• প্রচ্ছদ » » প্রকৃতি একই চক্রে ঘোরে, আমাদের ঘোরায়


প্রকৃতি একই চক্রে ঘোরে, আমাদের ঘোরায়

আমাদের নতুন সময় : 15/03/2019

আনিসুল হক

আব্বা মারা গেলেন যখন, তখন আমি বুয়েটে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। সেকেন্ড সেমিস্টার পরীক্ষা চলছিলো। স্কুল-কলেজের অভ্যাসবশত আমি খুবই মন দিয়ে পড়ছিলাম, যদিও ফার্স্ট সেমিস্টারে রেজাল্ট ভালো হয়নি তেমন। সামনে ফিজিক্স পরীক্ষা। মধ্যখানে কয়েকদিনের বিরতি। সন্ধ্যার সময় শহীদ স্মৃতি হলের টিভি রুমে বসে আছি বন্ধুদের সঙ্গে, রেসলিং দেখাচ্ছিলো, আমি রেসলিংয়ের ভক্ত ছিলাম না, কিন্তু বন্ধুরা দেখছে বলে আমিও টিভি রুমের ভিড়ে যোগ দিয়েছি। এ সময় মামা এলেন হলে। ডেকে বললেন, রংপুর যাচ্ছি অফিসের কাজে, তুই যাবি? আমি বললাম, পাগল, আমার তো পরীক্ষা। মামা বললেন, তোর বাপের খুব অসুখ বাহে, গেলে চল। আমি বললাম, যাবো। আমার মেজভাই, আশরাফুল হক তখন বুয়েটে ফোর্থ ইয়ারে, তার পরীক্ষা একদিন পরে, তিনি যেতে পারবেন না, আমি রাতের বেলা বিআরটিসি বাসের শেষ আসনে বসে যাচ্ছি রংপুর। সঙ্গে মামা এবং মামী। রাতের বেলা যখন বাসের মধ্যে ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ জেগে নেই, আমার মনে প্রশ্ন জাগলো,পরীক্ষার মধ্যে আমি রংপুর যাচ্ছি কেন? তার একটাই মানে, আব্বা বেঁচে নেই। আমি হু হু করে কাঁদতে লাগলাম। এতো কান্না। এতো কান্না।
ভোরবেলা নামলাম রংপুর শহরে। রিকশা নিয়ে যাচ্ছি, পাড়ার চায়ের দোকানগুলো সবে খুলছে, কেরোসিনের চুলায় পাম্প করছে দোকানিরা, জানুয়ারি মাস, খুব শীত আর খুব কুয়াশা, রাত্রিচর রিকশাওয়ালারা হুড তুলে চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি হয়ে রিকশার যাত্রী আসনেই বসে আছে, বাড়ি ফেরার সরু রাস্তার ওপরে দু’পাশের বাড়ির দেয়াল টপকে আছড়ে পড়ছে কামিনি ফুলের ঝাড় আর কুয়াশায় ভাসছে কামিনি ফুলের সাপ ডেকে আনা মাদকতাময় গন্ধ। আমি বাড়ি ফিরছি, সবাই আমার দিকে করুণ চোখে তাকাচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি, ওরা বলছে, মরহুমের আরেকটা ছেলে ফিরলো। বাড়ি গিয়ে দেখি, বাড়ি ভর্তি মানুষ। জিজ্ঞেস করি, আব্বা কোন ঘরে? বড় ভাইয়ের ঘরে আব্বাকে শুয়ে রাখা হয়েছে। আমি কাঁদছি না। সবাই বিস্মিত। বাবা মারা গেছে, ছেলেটা কাঁদছে না কেন? আমি কী করে বোঝাবো, সারারাত আমি কেঁদেছি। গত বছরও আমি আমার আব্বার কথা মনে করে কেঁদেছি। তার মৃত্যুর আটাশ বছর পরেও। আব্বার অকাল মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। যাই হোক, কুলখানি শেষে ঢাকা ফিরলাম। ফিজিক্স পরীক্ষা দিতে গেলাম। ফার্স্ট সেমিস্টারে ১০০তে ৭৮ পাওয়া ছিলো। সেকেন্ড সেমিস্টারে আর দুই পেলে পাস। একটা অঙ্ক করে খাতা জমা দিতে গেলাম। স্যার বললেন, এক ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। এক ঘণ্টা কোনো কাজ ছাড়া বসে থাকা যায়? এক ঘণ্টা পর বেল বাজলো, খাতা জমা দিয়ে চলে এলাম, আমার আশপাশে সবাই ভালো ছাত্র, এ সেকশনের, তারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলো, একটা পাগল হল ছাড়ছে। কিংবা লক্ষ্যই করলো না। আমার বুয়েটের ভাগ্য, ইঞ্জিনিয়ারিং ভবিষ্যৎ স্থির হয়ে গেলো।
আমার আব্বা অন্য সব বাবাদের মতোই ছিলেন একজন অদ্ভুত মানুষ। ছোটবেলায় আমরা বিশ্বাস করতাম আব্বা সকালবেলা ফজরের নামাজ পড়ে মর্নিং ওয়াক করতে গেলে পুকুরের পাড়ে দু’জন জিন উড়ে উড়ে যেতে যেতে তাকে সালাম দিয়েছিলো। আর একবার আব্বা একটা দাওয়াত খেয়ে দলেবলে ফেরার সময় স্টেশনে ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছিলো। আব্বারা ট্রেন থামাইবার দোয়া পড়লেন। অমনি ট্রেন থেমে গেলো। আব্বা বলতেন, শিশুকে প্রকৃতির বুকে ছেড়ে দাও। প্রকৃতিই তাকে শিক্ষা দেবে। আব্বা যে পিটিআইয়ে শিশু-মনোবিজ্ঞান পড়াতেন। তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, আমার ছেলেমেয়েদের কেউ মারতে পারবে না। আব্বার প্রিয় ছিলো রংপুর বেতারে ভাওয়াইয়া সংগীতের আসর, তিস্তা পাড়ের গান, বিকাল সাড়ে চারটায়। হরলাল রায় আর শরিফা ছিলেন তার প্রিয় ভাওয়াইয়া গায়ক। আব্বা গল্প করতেন বাবা, তোমরা তো কিছু খেতে পারলা না। আমাদের গ্রামের নদীতে পোলো ফেলা হতো, একেকটা মাছ উঠতো তোমার চেয়ে লম্বা। আমাদের মাছ খাওয়াতে না পারার সেই দুঃখ আব্বা মোচন করার চেষ্টা করতেন গোটা গোটা ইলিশ মাছ কিনে এনে। তখন মাঝে মধ্যে রংপুরের বাজারে ইলিশ মাছ খুব সস্তা হয়ে যেতো। আব্বা একজোড়া ইলিশ কিনে এনে বলতেন, রাতেই রাঁধো। মরি কি বাঁচি বলা তো যায় না। আমাদের বাসায় মেহমান লেগেই থাকতো। একটা মুরগি বারো টুকরা করতে হতো। আমার আব্বার ছিলো ডায়াবেটিসের রোগী। আব্বার মিষ্টি খাওয়া বারণ ছিলো। তিনি আমাদের সব ভাইবোনদের নিয়ে যেতেন মিষ্টির দোকানে। বলতেন, সবচেয়ে বড় রসগোল্লাটা দাও তো এদের। তখন ছয় টাকা দামের একটা বিশাল রসগোল্লা পাওয়া যেতো। সেটা দিয়ে আমরা শুরু করতাম। খেয়ে শেষ করা যায়! তারপর বলতেন, রসমঞ্জুরি খাও। আমরা মিষ্টি খাচ্ছি। আব্বা তাকিয়ে দেখছেন। আব্বার যে মিষ্টি খাওয়া বারণ ছিলো। আমাদের মিষ্টি খাওয়া দেখেই আব্বার মিষ্টি খাওয়া হয়ে যেতো। আব্বা যখন রিটায়ার করলেন, তখনও বড় ভাই ইন্টার্নি করছেন। আমরা বাকি চারজন, ভাইবোন ছাত্র। টানাটানির সংসার। আমরা ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছিলাম, সেই বৃত্তির টাকাতেই পড়ার খরচ নির্বাহ করার চেষ্টা থাকতো। আব্বা বলতেন আম্মাকে এই দিন তো থাকবে না, ছেলেমেয়েরা বড় হলে দেখো কী রকম দিন আসে। কতো শাড়ি পাবা। বড় ভাই ডাক্তার হওয়ার আগেই আব্বা মারা গেলেন। কিছুই দেখে যেতে পারলেন না। তার দুই ছেলেমেয়ে ডাক্তার হয়েছে, দেড়জন ইঞ্জিনিয়ার, আরেকজন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। আমার বৃদ্ধ আব্বাকে সাইকেল চড়তে হতো। বড় ভাই রাগারাগি করতেন। আব্বা সাইকেলে চড়েন কেন? আমার আব্বা কেন এতো তাড়াতাড়ি মারা গেলেন। আল্লাহর কাছে এই অনুযোগ আমাদের যায় না। আটাশ বছর পরেও নয়। অথচ যখন ছোট ছিলাম আব্বাকে আমার মনে হতো বেশি সরল মানুষ। রাস্তার লোককে ডেকে ডেকে বলতেন, শুনেছেন, আমার বড় ছেলেটা অমুক করেছে, ছোট ছেলেটা এই করেছে। তখন ভারি সংকোচ হতো, নিজের ছেলেমেয়েদের কথা এভাবে কেউ বলে বেড়ায়? আজ আমিও তো আমার মেয়েকে নিয়ে বলি। ভাস্তে-ভাস্তিদের নিয়ে গর্ব করি। এখন আর নিজের বোকামো নিয়ে সংকোচ লাগে না। হয়তো ওদের লাগে। কী আশ্চর্য, প্রকৃতি একই চক্রে ঘোরে, আমাদের ঘোরায়। একই পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসে। হয়তো নিজে বাবা হওয়ার আগে বোঝাও যায় না বাবা জিনিসটা কী রকম? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]