হলুদের বাটা গায়ে মেখে স্নান করতাম। মা-ঠাকুরমা পুজোর নৈবেদ্য সাজাতেন। পুজোর আগপর্যন্ত উপবাস থাকতাম। পূজারি ব্রাহ্মণ এলে পুজো ও যজ্ঞশেষে অঞ্জলি নেবার পালা।

“জয় জয় দেবী চরাচরসারে

কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে

বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে

ভগবতী ভারতী বাগ্দেবী নমঃস্তুতে।

ফুল-বেলপাতা ও তিল-তুলসী অঞ্জলিতে নিয়ে, করজোড়ে পূজারির সঙ্গে আমরা সশব্দে মন্ত্র উ”চারণ করতাম। যাদের বাড়িতে পূজারি দেরিতে আসতো, তাদের স্কুল-পড়ুয়া সন্তানেরাও আমাদের বাড়িতে অঞ্জলি নিতো। পুজোর পরদিন দেবীকে নিবেদিত ফুল-বেলপাতা আসন থেকে সংগ্রহ করে প্রতিটি বইয়ের পাতার ভেতর রেখে দিতাম। বিদ্যাদেবীর আশীর্বাদ লাভের আশায় আমরা পুজোর আসনে আমাদের বই-খাতা-কলমও রাখতাম। নলখাগড়ার কলম ও দোয়াতে দুধের কালিও থাকতো আসনে। সেই দুধ-কালি ও কলম দিয়ে পুজোর পরদিন সকালে খাতার মধ্যে আমরা একশ’ সাত বার ‘শ্রীশ্রী সরস্বত্যৈ নমঃ’ লিখতাম। এসবের কোনোকিছুই এখন আর চোখে পড়ে না!

আমাদের পূর্বপুরুষের আবাস বিক্রমপুর বলে ঠাকুরমা সে-অ লের আচারবিধি পালন করতেন। শীতে মানুষের শরীরে যে লাবণ্যহীন রুক্ষতা দেখা দেয় তা দূর হতে শুরু করে সরস্বতীপুজো থেকে। তাই সেই তিথির নাম শ্রীপ মী। অর্থাৎ শীত-দৈত্যের কামড়ে মানবদেহের হারানো সৌন্দর্য ও লাবণ্য আবার ফিরে আসতে থাকে সেদিন থেকে।

শ্রীপ মীতিথিতে আমাদের বিক্রমপুরী ঐতিহ্য ছিলো, সেদিন ঘরে জোড়া ইলিশ আনা এবং তাতে তেল-সিঁদুর মাখিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে ঘরে তোলা। দুর্গাপুজোর দশমীতে ইলিশ খাওয়ার বাৎসরিক সমাপ্তি আর সরস্বতীপুজোর দিন থেকে আবার শুরু। সেই জোড়া ইলিশ সেদিন তেলছাড়া রান্নার বিধি ছিলো। এখন বুঝি, কার্তিক থেকে পৌষÑএই তিন মাস ইলিশ-ভোজনে মানার কারণ অন্যত্র। এই সময়টা ইলিশের প্রজননঋতু, তাই। এখন সরকারিভাবে এসময় ইলিশধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে।

আমার চৌত্রিশ বছরের শিক্ষকতা-জীবনে অন্তত ত্রিশ বছর কলেজের সরস্বতীপুজোর দায়দায়িত্ব পালন করেছি একাদিক্রমে। পুজোর বাজার থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় ম-প গোটানো পর্যন্ত। এর মধ্যে কতো অমø-মধুর ঘটনা-দুর্ঘটনা! মেয়েদের নিরাপত্তা, মাস্তান সামলানো, শৃংখলাবিধান, প্রসাদ বিতরণÑএসব তো আছেই!

এবার আমিই নেই! আর থাকবোও না। যতোদিন বাঁচি, যদি নিমন্ত্রণ পাই এবং সামর্থ্য থাকে, তবে হয়তো যাবো। কিš‘ সেই আনন্দ তো আর পাবো না! বলতে পারবো না, আমাদের কলেজ, আমাদের পুজোা!

এবার ছিলাম ঢাকায়। পুজো দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, জগন্নাথ হলের মাঠে সত্তরটি বিভাগের সত্তরটি পূজা একসঙ্গে। দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা, হাজার হাজার দর্শনার্থী, সকল ধর্মের, সকল বর্ণের, সকল বয়সের আবালবৃদ্ধবণিতা। পুজো হয়ে উঠেছে প্রকৃতই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসব। তবু বারবার মনে পড়লো সরাইল কলেজের কথাই। আমি এবার নেই, তাই খারাপ লেগেছে সকলেরই। টেলিফোনে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন স্বয়ং অধ্যক্ষ মহোদয়, পরিতোষবাবু, শিল্পীদি, বীণা এবং আরো অনেকে। সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথকে :

“যদি পুরাতন প্রেম বাঁধা পড়ে যায় নব প্রেমজালে

তবু মনে রেখো!”

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]