কালের সাক্ষী সিরাজগঞ্জের ‘নবরতœ মন্দির’

আমাদের নতুন সময় : 30/03/2019

ডেস্ক রিপোর্ট : সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়াা উপজেলাধীন হাটিকুমরুল ইউনিয়নের নবরতœপাড়া গ্রামে প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো  ‘নবরতœ মন্দির’ এলাকার ঐতিহ্য ও জনপদের না বলা ইতিহাস বুকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। প্রথম দেখায় দিনাজপুরের কান্তজি মন্দির বলে অনেকেই ভুল করেন এ মন্দিরকে। স্থানীয় পর্যটক ও প্রতœতাত্তি¡ক প্রেমীদের সীমিত পদচারণায় মাঝে মাঝে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির এলাকা।

দিনাজপুরের কান্তজি মন্দিরের মতো এই মন্দিরের প্রচার খুব একটা নেই বলে অনেকের কাছেই এটি এখনও অদেখা। স্থানীয়ভাবে দোলমঞ্চ নামে পরিচিত, এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরতœ মন্দির।

সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের পাশে হাটিকুমরুল বাস স্টেশন। দুইপাশের ধান ক্ষেত আর গ্রামীণ সবুজ জনপদ পেরিয়ে ছোট্ট একটি মেঠো পথ আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে উত্তর পূর্ব দিকে। এই পথে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই দেখা মিলবে পোড়ামাটির কাব্যে গাঁথা অনন্য এই প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন।

কারুকার্যমন্ডিত নবরতœ মন্দিরটি ৩ তলা বিশিষ্ট। এই মন্দিরে আশে পাশে আরও তিনটি মন্দির রয়েছে। পোড়ামাটির ফলক সমৃদ্ধ ৯টি চূড়া থাকায় এটিকে নবরতœ মন্দির বলা হয়। বর্তমানে ৯টি চূড়ার প্রায় সবগুলোই ধ্বংসপ্রায়। একসময় মন্দিরের মূল স্তম্ভের উপরে পোড়ামাটির সুশোভিত চিত্র ফলক,ফুল, ফল, লতাপাতা আর দেবদেবীর মূর্তি খচিত মর্ধ্যযুগীয় শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ ছিলো। সংস্কার ও কালের বিবর্তনে ওইসব এখন নেই বললেই চলে। বর্গাকার এই মন্দিরের আয়তন প্রায় ১৬ স্কয়ার বর্গমিটার। বর্গাকার মন্দিরের মূল কক্ষটি বেশ বড়। নীচতলায় ২টি বারান্দা বেষ্টিত একটি গর্ভগৃহ। এর বারান্দার বাইরের দিকে ৭টি এবং ভিতরের দিকে ৫টি প্রবেশ পথ। দিনাজপুরের কান্তজি মন্দিরের সঙ্গে প্রবেশ পথের সংখ্যার পার্থক্য দিয়ে এই মন্দিরকে সহজে চিনে নেয়া যায়। গর্ভগৃহের পূর্ব ও দক্ষিন দিকে ২টি প্রবেশ সুরঙ্গ পথ আর মন্দিরের ২য় তলায় কোন বারান্দা নেই। মন্দিরের প্রবেশ পথ পূর্ব দিকে, কুঠুরীর উত্তরে ওপরে উঠার সিড়ি। ভিতর থেকে মূল ভবনের উপরের ছাদ গোলাকার গম্বুজ। এ মন্দিরের প্রতিটি ইট ঘিয়ে ভেজে তৈরি করা হয়েছিলো বলে স্থানীয়ভাবে শোনা যায়। নবরতœ মন্দিরটি ‘সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান’ হিসেবে সরকারের প্রতœতত্ত¡ বিভাগ গ্রহণ করে ১৯৮৭ সালে; কিছু সংস্কারও করেছে সরকার।

সিরাজগঞ্জের এই নবরতœ মন্দিরসহ আশেপাশের মন্দিরগুলো আনুমানিক ১৭০৪ -১৭২০ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসন আমলে তার নায়েব দেওয়াান রামনাথ ভাদুরী নামক ব্যক্তি তৈরি করেন।বিভিন্ন সূত্রমতে, মথুরার রাজা প্রাণনাথের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুরী। মথুরার রাজা প্রাণনাথ দিনাজপুর জেলার ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অর্থ সংকটে পড়ে যান, এতে করে তিনি বাৎসরিক রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। এদিকে রামনাথ ভাদুরী বন্ধুত্বের খাতিরে নিজ কোষাগার থেকে টাকা দিয়ে রাজা প্রাণনাথের বকেয়া দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের আদলে হাটিকুমরুলে ১টি মন্দির নির্মাণের শর্তে পরিশোধ করেন। শর্ত মোতাবেক রাজা প্রাণনাথ কান্তজির মন্দিরের অবিকল নকশায় হাটিকুমরুলে এ নবরতœ মন্দির নির্মাণ করে দেন। আরেকটি তথ্যমতে, রাখাল জমিদার নামে পরিচিত রামনাথ ভাদুরী তার জমিদারি আয়ের সঞ্চিত কোষাগারের অর্থ দিয়েই এ মন্দির নির্মাণ করেন। তবে যেভাবেই তৈরি হোক, মন্দিরটি তার স্বরুপে এখনও আলো ছড়াচ্ছে। নবরতœ মন্দিরের উত্তর পাশেই শিব-পার্বতী মন্দির, তার পাশেই রয়েছে দোচালা চন্ডি মন্দির, দক্ষিণপাশে পুকুরের পাড়ে ঘিষে রয়েছে পোড়ামাটির টেরাকোটা কারুকার্যখচিত শিবমন্দির। সেগুলোও তাদের আকার ও নিজস্ব বৈশিষ্টের জন্য দেখার মতো। বাস ও ট্রেনে সহজেই যাওয়া যাবে ওই মন্দির এলাকায়। ঢাকা থেকে ওই মন্দিরে যেতে হলে সিরাজগঞ্জ রোড গোল চত্বর পেরিয়ে বগুড়া রোডে হাটিকুমরুল বাজারে নামতে হবে। সিরাজগঞ্জ রোড গোল চত্বর থেকেও ভ্যান যোগে সরাসরি ওই মন্দির প্রাঙ্গণে যাওয়া যায়।

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]