• প্রচ্ছদ » » পড়ালেখা আর মুক্তচর্চার বিকল্প কিছু নেই


পড়ালেখা আর মুক্তচর্চার বিকল্প কিছু নেই

আমাদের নতুন সময় : 15/03/2019

রাফি হক

মনটা খারাপ বলবো না, অস্থির হয়ে আছে নানা কারণে। একটি সুষ্ঠু সমাজ গঠন না হলে সুস্থ জীবনযাত্রার পরিবেশ বা অন্য সুষ্ঠু সবকিছু আশাও করি না। এই অস্থিরতা শুধু ব্যবসা, বাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, অফিস-আদালত, শহর-গ্রাম-গঞ্জের ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই আর… শিল্প-সাহিত্যের মানুষদের ভেতরেও এর প্রভাব প্রবল ও প্রকট।
আমরা যারা ছবি আঁকি, বড় শিল্পী। আমি সবাইকেই বড় ও মহান বলি। শিল্পীদের অহংকার আছে, ইগো আছে। অহংকার থাকবেই, কারণ সবাই ছবি আঁকি, বিপরীত ¯্রােতের মানুষ শিল্পীরা। যার যার অবস্থান থেকে আমরা সকলেই প্রতিভাবান। আমি আমার ক্ষমতা অনুযায়ী ছবি আঁকি, আরেকজন তার ক্ষমতা অনুযায়ী। নিজের ক্ষমতাকে অতিক্রম করে তো যেতে পারে না কেউ।
আবার ধরুন যাকে আমরা পাত্তা দিচ্ছি না বা অবহেলায় রাখছি… সেও হয়তো প্রতিভাবান তার মতো করে, তার ক্ষমতা অনুযায়ী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একজন আরেকজনকে দেখতে পারি না! ভেতরে কোথাও হিংসাহিংসিতে ভর্তি। সবাই ওপরে থেকে ক‚টনৈতিক হাসি দিয়ে কথা বলে, ভেতরে ফোরটিন জেনারেশন উদ্ধারের অগ্রগতি অভাবনীয়।
আমি প্রায়শ ভাবি, এই যে ছোট একটুকুন দেশ। কিন্তু এদেশের জনসংখ্যা আঠারো কোটি। নিয়মিত পেইন্টিং কিনে আঠারোজনও নেই। ভাবুন পরিস্থিতি এমন যে এ শতকরা হিসেবেও আসে না। আবার ছবির সংগ্রাহক বলতে যা বুঝায়… তা আঠারো কোটির ভেতরে পাঁচ বা ছয়জন। ছবির বাজার বলতে সারা বাংলাদেশে শুধু ঢাকার একটি ছোট অঞ্চল। গ্যালারির সংখ্যা চার-পাঁচটি। এটি আঠারো কোটি মানুষের একটি দেশের পেইন্টিং বাণিজ্যের গোটা চিত্র । তার মধ্যে এই শহরে বা দেশে না আছে শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের কোনো সম্মিলিত আড্ডা, না আছে আড্ডাকেন্দ্রিক ক্যাফে।
বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা নেই। শহরে শিল্পী কবিদের নাম জোড়ায় জোড়ায় উচ্চারিত হয় না। যেমন : পিকাসো-মাতিস, মোদেকগিøয়ানি-পিকাসো, জঁ কঁকতো-এপলোনিয়র, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, অরুণ মিত্র-সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু-জীবনানন্দ, সুনীল শক্তি, শামসুর রাহমান আল মাহমুদ, জয়নুল-কামরুল…। জঁ কঁকতোর একটি কথা আছে… ‘যে শহরে কবি শিল্পীদের নাম জোড়ায় জোড়ায় উচ্চারিত হয় না, সে শহর প্রকৃত শিল্প-সাহিত্যের চর্চা হয় না…’ এমন কথা বুদ্ধদেব বসুও বলতেন।
একটি কথা খুব সত্য যে, সমকালীন আধুনিক শিল্পের যে ধারা… তার ধারেকাছেও নেই আমরা। এখানে সেসবের সাকল্যিক চর্চাও হয় না। কোনো কোনো তরুণ শিল্পী নিজ উদ্যোগে নিউ আর্টের চর্চা করেন বটে তা উল্লেখ করার মতো নয়। আমরা যে শিল্পের চর্চা করি, তা দুইশো বছর আগের দৃষ্টিনান্দনিকতার চর্চা। পেইন্টিং ঘরে রাখা হবে, মিল করে সোফার সঙ্গে, টি-পটের সঙ্গে, কার্টুনের সঙ্গে, কার্পেটের সঙ্গে, কুশনের সঙ্গে… এসব হাবাজাবা বিষয়। আম-জাম লতা-পাতা কনসেপ্ট। এই কনসেপ্ট ১৯০৫ সালেই শেষ। দাদাবাদ এ কনসেপ্টের বুকে পেরেক কষেছে আর্লি নাইনটিথ সেঞ্চুরিতে। আমরা শিল্পীরা যেসব নৈশভোজ বা পানাহারে যাই… সেখানে না আর্ট, না সাহিত্য, না সিনেমা, না মিউজিয়াম, না আর্কিটেকচার… সেসব কিচ্ছু নিয়ে আলোচনা হয় না। আড্ডাও নয়। শুধু হু হা, ফুঁ ফা মাস্তি।
যতোই বড় বড় আব-ভাব করি না কেন… বিশ্বের বড় কোনো মিউজিয়ামে, নোটেড কোনো মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে আমাদের শিল্পীদের কাজ নেই তাদের সংগ্রহে। এমনকি নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম, নেপালের শিল্পীদের কাজও আছে। দেশের বাইরে বাংলাদেশ শিল্পীদের কাজ মূলধারা তো দূরের কথা, এলেবেলে ধারাতেও নেই। এখানে শিল্পের যে চর্চা হয় এটাই কেউ জানে না, ওসব দেশ। তবে এ দায় পুরোটাই আমাদের নয়, ওদেরও। তারপরও দেশের পরিচিত বিদেশে এখনও রানা প্লাজা, শাহবাগ আন্দোলন এসবে। এবারে এর সঙ্গে যোগ হবে নিশ্চয় চুড়িহাট্টা। এটাই সত্য।
আমি সবসময় বলি এবং ভাবি এটা যে, এই শহরে (দেশে আর বলি না, দেশটা ঢাকাকেন্দ্রিক) ব্যক্তিগতভাবে বা ট্রাস্টিদের মাধ্যমে পরিচালিত একাধিক কনটেম্পোরারি মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম থাকটা খুব জরুরি। না হলে কিন্তু আখেরে আমরা বিস্মৃত হবো। যেমনটি হয়েছেন আব্দুল বাসেত, রশীদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্ত্তীসহ আরও অনেকে। গতকাল কাইয়ুম চৌধুরীর জন্মদিন ছিলো। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও কেউ মনেও রাখেনি। মডার্ন পেইন্টার কিবরিয়া স্যার যেদিন মারা গেলেন স্যারের লাশ মরচ্যুয়ারিতে রাখা হয়েছে। কাইয়ুম স্যার মরচ্যুয়ারির চেম্বার ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন আর বলছেন… এদেশে কী কখনও কনটেম্পোরারি মিউজিয়াম হবে না? না হলে তো আমরা হারিয়ে যাবো। এতো বড় একজন শিল্পী আজ মারা গেলেন, দু’একজন বাদে কেউ জানলোও না…’
যেখান থেকে আমি শুরু করেছিলাম, একটা সুস্থ শিক্ষা, চর্চা, পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। পড়ালেখা আর মুক্তচর্চার বিকল্প কিছু নেই। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]