কৌলীন্য প্রথা ও বর্ণ বৈষম্য নিয়ে কিছু কথা

আমাদের নতুন সময় : 30/03/2019

নিতাইচাঁদ তালুকদার এফ.সি.এ

 

কৌলীন্য শব্দটির অর্থ হলো বংশগৌরব অথবা কুলগৌরব। বর্তমানে বলতে গেলে প্রায় সকলেরই বংশ পদবী বা টাইটেল থাকে এবং এটা নিয়ে গৌরব-অহংকার, আভিজাত্য প্রদর্শনের যে ধারা তাই মূলত কৌলীন্য প্রথা।  প্রশ্ন আসতে পারে সনাতন ধর্মে কি সেই সত্যযুগ থেকেই বর্তমান সময়ের মতো এমন পদবী প্রচলন ছিল? একটু লক্ষ্য করলেই আমরা খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাবো যে,মহাভারতে কৃষ্ণের নাম ছিলো “শ্রীকৃষ্ণ” এবং পঞ্চ পান্ডবের নাম ছিলো: যুধিষ্ঠির,ভীম, অর্জুন,নকুল,সহদেব। রামায়নে রামের নাম “রামচন্দ্র”। এই উদাহরন গুলোতে আমরা কি মিল দেখতে পেলাম? কোন নামের শেষেই কিন্তু কোন পদবী নেই! ঠিক একইভাবে দশরথ, বলরাম, বিশ্বামিত্র, শঙ্করাচার্য, শ্রীচৈতন্য প্রমুখ মহামানবের নামের শেষেও কিন্তু কোন পদবী বা টাইটেল ছিলো না।

ঈশ্বর শোষণ, মানুষে মানুষে ছোট-বড় শ্রেণীর ভেদাভেদ বা বৈষম্য সৃস্টি করতে বলেননি। তিনি চান তাঁর সন্তানরা সকলেই সকলের সঙ্গে সমব্যবহার করুন, পীড়িতের সেবা করুন।এই বিষয়ে সাম বেদের একটি শ্লোক খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করি-

যো দদাতি বুভূক্ষিতেভ্য পিড়িতানাং সহায়কঃ

দুঃখার্তাণাং সমাশিলষ্যতি তমেব ইশঃ প্রসীদতি।

অনুবাদ: ঈশ্বর খুশি হন, যখন তুমি সমব্যবহারের মাধ্যমে কোনো মানুষের চিত্তকে আনন্দ প্রদান কর। দুঃখীর দুঃখ ভার লাঘব কর, অত্যাচারিতের প্রতি অন্যায় আচরণের অবসান কর, আর্তকে সাহায্য কর এবং ক্ষুধার্তকে অন্নদান কর। এর থেকে কি স্পষ্ট বোঝা যায় না? সনাতন ধর্ম এবং সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রে কৌলীন্য প্রথা বা পদবী প্রথা ও শ্রেণী বৈষম্যের কোন স্থান নেই। মানুষের তৈরী এই সকল পদবি ও শ্রেণী বৈষম্যের ফলে মানুষে মানুষে সৃষ্টি হয়েছে দূরত¦-দ্ব›দ্ব, বর্ণভেদ বৈষম্যকে করেছে অনেক বেশি শক্তিশালী। এরফলে হিন্দু সমাজের হয়ে গেছে অপূরণীয় ক্ষতি। মানুষের তৈরী এসব বৈষম্য, বিভাজন-বিভক্তির ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ধর্মান্তরিত হয়েছে তথাকথিত নিম্নশ্রেণী ও বর্ণের হিন্দু সমাজের অসংখ্য মানুষ। অথচ সনাতন ধর্মের সংবিধানে এমন বৈষম্য, বিভাজন-বিভক্তির কোনো ভিত্তি বা অনুমোন নেই।

আর হিন্দু সমাজে এই কৌলীন্য প্রথা বা পদবী প্রথা ও শ্রেনী বৈষম্যের বিড়ম্বনার সাথে সাথে দেখছি বর্ণভেদ প্রথার বিড়ম্বনা খুববেশী প্রকট হচ্ছে। “বর্ণ” অর্থ হলো তাই যা গ্রহণ করা হয় পছন্দের দ্বারা। “বর্ণ প্রথা” বলে সনাতন শাস্রীয় ধর্মগ্রন্থ সমূহে মূলত কোন শব্দ নেই। আছে “বর্ণাশ্রম”। এখানে “বর্ণাশ্রম” এর শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় “বর্ণ” শব্দটি এসেছে “ঠৎহ” ৎড়ড়ঃ বা মূল হতে যার অর্থ হলো “ঞড় পযড়ড়ংব” বা পছন্দ করা। অর্থাৎ, পছন্দ অনুযায়ী পেশা নির্ধারণ করা। ‘বর্ণ’ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব কর্ম অনুযায়ী পছন্দগত, এর সাথে জাতি বা জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কালের পরিবর্তনে বর্ণাশ্রম হয়ে গেছে বর্ণ প্রথা! আমাদের সনাতন সমাজে চারটি বর্ণ প্রচলিত আছে। যথাঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।

ব্রাহ্মণঃ যিনি ঈশ্বরের প্রতি অনুরক্ত, সৎ, অহিংস, নিষ্ঠাবান, সুশৃঙ্খল, বেদ প্রচারকারী ও বেদ জ্ঞানী সেই ব্রাহ্মণ। ক্ষত্রিয়ঃ যিনি দৃঢ়ভাবে আচার পালন করেন, ঈশ্বরের সাধক, সৎ কর্ম করেন, রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন। অহিংস, সত্যের ধারক,ন্যায়পরায়ণ ও অসৎ এর বিনাশকারী এবং বিদ্বেষমুক্ত ধর্মযোদ্ধা সেই ক্ষত্রিয়। বৈশ্যঃ যিনি দক্ষ ব্যবসায়ী, চাকুরীরত এবং চাকুরী প্রদানকারী এবং দানশীল সেই বৈশ্য।

শূদ্রঃ যিনি অদম্য পরিশ্রমী। অক্লান্ত জরা যাকে সহজেই গ্রাস করতে পারেনা। যিনি লোভ-লালসা মুক্ত, কষ্টসহিষ্ণু তিনিই শূদ্র। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতভগবত গীতার ১৮ অধ্যায়ের ৪১ নং শ্লোকে বলেছেন,

ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বিশাং, শূদ্রাণাং চ পরন্তপ । কর্মাণি প্রবিভক্তানি, স্বভাব প্রভবৈর্গুণৈঃ ।।

অনুবাদ: “হে পার্থ, স্বভাবজাত গুণ অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্মসমূহ বিভক্ত করা হয়েছে” অথ্যাৎ, স্বভাবজাত গুণের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্ম বিভক্ত হয়েছে। জন্ম অনুসারে নয়। যদি মহাঋষি ব্যাসদেবের কথাই বলি। মহাঋষি ব্যাসদেব চারটি বেদ, অষ্টাদশ মহাপুরাণ, উপপুরান, বেদান্ত দর্শন, ভাগবত পুরান প্রভূতি সংগ্রহ করে সংকলন করেন। ব্যাসদেবের মা ছিলেন জেলেনী এবং সেই জেলেনী মায়ের বিবাহ বহির্ভূত কুমারীকালের সন্তান তিনি। যদি জন্মই জাতপাত নির্ধারণের মাধ্যম হতো তাহলে তো তিনি সর্বনিন্ম স্তরে পড়েন। শূদ্রানী মায়ের সন্তান হিসেবে নিজেই শূদ্র বলে বিবেচিত হতেন। কিন্তু বস্তুতপক্ষে, তিনি তার কর্মগুণ বিচারে একজন মহাঋষি। সুতরাং মানুষের জাত নির্ধারণের জন্য জন্মসূত্রকে কোনভাবেই বোঝাতে চাওয়া হয়নি। সময় এখন এসব বর্ণ প্রথা, কৌলীন্য প্রথা বা পদবী প্রথা ও শ্রেণী বৈষম্য গুলোকে বিদায় জানানোর। এসকল কুসংস্কার, বৈষম্য, বিভাজন আমাদের জন্য অনেক বেশী লজ্জাজনক। এই বৈষম্য গুলোকে বিদায় জানিয়ে আমাদের সনাতন সমাজকে কলংকমুক্ত করতে না পারলে সামনে এগিয়ে যাবার পথ কখনোই সুন্দর,মসৃণ ও সুদৃঢ় হবে না। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, নবাবগঞ্জ উপজেলা




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]