ওবায়দুল কাদের ও দেবী শেঠি বিতর্ক : আমার কিছু কথা

আমাদের নতুন সময় : 14/03/2019

ডা. আবদুন নূর তূষার

দেশের সব রোগী বিদেশে চিকিৎসা নেয় না। তারা সবাই ভিআইপিও নয়। কারো সামর্থ্য নেই, কারো বা ক্ষমতা নেই। আমাদের অনেকের প্রিয় একজন মানুষ ওবায়দুল কাদেরের দেশে বা বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে যারা বেশ কিছুদিন ধরে তর্কবিতর্ক করছেন তাদের মধ্যে চিকিৎসকরাও আছেন।

১. তিনি কেন বিদেশে যাবেন? কেন যাবেন না? বাংলাদেশে রোগীর অবনতি হলে বা মৃত্যু হলে ডাক্তারকে প্রহার করা হয়। কোনো কিছু না জেনে নানা রকমভাবে চিকিৎসকদের সমালোচনা করা হয়। তিনি বিদেশে গিয়ে বরং চিকিৎসকদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সেবায় বেঁচেছিলেন এবং উন্নতি করেছেন বলে বিদেশে যেতে পেরেছেন। তবে এই একই অবস্থায় বহু রোগী হাসপাতালে আসেন এবং সকল চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক সময় বাঁচেন না। কারণ চিকিৎসা সঠিক হলেও সকলের শরীর চিকিৎসায় একইভাবে সাড়া দেয় না। যদি কাদের ভাই সেদিন আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে না উঠতেন, তখন আপনারা কী বলতেন? তখন সকল চিকিৎসা সঠিক হলেও বলতেন, বাংলাদেশের ডাক্তার ভালো নয়।

২. তিনি ভিআইপি। অবশ্যই তিনি ভিআইপি। দেশের সবচেয়ে বড় দলের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রী, একসময়ের ছাত্রনেতা। তার চিকিৎসা দেশে-বিদেশে যে কোনোখানে হতে পারে এবং এই সিদ্ধান্ত তার পরিবার, তার প্রিয়জনরা এবং তার দলের সভাপতি ও নেতৃবৃন্দরা মিলে নিতেই পারেন।

৩. দেবী শেঠি কেন এলেন? অরুন্ধতি রায় কেন আসে? ভিএস নাইপল কেন আসে? শাবানা আজমি কেন আসে? অমর্ত্য সেন কেন আসে? সেমিনার সিম্পোজিয়ামে রাজ্যের বিদেশিরা যখন আসে, তখন কী আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মানহীন অপদার্থ বলে মনে হয় আপনাদের? মনে হয় তারা সত্য বলতে পারেন না বা তাদের লেখা বা কথা অকার্যকর? দেবী শেঠি এসে যখন বলেছেন এর চেয়ে ভালো চিকিৎসা কোথাও হতো না, তখনো আপনাদের মনে হচ্ছে না যে দেশের চিকিৎসকরা ভালো চিকিৎসা করতে পারেন?

এবার আমার কথা বলি : ১. দেশের চিকিৎসকরা এ রকম লাখ লাখ রোগীর চিকিৎসা করেন এবং তারা সুস্থও হন। ২. বাংলাদেশে কেবল এক বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আউটডোরে যে চিকিৎসা দেয় হয় পৃথিবীর বহু দেশে সারাবছরে সব হাসপাতাল মিলেও ততো লোকের চিকিৎসা হয় না। ৩. ঢাকা মেডিকেল বার্ন ইউনিটে কিছুদিন আগেও পাঁচশো সাঁইত্রিশজন রোগী ছিলো যেখানে বেডের সংখ্যা তিনশো। বাকি দুইশো সাঁইত্রিশজন কোথায় থাকে আর ঘুমায়? হাসপাতালের সকল সুবিধা , চিকিৎসকের সংখ্যা সবই কিন্তু তিনশো লোকের জন্য। তার মানে প্রতিটি ডাক্তার প্রায় দ্বিগুণ লোককে সেবা দিচ্ছেন । তার মানে আট ঘণ্টায় ষোলো  ঘণ্টার কাজ করছেন। ৪. চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেয়ার কোনো লোক নেই। যখন-তখন যে কেউ হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে এবং রোগীর আত্মীয়রা লিফটে উঠতে না পারলে সেকারণে চিকিৎসককে মারতে পারে। সরকারি চাকরিতে কর্মরত সকল কর্মকর্তার নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। এমন তো নয় যে সরকারি চাকরিতে যারা আছেন সবাই ভালো, কেবল ডাক্তাররা খারাপ? তাহলে অন্য চাকরিজীবীরা কেউ কেউ যদি কোনো অন্যায় করেন তাহলে তাদের গায়ে মানুষ হাত তুলতে পারে? ৫. ডাক্তারদের এই দুর্দশার জন্য দায়ী তারা নিজেরাই। তাদের সংগঠনগুলো রাজনৈতিক নেতা তৈরির মঞ্চ। তারা নিজেদের পেশার মানুষের জন্য দেনদরবার না করে নিজেরা এমপি, ডিরেক্টর, ভিসি, প্রিন্সিপাল হবার জন্য তদবির করেন। চিকিৎসক কেন গাড়ি কেনার সরকারি সহায়তা বা ধার পাবে না? কেন সরকার তাকে একটা স্টেথো দেয় না, দেয় না নিজের নামে ছাপানো একটা কার্ড? কেন তাকে ব্যবস্থাপত্র লিখতে হয় চিরকুট সাইজের কাগজের টুকরোতে, যেখানে এক লাইনে অনেক ওষুধের নামও লেখা যায় না? চিকিৎসকদের কেন ভ্রমণ কাহিনী লিখে পুরস্কার পেতে হয়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গ্রেড-১ আর চিকিৎসাবিদ্যার প্রফেসর গ্রেড-৩? এই প্রশ্ন করেছেন কোনোদিন নেতাদের?

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ভালো চিকিৎসা করে সেটা বোঝাতে ‘দেব দেবী’ হাজির করতে হয় কেন? হয় কারণ নিজেরা দেবতার আসনে না গিয়ে অনুগ্রহভাজন হবার প্রতিযোগিতা করছেন। আমি সরকারি চাকরি করি না। ডাক্তারদের সুবিধা নিয়ে কথা বলি কারণ আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের গর্বিত একজন ছাত্র। আমি সারাজীবন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। এখনো করি। আমি বলি, কারণ আমি হতাশ হই যখন দেখি দেশের ষোলো কোটি মানুষ যখন এই চিকিৎসকদের সেবাতেই প্রতিনিয়ত ভালো থাকছেন তখন গুটিকয়েক লোকের জন্য চিকিৎসক সমাজ তার মর্যাদার সংকটে ভোগে। আপনাদের চিকিৎসা যে ভালো হয় সেটা প্রমাণ করার জন্য কাদের ভাই কেবল একা নন, কোটি কোটি মানুষ সাাক্ষী। দয়া করে কাদের ভাইকে উদাহরণ বানিয়ে বারবার পোস্ট দিয়ে নিজেদের হেয় করবেন না। কাদের ভাইয়ের সুস্থতার জন্য বরং দোয়া করেন। আল্লাহ তাকে সুস্থ করে আপনাদের জন্য আত্মগৌরবের সুযোগ দিয়েছেন, এজন্য কাদের ভাইকে ধন্যবাদ দেন যে, তিনি নেতার মতোই কাজ করেছেন, সরকারি হাসপাতালে গেছেন। কোনো ‘একতাবদ্ধ’ বা ‘চতুষ্কোণ’ বা ‘গ্রিকদেবতা’ হাসপাতালে যাননি। আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সবাই ফেরে না। আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন । আলহামদুলিল্লাহ। যদি তিনি না ফিরতেন তবে যারা পোস্ট দিচ্ছেন তাদের অনেকেই হাসপাতালে থাকতেন এখন, রোগী হিসেবে। সূত্র : মেডিভয়েস ডটকম।

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]