• প্রচ্ছদ » Uncategorized » বিতর্ক এড়ানো নয়, বিতর্কে জড়ানোই আমাদের অধিক পছন্দ


বিতর্ক এড়ানো নয়, বিতর্কে জড়ানোই আমাদের অধিক পছন্দ

আমাদের নতুন সময় : 15/03/2019

বিভুরঞ্জন সরকার : দেশের রাজনীতি, বিশেষ করে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের অনেকেরই আফসোস-অনুশোচনার শেষ নেই। রাজনীতিবিদদের কেউ কেউও রাজনীতি নিয়ে কৌতুক-বিদ্রুপ করতে ছাড়েন না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি, এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দুটি কথা প্রায়ই বলতেনÑ ১. রাজনীতির মধ্যে পলিট্রিক্স ঢুকে গেছে, ২. এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করছেন আর রাজনীতিবিদরা ব্যবসা করছেন। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ কম। এক সময় রাজনীতিবিদ বলতে আমাদের চোখের সামনে এমন মানুষের ছবি ভেসে উঠতো, যারা সরল সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত, ভোগ-বিলাস বিমুখ, মানুষের দুঃখ-বেদনায় কাতর, জেল-জুলুম নির্যাতনকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে প্রস্তুত একদল মানুষÑ এখন আর রাজনীতিতে তেমন মানুষ আর খুব একটা দেখা যায় না। জীবনে কিছু চাওয়া-পাওয়ার জন্য যারা রাজনীতি করেননি, রাজনীতি করে বিত্তবৈভব না বাড়িয়ে যারা বরং দিনদিন নিঃস্ব হয়েছেন, তাদের এখন মনে করা হয় ব্যর্থ মানুষ, রাজনীতিতে তারা এখন বাতিল বলে গণ্য। দেশের জন্য যাদের বুকভরা ভালোবাসা আছে, মানুষের দুঃখ মোচনের সংগ্রামে শামিল থাকার মতো একটি দরদি মন আছে কিন্তু পকেট বোঝাই টাকা নেইÑ রাজনীতিতে তারা এখন অপাঙক্তেয়।
রাজনীতি এখন কালো টাকার মালিক ও দুর্বৃত্তদের কবলে চলে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় সংসদ এখন ধনী কিংবা ব্যবসায়ীদের ক্লাবে পরিণত হচ্ছে। বিত্তহীন অথচ সৎ ও শিক্ষিত এমন প্রার্থীকে কি কোনো রাজনৈতিক দল মনোনয়ন দিতে আগ্রহী হয়? ভোটাররাও কি এমন মানুষদের ভোট দিতে চান? যাদের অঢেল টাকা আছে, নির্বাচনে যারা দুহাতে টাকা খরচ করতে পারেন, দলের তহবিলে যারা দিতে পারেন মোটা অঙ্কের চাঁদা, মাস্তান-পেশিধারীদের যারা পোষ মানাতে পারেন-নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে তাদেরইতো এখন কদর বেশি। পৃষ্ঠপোষকতা করবো কালোটাকার মালিক ও দুর্র্বৃত্তদের আর রাজনীতি কেনো অধঃপতিত হচ্ছে সে প্রশ্ন তুলে হা-হুতাশ করবোÑ এই স্ববিরোধিতা দূর না হলে রাজনীতি ভালো হবে কীভাবে?
আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থাও একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে সৎ থাকতে দেয় না । নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে কোনো বড় দলের প্রার্থীরা এই ব্যয়সীমার মধ্যে থাকেন না। কোনো কোনো প্রার্থী কয়েক কোটি টাকা ব্যয়েও কার্পণ্য করেন না। অথচ নির্বাচন কমিশনের কাছে যে হিসাব দাখিল করা হয় সেটা নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যেই থাকে। নির্বাচন কমিশন তা সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়। এজন্য কারো মানসিক অস্বস্তি বা গ্লানিবোধ নেই। এই যে একজন মানুষ সংসদে প্রবেশ করছেন অসত্য তথ্য দিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে সত্য কথা বলবেন, সৎ আচরণ করবেন সেটা কীভাবে আশা করা যায়? নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে এক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে কীভাবে?
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও সমস্যার গভীরে প্রবেশ না করে কিছু উপরভাসা সাময়িক বিষয় নিয়ে অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি করতেই পছন্দ করে। ক্ষমতায় যাওয়াই যাদের প্রধান লক্ষ্য তারা সমস্যা সমাধানের শর্টকাট পথ খোঁজে। নির্বাচন কমিশন যদি দুর্বল এবং অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থেকে যায় তাহলে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নির্বাচনী আইন প্রার্থীদের কঠোরভাবে মেনে চলতে বাধ্য করার মতো শক্ত মেরুদ- যদি নির্বাচন কমিশনের না থাকে তাহলে নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি দূর হওয়ার সম্ভাবনা কমই থাকবে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থিতা বাতিলের দৃঢ়তা যদি নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারে তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন ও পক্ষপাতমুক্ত করার ব্যাপারে আদৌ কতোটুকু সিরিয়াস? ক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করার বাসনা থেকেই কমিশন শক্তিশালী করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয় না।
আমরা চাই সৎ, শিক্ষিত, জনদরদি মানুষ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসুক। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে কি এধরনের প্রার্থীদের ভোট দেয়ার মতো সচেতনতা গড়ে উঠেছে? কোনো রাজনৈতিক দলের কি ভোটার সচেতন করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ আছে? এখন দেখা যাচ্ছে ভোটাররাও টাকাওয়ালা প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকে থাকেন। সাধারণ ভোটারদের অনেকেই মনে করেন, ভোটের আগেই তাদের যতোটুকু ‘দাম’, ভোটের পর আর তাদের খোঁজখবর কেউ রাখে না। তাই ভোটভিক্ষুকদের কাছ থেকে ভোটের আগে যদি নগদ কিছু পাওয়া যায় অথবা শাড়িটা লুঙ্গিটা জুটে যায়Ñ তাহলেই যেন ভোটাররা বর্তে যান।
সৎ ও যোগ্য প্রার্থী, তার পয়সা বা পেশিশক্তির জোর না থাকলেও তাকেই যে নির্বাচিত করা উচিতÑ এটা সাধারণ ভোটাররা মনে না করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। যারা কোটি টাকা ব্যয় করে নির্বাচনে জেতেন, তাদেরতো নির্বাচনের পর প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় ওই টাকাটা যেকোনোভাবে সুদে-আসলে তুলে আনা। ফলে এলাকার উন্নয়ন বা মানুষের দুঃখকষ্ট তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তার ব্যস্ত সময় কাটে সেইসব জায়গায় ধরনা দিয়ে, তদবির করেÑ যেসব জায়গায় টাকা বানানোর উপায় আছে। সংসদে উপস্থিত থাকা, আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার কথাও তার মনে থাকে না। জাতীয় সংসদে মাঝেমধ্যেই কোরাম সংকটের কথা শোনা যায় তার পেছনেও প্রধান কারণ সম্ভবত এটাই যে, তার কাছে রাজনীতির চেয়ে ব্যবসাটাই বড়।
দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উন্নত হয়। কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চায় আমাদের ব্যাপক অনাগ্রহ। আমরা গণতন্ত্রকে একদিনের ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করছি বলেই ভোটব্যবস্থাটাও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারছি না। আমরা ভালো কথা বলে খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতা করি। বিতর্ক এড়ানো নয়, বিতর্কে জড়ানোই আমাদের অধিক পছন্দ। আমরা বৃত্ত ভাঙার কথা বলে বৃত্তবন্দি হওয়ার পথে ধাবিত হই। আমরা কথা ও কাজে এক হবো কবে?
লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]