পশুর মাংস খেলে প্রাণী অধিকার খর্ব হয় না

আমাদের নতুন সময় : 08/03/2019

আবুল কাশেম ইয়াছিন

ইসলাম আদেশ করে সকল জীবের প্রতি দয়া ও অনুকম্পার নীতি গ্রহণ করতে। একই সাথে ইসলাম এ বিশ্বাসও লালন করে যে, পৃথিবীর যাবতীয় ফুল-ফল, উদ্ভিদ ও পশুপাখি এবং জলজপ্রাণী, সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষের জন্য। তাই মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে এসব সম্পদ ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায় সঙ্গতভাবে ব্যবহার করা। এ বিষয়ে আলোচনার আগেই একটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার যে, একজন মুসলিম সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী হয়েও প্রথমশ্রেণীর মুসলিম থাকতে পারেন। এটা বাধ্যতামূলক নয় যে, মুসলমানকে মাংস বা আমিষ খাদ্য খেতেই হবে। কোরআনুল কারিম মুসলমানদের আমিষ খাবার খেতে অনুমতি দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! পূরণ করো তোমাদের প্রতি সকল অর্পিত দায়িত্ব। তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে (খাবার জন্য) চতুষ্পদ জন্তু, যদি অন্য কারো নামে তা জবাই না হয়ে থাকে।’(৫: ১)
‘আর গৃহপালিত পশু তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য ওগুলো থেকে তোমরা উষ্ণতা পাও (গরমের পোশাক) এবং আরো অসংখ্য উপকারী জিনিষ। আর তা (গোস্ত) তোমরা খাও।’ (১৬:৫) ‘আর গৃহপালিত পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে শেখার মতো উদাহরণ। এগুলোর দেহ-অভ্যন্তর থেকে এমন কিছু উৎপাদন করি (দুধ) যা তোমরা পান করো। এতে অসংখ্য উপকার আছে তোমাদের জন্য আর ওসব (গোস্ত) তোমরা খাও।’ (২৩:২১)
১. মাংস পুষ্টিকর এবং আমিষে ভরপুর: আমিষ খাদ্য প্রোটিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎস। জৈবিকভাবেই তা প্রোটিন সমৃদ্ধ। আটটি অতি প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিড যা দেহের দ্বারা সমন্বিত হয় না। তাই খাদ্যের মাধ্যেমে তা সরবরাহ করতে হয়। মাংসের মধ্যে আরো আছে লৌহ, ভিটামিন বি-১ এবং নিয়াসিন।
২. উদ্ভিদেরও জীবন আছে: কেউ কোনো সৃষ্টজীবকে হত্যা না করে বেঁচে থাকতে পারে না। অতীতকালে মানুষ মনে করতো উদ্ভিদের প্রাণ নেই। অথচ আজ তা বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। কাজেই সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোজী হয়েও জীব হত্যা না করার শর্ত পূরণ হচ্ছে না।
৩. উদ্ভিদ ব্যথাও অনুভব করতে পারে: এর পরেও হয়তো নিরামিষভোজীরা বলবেন, প্রাণ থাকলে কি হবে উদ্ভিদ ব্যথা অনুভব করতে পারে না। তাই পশু হত্যার চাইতে এটা তাদের কম অপরাধ। আজকের বিজ্ঞান পরিষ্কার করে দিয়েছে উদ্ভিদও ব্যাথা অনুভব করে কিন্তু তাদের সে আর্ত চিৎকার মানুষই শোনার ক্ষমতা রাখে না। ২০ ঐবৎঃং থেকে ২০০০ ঐবৎঃং এর ওপরে বা নীচের কোনো শব্দ মানুষের শ্রæতি ধারণ করতে সক্ষম নয়। একটি কুকুর কিন্তু শুনতে পারে ৪০,০০০ ঐবৎঃং পর্যন্ত। এজন্য কুকুরের জন্য নিরব ‘হুইসেল’ বানানো হয়েছে যার ফ্রীকোয়েন্সী ২০,০০০ ঐবৎঃং এর বেশী এবং ৪০,০০০ ঐবৎঃং এর মধ্যে। এসব হুইসেল শুধু কুকুর শুনতে পারে, মানুষ পারে না। কুকুর এ হুইসেল শুনে তার মালিককে চিনে নিতে পারে এবং সে চলে আসে তার প্রভুর কাছে।
আমেরিকার এক খামারের মালিক অনেক গবেষণার পর একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে উদ্ভিদের কান্না মানুষের শ্রæতিযোগ্য করে তোলা যায়। সে বিজ্ঞানী বুঝে নিতে পারত, উদ্ভীদ কখন পানির জন্য চিৎকার করত। একেবারে এখনকার গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, উদ্ভীদ সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে এবং পারে চিৎকার করে কাঁদতেও।
৪. মানুষের দাঁত সব রকম খাদ্যগ্রহণে সক্ষম করে বিন্যস্ত : আপনি যদি পর্যবেক্ষণ করেন তৃণভোজী প্রাণীর দাঁতের বিন্যাস- যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া, হরিণ ইত্যাদি। আপনি দেখে আশ্চর্য হবেন যে, তা সব একই রকম। এসব পশুর দাঁত ভোঁতা (সমতল) যা তৃণ জাতীয় খাদ্য গ্রহণের জন্য উপযোগী। আপনি যদি লক্ষ্য করেন মাংসাশী পশুদের দন্ত বিন্যাস অর্থাৎ বাঘ, সিংহ, লিউপার্ড, শৃগাল, হায়েনা ইত্যাদি-এগুলোর দাঁত ধারালো যা মাংসের জন্য উপযোগী। মানুষের দাঁত লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যাবে সমতলের ভোঁতা দাঁত যেমন আছে তেমনি ধারালো এবং চোখা দাঁতও আছে। অর্থাৎ মানুষের দাঁত মাংস ও তৃণ উভয় ধরনের খাদ্য গ্রহনের জন্য উপযোগী।
কেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারে সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি চাইতেন মানুষ শুধু তরি-তরকারি খাবে তাহলে আমাদের মুখে ধারালো দাঁত ক’টি দিলেন কেন? এর দ্বারা এটাই কি প্রমাণিত হয়না যে, খোদ সৃষ্টিকর্তাই চান যে, মানুষ সব ধরনের খাবার গ্রহণ করুক।
৫. আমিষ ও নিরামিষ দুই ধরণের খাদ্যই মানুষ হজম করতে পাওে : তৃণভোজী প্রাণির হজম প্রক্রিয়া শুধু তৃণ জাতীয় খাদ্যই হজম করতে পারে। মাংসাশী প্রাণীর হজম প্রক্রিয়া পারে শুধু মাংস হজম করতে। কিন্তু মানুষের হজম প্রক্রিয়া তৃণ ও মাংস উভয় ধরনের খাদ্যই হজম করতে সক্ষম।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি চাইতেন আমরা শুধু নিরামিষ ভক্ষণ করি তাহলে তিনি আমাদেরকে এমন হজম শক্তি দিলেন কেন যা দিয়ে তৃণ ও মাংস উভয় ধরণের খাদ্যই হজম করা যায়?
৬. পশুর সংখ্যাধিক্য মানুষের বসবাসে হুমকি : পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যদি ফলমূল তরিতরকারী ও শাক সব্জিকেই খাবার হিসাবে বেছে নেয় তা হলে গবাদি পশুর আধিক্যের জন্য ভূ-পৃষ্ঠ ছেড়ে দিয়ে মানুষকে অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে বাস করতে হবে। আর খাল, বিল, নদী-নালা ও সাগর, মহাসাগর পানি শূন্য হয়ে যাবে মাছ ও অন্যান্য জ্বলজ প্রাণীর আধিক্যে। কেননা, উভয়শ্রেণীর জন্মের হার ও প্রবৃদ্ধি এত বেশি যে, এক শতাব্দী লাগবে না এ পৃথিবী তাদের দখলে চলে যেতে।
সুতরাং সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা খুব ভালো করে জানেন এবং বোঝেন। তাঁর সৃষ্টিকুলের ভারসাম্য তিনি কিভাবে রক্ষা করবেন। কাজেই এটা খুব সহজেই অনুমেয় যে, তিনি কি কারণে আমাদেরকে মাছ মাংস খাবার অনুমতি দিয়েছেন।
৭. সব পশুর খাদ্যগ্রহণ ইসলামে জায়েয নেই:
পশুর মধ্যে শুধু তৃণভোজী পশু খাওয়া অনুমোদিত। এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ একমত যে, ব্যক্তি যা আহার করে তার প্রতিক্রিয়া তার আচরণে প্রকাশ পায়। বাঘ, সিংহ, নেকড়ে ইত্যাদি হিংস্র মাংসাশী প্রাণী খাওয়া ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে- এটা তার অন্যতম একটি কারণ। সে কারণে ইসলাম শুধুমাত্র গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার মতো শান্ত ও খুব সহজে পোষমানা প্রাণীর মাংস খেতে অনুমতি দেয়। বস্তুত এ কারণেই মুসলমানরা শান্তিকামী এবং শান্তিপ্রিয়।
‘রাসূল তাদেরকে ভালো কাজ করতে আদেশ করেন। আর নিষেধ করেন যাবতীয় মন্দ থেকে এবং তিনি তাদের জন্য হালাল করেছেন যা কিছূ ভাল, পবিত্র, পরিচ্ছন্ন। আর হারাম করেছেন যা কিছু মন্দ অপরিচ্ছন্ন অপবিত্র।’ (৭:১৫৭)
‘রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু দেন তা তোমরা গ্রহণ করো। আর যে সব থেকে নিষেধ করেন সে সব থেকে বিরত থাকো।’ (৫৯-৭)
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত বেশ কিছু সর্বসম্মত হাদিসের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত মুলিম শরীফের ‘শিকার ও জবাই’ অধ্যায়ের ৪৭৫ নং হাদীসে, সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩ অধ্যায়ের ৩২৩২ থেকে ৩২৩৪ হাদীসসমূহ উল্লেখযোগ্য। রাসূল (সা.) খেতে নিষেধ করেছেনঃ
১. তীক্ষè ধারালো দাঁতওয়ালা হিংস্র জন্তু। অর্থাৎ মাংসাশী বন্য পশু প্রধানত বেড়াল ও কুকুর জাতীয় বাঘ, সিংহ, বেড়াল এবং শেয়াল, কুকুর, নেকড়ে, হায়না ইত্যাদি।
২. তীক্ষè দÐের অন্যান্য প্রাণী যেমন ইঁদুর, ন্যাংটি ইদুর, ছুঁচো ও ধারালো নখওয়ালা খরগোশ ইত্যাদি।
৩. সরিসৃপ জাতীয় অন্যান্য প্রাণী যেমন সাপ কুমীর ইত্যাদি।
৪. ধারালো ঠোঁট ও নখরওয়ালা শিকারী পাখি যেমন চিল, শুকুন, কাক, পেচাঁ ইত্যাদি। সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে পারে এমন কোনো বৈজ্ঞানীক দলিল নেই যে, আমিষ খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষ উগ্র ও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]