বাঙালি হিন্দু বিবাহ ও লৌকিক আচার

আমাদের নতুন সময় : 30/03/2019

পূজন চন্দ্র বিশ^াস

 

বাঙালিদের বিবাহ বলতে বোঝায় বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী বাঙালি হিন্দুদের বিবাহ-সংক্রান্ত নিজস্ব প্রথা ও রীতিনীতি। হিন্দু সমাজের বিবাহে প্রধানত দুইটি আচারগত বিভাগ লক্ষিত হয়। যথা- বৈদিক ও লৌকিক। অতীতে বাঙালি হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। বর্তমানকালে পরিণত বয়সেই বিবাহ প্রথা প্রচলিত। তবে বিবাহে পণপ্রথা এখনও বহুল প্রচলিত। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালি সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ আইনসিদ্ধ হয়। ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।

বিবাহে কন্যা স¤প্রদান করা হয়। তার মানে স্বামীই তার সকল দায়িত্ব নিয়ে নেন। তাই ধর্ম মতে কোন বিবাহ বিচ্ছেদ নেই। যদিও ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বিবাহ বিচ্ছেদ আইনসিদ্ধ হয়, যা কার্যকর করতে আদালতের আশ্রয় নিতে হয় । কারন বিচ্ছেদ সেখানেই সম্ভব যেখানে চুক্তি সম্পাদিত হয়। তাই হিন্দু আইনে স্ত্রী সারা জীবন স্বামীর কাছ থেকে সকলঅধিকার ভোগ করতে পারেন। স্বামীর সব কিছুই তার স্ত্রীর।

সংসারিক সকল সিদ্ধান্ত স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ- সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে। স্ত্রীকে সত্যিকার অর্ধাঙ্গী বলা হয়, কেননা স্বামীর যে কোন বিষয়ে স্ত্রীর মত গুুরুত্বপূর্ণ হিন্দু বিধান আনুসারে। স্ত্রী উপস্থিতি ছাড়া স্বামী যজ্ঞ বা কোন ধর্মীয় কার্যাদি পরিপূর্ণ করতে পারেন না। এছাড়া একমাত্র হিন্দু ইতিহাসেই দেখা যায় অনেক মহান রাজা তাঁর স্ত্রীর নিকট থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যপরিচালনার মত কাজও করেছেন।

বাঙালি হিন্দু বিবাহের লৌকিক আচার বহুবিধ। এই প্রথাগুলি বর্ণ, শাখা, উপশাখা এবং অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়। এগুলির সঙ্গে বৈদিক প্রথাগুলির কোনো যোগ নেই। বাঙালি হিন্দু বিবাহে লৌকিক আচারগুলো হলো-

দধি মঙ্গল: বিবাহের দিন বর ও কন্যার উপবাস। তবে উপবাস নির্জলা নয়। জল মিষ্টি খাওয়ার বিধান আছে। তাই সারাদিনের জন্য সূর্য্যোদয়ের আগে বর ও কন্যাকে চিড়া ও দৈ খাওয়ানো হয়।

গায়ে হলুদ: সংস্কৃত ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় গাত্রহরিদ্রা। হিন্দু ধর্মে কয়েকটি জিনিসকে শুভ বলা হয়। যেমন শঙ্খধ্বনি, হলুদ ইত্যাদি। প্রথমে বরকে সারা গায়ে হলুদ মাখানো হয়। পরে সেই হলুদ কন্যার বাড়ী পাঠানো হয়। কন্যাকে সেই হলুদ মাখানো হয়।

শঙ্খ কঙ্কন:কন্যাকে শাখা পরানো হয়। এরপর বিকালে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বর বরণ: বর বিবাহ করতে এলে তাকে স্বাগত জানান কন্যাপক্ষ। সাধাবনতঃ কন্যার মা তার জামাতাকে একটি থালায় প্রদীপ, ধান দুর্ব্ব ও অন্যান্য কিছু বরণ সামগ্রী নিয়ে বরণ করেন। এরপর বরকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় , দুধ এবং মিষ্টি খাওয়ানো হয় । সাত পাক: বিবাহের মন্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিড়িতে বসিয়ে আনা হয়। সাধারণতঃ কন্যার জামাইবাবুরা পিড়ি ধরে থাকেন। কন্যা পান পাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন। কন্যাকে পিড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়।

শুভদৃষ্টি: বিবাহের মন্ডপে জনসমক্ষে বর ও কন্যা একে অপরের দিকে চেয়ে দেখন। মালা বদল: কন্যা ও বর মালাবদল করেন। এই রীতির অর্থ হচ্ছে দুজন একে অন্যকে জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিলেন। অর্থাৎ অগ্নি সাক্ষী রেখে পিতামাতা ও অন্যান্য স্বজনকে সাক্ষী সামনে বর ও কন্যা বিবাহে সন্মতি জানান।

সম্প্রদান: কন্যার পিতা কন্যাকে জামাতার হাতে স¤প্রদান করেন। হিন্দু স¤প্রদায়ে হৃদয়ের মূল্য অনেক ! হিন্দু স¤প্রদায়ে কন্যার পিতা কন্যাকে বেদমন্ত্রে জামাতার হাতে স¤প্রদান করেন।

অঞ্জলি: কন্যা ও বর খৈ অগ্নাহুতি দেন। প্রচলিত বাংলায় একে বলে খৈ পোড়া। বৈদিক যুগে মানুষ নানা ধরনের শক্তির উপাসনা করতেন। অগ্নিও তাদের মধ্যে অন্যতম। সিঁদুর দান: বিবাহের শেষ রীতি হল বর কন্যার কপালে সিঁদুর লেপন করেন। বাঙালি হিন্দু নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরেন। অঞ্চলভেদে এই রীতি কিছু পরিবর্তিত হয়। প্রাচীন ভারতের শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে বিয়ের প্রকার বিন্যাস করা হয়েছিল। এর কয়েকটি ছিল সম্পূর্ণভাবে লোকাচার ভিত্তিক। তাতে কোন প্রকার মন্ত্রোচ্চারণ বা যাগযজ্ঞের প্রয়োজন হতো না। অন্যদিকে কয়েকটি বিয়ে ছিল শাস্ত্র অনুমোদিত। সেগুলোর মূল অনুষ্ঠান ছিল মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞ অনুষ্ঠান এবং কনেকে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী বরের হাতে স¤প্রদান।

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]