সমাজের সর্বাঙ্গে এতো ঘা, মলম দেবো কোথা?

আমাদের নতুন সময় : 11/02/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
আমাদের সমাজের কোন অংশ নিয়ে এখন আমরা গর্ব করতে পারি- সেটি ভাবনার বিষয়, মস্তবড় প্রশ্নেরও বিষয়। এই মুহূর্তে ঢাকার চারপাশে নদীসমূহে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চলছে। তাতে দেখা যাচ্ছে নদীর তীরেই শুধু নয়, গভীরেও অনেকে স্থাপনা তৈরি করেছেন। বড় বড় ইমারত, বাজার, ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যুগ যুগ ধরে দখল করে আছে সমাজের অনেক প্রভাবশালী থেকে শুরু করে নি¤েœ অবস্থানকারী বিত্তহীন গোষ্ঠীও। অনেকেই সেখানে বস্তিও স্থাপন করেছেন। সরকারি প্রশাসনের অনুমোদনে খাজনা-ট্যাক্সও দিচ্ছেন। অথচ সবকিছুই অবৈধভাবে দখল করা জায়গায় নির্মিত প্রতিষ্ঠান। জায়গাগুলো হচ্ছে বুড়িগঙ্গা তুরাগের মতো নদীতে। এতোদিন এসব অবৈধ জায়গা দখল ও স্থাপনা প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন বলে আসছিলেন, দাবিও জানিয়ে আসছিলেন, কখনো কখনো সরকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছিলো, আবার যথারীতি সেগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। উচ্ছেদকৃত জায়গায় পুনরায় দখলদাররা স্থাপনা নির্মাণ করে বসেছিলেন। এটিই এখন ঢাকার চারপাশ ঘিরেই রয়েছে। এই অভিযান শেষ পর্যন্ত চলতে পারলে ঢাকা শহরের চারপাশ হয়তো মুক্ত হবে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। নদীগুলো নিঃশ্বাস নিতে পারলে আমরা ঢাকার অধিবাসীরাও শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবো। নদীতে থাকা মাছগুলো বাঁচতে পারবে। অথচ এই ঢাকা শহরের নদীর তীরের অনেকেই নিজেদের হীনস্বার্থে নদী তীরবর্তী জায়গাসমূহ দখল করে নিয়েছিলো। ঢাকার ভেতরেও অসংখ্য জায়গা রয়েছে যেগুলো ভূমিখোর নামক একশ্রেণির মানুষ দখল করে আছে। উচ্ছেদ অভিযান চললে সেই চেহারাও আমরা দেখতে পেতাম। চট্টগ্রামেও কর্ণফুলী নদীর তীরে অভিযান চলছে। চাক্তাই খাল তো অনেক আগেই দখল এবং ভরাট হয়ে আছে। যেকারণে বর্ষা এলে একটু বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম ডুবে যায়। আবার পানি নেমে গেলে ভুলে যায় সবাই এই প্লাবনের মূল রহস্য। এটি গোটা দেশেরই চিত্র।
মহামান্য হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার। এই কোচিং নিয়ে দেশে কম কথা হয়নি। সরকারি প্রজ্ঞাপনও কম জারি হয়নি। কিন্তু কোচিং কী বন্ধ হয়েছে? এই কোচিংয়ের সাথে কারা জড়িত, জড়িত না, কেন জড়িত, কেন না ইত্যাদি সবই আমাদের জানা। অথচ কোচিং চলছে বছরজুড়ে, বিদ্যালয় চলছে অর্ধবছর জুড়ে, কলেজ চলছে নামে মাত্র। লেখা নেই, পড়া নেই, আছে পরীক্ষা, আছে শিক্ষা সনদ। যে শিক্ষা সনদের মূল্য প্রায় নেই-ই। থাকলে এতো উচ্চ শিক্ষিত ছেলে বেকার কেন? লেখাপড়া জানাশোনায় এতো অভাব কেন?
সরকার নির্দেশ দিয়েছে গ্রামে গিয়ে হলেও ডাক্তারদের চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। অথচ শহরেই ডাক্তারদের একটা বিরাট অংশ সরকারি হাসপাতালে দুপুরের পর থাকেন না। তারা দৌড়ান বেসরকারি হাসপাতালে। অনেকেই সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত রোগী দেখেন। টাকা কামাই করেন, আবার বেসরকারি ক্লিনিকে টাকা উপার্জনের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে রোগীর পকেট কাটছেন, মালিকদের পকেট ভরছেন। সরকারি বিভিন্ন খাতে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দুদক এখন তাড়া দিচ্ছে। সামান্য ওয়াসা, গ্যাস কর্মচারী ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পিয়ন হলেও ঢাকা বা যেকোনো শহরের ভূমির মালিক হতে কষ্ট হয় না। অথচ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে চলার মতো করে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের খবর ভালো-মন্দ মিলিয়ে চলছে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উৎসবের আগে সিন্ডিকেট করে ভালোই কামাই করে নেন। মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কখনো মার খেয়ে রাস্তায় নেমে যান। আবার কেউ কেউ সিন্ডিকেট করতে পারলে উৎরে যান। অবৈধ্য ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন অনেকেই। তবে এই অবৈধরা সরকারের বৈধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই দিব্বি নানা ধরনের ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের এনবিআরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে র‌্যাব, পুলিশ, সাংবাদিক নিয়ে ‘ভেজাল বিরোধী অভিযান’ চালিয়ে নগদ জরিমানা আদায় ও বিশাল কর্মতৎপরতা দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ প্রয়োজন ছিলো সরকারি কর্মকর্তাদের সবকিছু নিয়ম মোতাবেক মনিটরিং করা, অভিযানে কোনো কৃতিত্ব নেই, ভেতরে রয়েছে সত্যকে লুকানোর হীনউদ্দেশ্য।
এভাবে সমাজের সব ক্ষেত্রেই তো দেখি ঘা লেগে দগদগ করছে। মলম না দেয়ার জায়গা কোথায়? ভাবতে হবে সবাইকে নির্মোহভাবে। এখন সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে মাঠে নেমেছেন। ক’জন শেখ হাসিনার এই দৃঢ় অবস্থানকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যাবেন সেটি দেখার বিষয়।
লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]