নির্বাচন গণতন্ত্রের বন্ধ দুয়ার খুলে দেয়

আমাদের নতুন সময় : 10/02/2019

খোন্দকার আতাউল হক : একটি দেশের সংবিধান হচ্ছে সেই দেশের জাতীয় সংসদ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে রেজিস্টার্ড দলিল। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান নামক দলিলটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই সংবিধানটি সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের ভোটে পাস করা হয়। কাজেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাংবিধানিক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তা মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ এই তিনটি রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক স্তম্ভকে পরস্পরের প্রতি আস্থা, সহযোগিতা এবং নিয়ম-কানুনের মধ্যে দৃঢ়চিত্ত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এছাড়াও দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সংবিধানকে মান্য করা।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৭২ সালের শেষের দিকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানি বর্হিশত্রুর দখল থেকে মুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। ১২ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের রেখে যাওয়া কোনো আইনের সংশোধন না করে এবং পাকিস্তান প্রিয় আমলাদের ক্ষমতায় রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মধ্যে তিনি বাঙালি জাতিকে একটি যুগোপযোগী সংবিধান উপহার দেন। যাকে রাষ্ট্রীয় দলিল বলা হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এতো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন এবং কার্যকর হয়েছে কি-না আমার জানা নেই। তবে এই সংবিধান নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক মহলের ভূয়সী প্রশংসা এবং সমালোচনাও রয়েছে।

সেই দিকে আমি যাচ্ছি না। আমি বলতে চাই বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভাগের বর্ণিত ১২, ২৭, ২৮ এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জনগণের মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানে প্রণীত মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি কতটুকু সম্মান বা আনুগত্য প্রকাশ করেছে সেটাই আমাদের দেখার বিষয়।

উল্লে­খ্য সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা রোধ এবং কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠির প্রতি বৈষম্য বা নিপীড়ন রোধ করার বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৭’এ উল্লেখ আছে, দেশের সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। সংবিধানের ২৮’এ বর্ণিত, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠি, বর্ণ, নারী পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’। ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তি জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোনো নাগরিককে বঞ্চিত করা যাইবে না’। আমাদের দেখার বিষয় সংবিধানের এই অনুচ্ছেদগুলোর কার্যকারিতার প্রতি রাজনৈতিক দলসমূহ এবং দলের নেতাকর্মীরা কী প্রতিপালন বা সুরক্ষা করে রাজনীতি করছেন? নাকি শুধু নেতার পক্ষে স্লোগানভিত্তিক রাজনীতি করছেন?

আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা বৃহৎ অংশ হুজুগপ্রবণ। তারা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে অনিহা প্রকাশ করে। অর্থাৎ তারা খোলা চোখে যা কিছু দেখে, তা খোলা মনে বলতে চায় না। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণাকে ভেঙে দিতে হবে। যাতে তারা খোলা চোখে যা দেখছে, তাই খোলা মনে বলতে পারে। সেই পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব জাতীয় নেতৃবৃন্দের। কারণ একমাত্র নির্বাচনই পারে গণতন্ত্র ও সমাজের সকল অংশের বন্ধ দুয়ার খুলে দিতে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সেদিকটা লক্ষ্য রেখে, তাদের অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় জনগণের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। আমাদের হুজুগে নেতাকর্মীদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দিতে হবে। কেবল স্লোগান সর্বস্ব করলেই হবে না। বরং তাতে গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শই মুখ থুবড়ে পড়বে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে বিএনপিসহ বিশ দল এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট হয়েছে। নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দল জোটগতভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এ সকল জোটভিত্তিক রাজনৈতিক দলের মুখ্য স্লোগান ছিল নেতার পক্ষে ক্ষমতা কেন্দ্রিক। গণতন্ত্রে পরমতসহিষ্ণুতা, কার্যকর সহাবস্থান, সম্পর্ক সুরক্ষা হলেও এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রায়োগিক জোট হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিজেদের কৌশল হিসেবে। গণতন্ত্র এবং সুশাসনের বিষয়টি গুরুত্বহীনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এখানে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা এবং নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে রাজনৈতিক কর্মীবহিনীকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। অথচ আমরা সবাই জানি একমাত্র নির্বাচনই পারে গণতন্ত্র ও সমাজের সকল অংশের বন্ধ দুয়ার খুলে দিতে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]