• প্রচ্ছদ » » বিশেষ সাক্ষাৎকারে বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ পুত্র স্বাধীনতা পদকে ভ‚ষিত শিল্পী মুর্তজা বশীর
    রক্তাক্ত আবুল বরকতকে অন্যান্যদের সঙ্গে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়েছিলাম, ভাষাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা আমি পালন করেছি, সেই আমার কি কেউ খোঁজখবর নেয়?


বিশেষ সাক্ষাৎকারে বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ পুত্র স্বাধীনতা পদকে ভ‚ষিত শিল্পী মুর্তজা বশীর
রক্তাক্ত আবুল বরকতকে অন্যান্যদের সঙ্গে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়েছিলাম, ভাষাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা আমি পালন করেছি, সেই আমার কি কেউ খোঁজখবর নেয়?

আমাদের নতুন সময় : 14/03/2019

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশিক রহমান

একুশে পদকপ্রাপ্ত ও স্বাধীনতা পদকে ভ‚ষিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চিত্রশিল্পী মুর্জতা বশীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মৃত্যুর পর আমার মরদেহ যেন শহীদ মিনারা না নেয়া হয়। কেন এই ক্ষোভ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম একটা অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত সব মানুষের রাষ্ট্র। সেটি কি আমরা এখনো বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। আমরা চেয়েছিলাম, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন, সেটা কি এখনো আমরা করতে পেরেছি? আমরা চেয়েছি আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নত একটি রাষ্ট্র, যেখানে মানুষ আর্থিক-সামাজিকভাবে স্বাচ্ছন্দে থাকবে, সেটি কি এখনো নিশ্চিত করতে পেরেছি? একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী এখনো সংরক্ষণ করতে পেরেছি। সমুজ্জ¦ল আছে কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? সংস্কৃতি কি আছে সঠিক জায়গায়? চর্চা করি কি নিজেদের সংস্কৃতি? মানুষ ক্রমেই অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষকে সঠিক জায়গায় রাখতে হলে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে আমাদের নতুন সময়কে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভ‚মিকা স্বাধীনতা যুদ্ধে থাকলেও প্রধান ভ‚মিকা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরই ছিলো। তবে আমার যেটা মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ ও একুশের চেতনা অতেটা সমুজ্জল নেই যতোটা আমরা প্রত্যাশা করছি।
২০১৯ সালে এসে আমি স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছি। এতে আমি খুশি। কারণ পুরস্কারটা আমাকে দেয়া হচ্ছে চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য নয়, সার্বিকভাবে সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য। আমি কবিতা লিখেছি, ছোট গল্পও লিখেছি। শুধু চিত্রশিল্পী বিবেচনায় আমাকে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে না। এতে আমি অনেক সম্মানিত বোধ করছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অনেক বেশি সম্মানিত করেছে আমাকে। এই পুরস্কার জীবিত অবস্থায় পেয়ে খুশি আমি। কারণ পুরস্কার গ্রহণ করতে পারবো। মৃত্যুর পর দিলে তো তা দেখতে পেতাম না, নিজে গ্রহণও করতে পারতাম না। মৃত্যুর পর স্বাধীনতা পদক দিলে তা গ্রহণও করা হতো পরিবারের পক্ষ থেকে। কারণ আমার নিষেধ ছিলো। ছেলেমেয়েদের প্রতি আমার দুটি নির্দেশান ছিলোÑ এক. মৃত্যুর পর আমাকে স্বাধীনতা পদক দেয়া হলে তা যেন পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা না হয়। দুই. মৃত্যুর পর যেন আমাকে শহীদ মিনারেও না নেয়া হয়।
আমি আমার ছেলেমেয়েকে বলে রেখেছিলাম, রাষ্ট্র আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেবে, সেটা আজ হোক কিংবা কাল হোক। মরার পর হলেও স্বাধীনতা পুরস্কার আমাকে দেবে রাষ্ট্র। আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার না দিয়ে কোনো সরকারই থাকতে পারবে না। দিতেই হবে। আমার যোগ্যতাই তাদেরকে আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে বাধ্য করবে। এর পেছনেও কারণ আছে। কারণ আমি একজন ভাষা সংগ্রামী। আমি রক্তাক্ত (ভাষা শহীদ) আবুল বরকতকে অন্যান্যদের সঙ্গে ধরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়েছিলাম। ২২ ফেব্রæয়ারি ১৯৫২ সালের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে যে কালো পতাকা উড়ানো হয়েছিলো সেখানে আমি, হাসান হাফিজুর রহমানসহ অনেকেই কালো পতাকা উড়ালাম। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে চারু ও কারু শিল্পীদের যে প্রতিবাদ মিছিল শহীদ মিনার থেকে বের হয়েছিলো ‘স্বাধীনতা’ শব্দ লেখা ব্যানার নিয়ে তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম।
ভাষা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা আমি পালন করেছি। সেই আমার কি কেউ খোঁজখবর নেয়? ফেব্রæয়ারি মাসে, একুশে ফেব্রæয়ারির আগে টেলিভিশন বা পত্রিকাগুলো থেকে ফোন করা হয়। ফেব্রæয়ারি মাসের বাইরে অন্য কোনো সময় আর কেউ কোনো ফোন দেয় না। খোঁজখবর রাখে না। আমি অসুস্থ। সাতাশি বছর বয়স আমার। এসব কারণেই আমি বলেছি শহীদ মিনারে যেন আমার মরদেহ না নেয়া হয়। সন্তানদের প্রতি এই নির্দেশনা এখনো বলবৎ রয়েছে। এই অবস্থান ফিরবো কিনা এখনো আমি জানি না। কিন্তু ভাষা সংগ্রামী যাকে আমরা বলি, যে কারণে ভাষা সংগ্রাম হয়েছিলো তা আজও পরিপূর্ণ হয়নি। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা এখনো প্রচলন হয়নি। যে কারণে একাত্তর সালের পরে শহীদ মিনারে আমি যাই না। একাত্তরের আগ পর্যন্ত শহীদ মিনারে গিয়েছি। কারণ যাওয়া ছিলো নিজেকে পরীক্ষা করার একটা প্রতিবাদ। আমার বিচার সেদিনগুলো ছিলো কষ্টি পাথরে নিজেকে বিচার করার দিন। যে কারণে ভাষা শহীদ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হলেন তাদের ইচ্ছে পরিপূর্ণ হলো কিনা।
আমার কোনো টাকাপয়সা নেই। পুরো পেনশন বিক্রি করে দিয়েছি, এতে আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। তারপর যা কিছু অর্থ ছিলো তাও প্রায় শেষ। কারণ ২০১৩ সালে আমি অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম। আমার স্ত্রী হাসপাতালে ছিলেন ২০১৪ সালে। ২০১৭ সালের ১৩ মে তিনি মারা গেলেন। এই সময়ের মধ্যে আমার সত্তর লাখ টাকা খরচ হয়ে গেলো। আমার হজ করার খুব ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু হজ করতে পারছি না। কারণ আমার অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে। অক্সিজেন মাস্ক সাথে নিয়ে আমাকে কথা বলতে হয়। আপনার সঙ্গেও যখন কথা বলছি, অক্সিজেন নিয়েই কথা বলতে হচ্ছে আমার। শারীরিক এই পরিস্থিতিতে গিয়ে হজ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। বদলি হজ করার ইচ্ছা আমার। সেজন্য টাকা দরকার। আমার তো সেই টাকা এখন আর নেই। চলছে কোনোরকমে। বদলি হজ করার জন্য ৪ লাখ টাকা লাগে। স্বাধীনতা পদক থেকে ২ লাখ টাকা পাচ্ছি। আল্লাহ আমার ইচ্ছা পূরণের জন্য দিয়ে দিলো। আরও দুই লাখ টাকাও যোগাড় হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। হজের পুরো টাকা যদি রাষ্ট্র দেয় তা তো খুবই ভালো। আমার জন্য আনন্দের বিষয় হবে। দেবে কিনা তা তো জানি না।
১৯৮০ সালে আমি একুশে পদক পাই। আমার স্বাধীনতা পুরস্কার অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিলো বলে আমি মনে করি। ২০০৭ সালে যখন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন ডেইলি স্টার পত্রিকায় কারা কারা স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন তাদের নাম বেরিয়েছিলো। তার মধ্যে আমার নামও ছিলো। কিন্তু যখন পদক দেয়া হলো তখন দেখলাম আমি নেই। আমি পুরস্কার পাইনি! আমাকে তখন অনেকে ফোন করলেন। বললেন, এটা কেমন হলো, কীভাবে হলো? নাম পত্রিকায় প্রকাশিত হলো অথচ আপনি পুরস্কার পেলেন না। আমি ধর্মে বিশ^াস করি। কোরআনোর সূরা ইমরানে বলা আছে, আল্লাহ বলছেন, আমি কাউকে সম্মানিত করি না, সম্মান হরণ করি। আল্লাহ চাননি বলে তখন আমি পুরস্কার পাইনি। আল্লাহ না চাইলে আমি পুরস্কার পাবো কী করে? আল্লাহর ওপর তো কারও যাওয়ার ক্ষমতা নেই। এটা আমি বিশ^াস করি। আল্লাহ চাননি বলে এতোদিন আমি স্বাধীনতা পুরস্কার পাইনি। এখন আল্লাহ চেয়েছেন, পুরস্কার গ্রহণ করতে যাচ্ছি।
স্বাধীনতা পদক পেতে কেন আমার এতোদিন অপেক্ষা করতে হলো? কেন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করা মানুষেরা সময় মতো মূল্যায়িত হন না? কেন রাষ্ট্র এতোটা বিলম্ব করে? কোথায় সমস্যা? কারণ এখন প্রায় সবকিছু দলীয়করণ হয়ে গেছে। যদিও সব সময় সেটা বলা যায় না। সাধারণত প্রায় সবক্ষেত্রেই দলীয়করণ হয়ে থাকে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু দলীয়ভাবে হয়ে থাকে। যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ হয় না। এর মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম আছে। ব্যতিক্রমগুলো সংখ্যায় বেশি হওয়া উচিত। এতে দলীয়করণের দুর্নাম থেকে রাষ্ট্র রক্ষা পাবে। সমাজে গুণী মানুষ মূল্যায়িত হবেন। সমাজ ও রাষ্ট্র সঠিক প্রক্রিয়ায় চলবে। বাংলাদেশ ভালো থাকবে। বাংলাদেশ ভালো থাক আমরা কে না চাই? বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক আমরা কে না চাই? সবাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই আমাদের কাজ করা উচিত। কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত বলেও মনে করেন বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ পুত্র শিল্পী মুর্তজা বশীর।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]