শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথাগুলি মেনে চললেই আপনি হবেন সদানন্দ

আমাদের নতুন সময় : 30/03/2019

প্রীতম ঘোষ

 

একদিন একটু শান্তভাবে বসে ভাবলেই বুঝবেন কী ভিষণ মানসিক টানাপোড়েনের এবং লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে কা’টছে আমাদের প্রতিটা দিন। কখনো ভয়, কখনো সংশয়, তো কখনো দুশ্চিন্তার মারে মন খিটখিটে হয়ে যায়, তো কখনো অফিসের কাজের চাপে বা সহকর্মীদের পলিটিক্সের মারে শরীর এবং মন ভেঙ্গে পড়ে। ফলে দিনের শেষে হাসতে যেন আমরা ভুলে যাই। সেই সঙ্গে পরিবারের সঙ্গেও বাড়তে থাকে দুরত্ব। এমন পরিস্থিতিতে আনন্দের সন্ধান মিলবে কীভাবে? কম-বেশি আমাদের সকলেরই একই অবস্থা। তাই তো সময় এসেছে এমন কিছু নিয়ম মেনে চলার, যা আমাদের অফুরন্ত আনন্দের সন্ধান দিতে পারে, দিতে পারে খুশির ছোঁয়া। কিন্তু কী সেই নিয়ম যা আমাদের এতটা অনন্দে রাখতে পারে? আজ থেক বহু বহু বছর আগে গঙ্গা পাড়ের দক্ষিণেশ্বরে এক মহান আত্মার পায়ের ছাপ পড়েছিল। যাকে আমরা সবাই রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব নামে চিনে থাকি। তিনি তাঁর জীবনকালে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু কথা বলে গেছেন যা আজকের দিনে মেনে চললে দুঃখ আপনার ধারে কাছেও ঘিষতে পারবে না। সেই সঙ্গে মন শান্ত হবে। হাজারো উচাটনের মধ্যেও জীবন ফিরে পাবে এক অপার শান্তি। আর এমনটা হলে অফুরন্ত অনন্দের ছোঁয়া পেতে যে সময় লাগবে না, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে । বাকি জীবনটা যদি সুখে-শান্তিতে এবং অপার অনন্দে কাটাতে চান, তাহলে আর অপেক্ষা নয়, চলুন বেরিয়ে পড়া যাক অফুরন্ত আনন্দের খোঁজে-

যত মত তত পথ: রামকৃষ্ণ দেব সুযোগ পেলেই বলতেন “যত মত তত পথ”। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ একই দেব-দেবীর পূজা করবেন এমনটা হতে পারে না। সবাই নিজের বিশ্বাস এবং ধারণার উপর ভিত্তি করে বেছে নেবেন নিজ ইষ্ট দেবতাকে। আর এমনটাই হওয়া উচিত। তবে তাই বলে ভাববেন না রাম বা কালী মায়ের পূজা করলে বেশি ফল পাবে, আর শ্যাম বা শিব ঠাকুরের পূজা করলে কম। কারণ নদীর দিশা আলাদা আলাদা হলেও তারা যেমন সবশেষে সাগরে গিয়ে মিলিতে হয়, তেমনি যে ভগবানেরই আপনি পূজা করুন না কেন, আপনার ভক্তি সেই ভক্তি সাগরে গিয়েই মিলিত হবে। তাই কাকে পূজা করলে ফল মিলবে; তা না ভেবে মন যাকে চায়, তাকেই পূজা করবে। দেখবেন ফল অবশ্যই পাবে।

যে কোনো সময় নাম নিলেই ফল মিলবে: অনেকে ভাবেন সাকাল সকাল উঠে স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেব-দেবীর সামনে বসে পূজা অর্চনা করলেই কেবল ফল মেলে। কিন্তু জেনে রাখা ভালো যে এই ধরণা একেবারেই ঠিক নয়। কারণ যে কোনো সময়, যে কোনো মুহূর্তে সর্বশক্তিমনানের নাম নিতে পারেন। এমনকি ঘুমাতে ঘুমাতে তাঁর নাম নিলেও সমান উপকার পাওয়া যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ এক্ষেত্রে একটা গল্প প্রায়ই তাঁর ভক্তদের শোনাতেন। তিনি বলতেন কেউ স্বেচ্ছায় নদীতে স্নান করলে তার শরীর য়েমন ভিজে যায়, ঠিক তেমনি যদি কাউকে জোর করে এনে জলে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলেও কিন্তু একই ঘটনা ঘটবে। আর যদি কেউ ঘুমচ্ছে সেই সময় যদি তার গায়ে জল ঢেলে দেওয়া হয়, তাহলেও তো শরীর ভিজে যায়। ঠিক একই ভাবে দেব-দেবীদের নাম যে কোনো সময়ই নিন না কেন, কোনো ক্ষতি নেই কারণ একই ফল পাবেন।

ভগবান মূর্তিতেও থাকেন, থাকেন আমাদের আশেপাশেও: অনেকে বলেন মূর্তি পূজা ভিত্তিহীন। কেন বলেন জানা নেই! আবার কেউ বাড়িতে মূর্তি প্রতিষ্টা করে ভক্তি ভরে তাঁর পূজা করেন। তাহলে কোনটা ঠিক। এমন প্রশ্ন আমাদের মনেও এসেছে নিশ্চয়? যখনই এমন প্রশ্ন কেউ করতেন একটা আজব উত্তর দিতেন রামকৃষ্ণ। তিনি বলতেন ছোট বাচ্চা যখন প্রথম বারের জন্য অক্ষর লিখতে শেখে, তখন সে বড় বড় করে লিখে। ধীরে ধীরে যখন পারদর্শী হয়ে ওঠে, তখন হাতের লেখা  ছোট হতে শুরু করে। ঠিক একই ভাবে সর্বশক্তিমানকে এক মনে ডাকতে  গেলে যে একাগ্রতার প্রয়োজন পরে, সেই মন তৈরি করতে প্রথমে একটা বড় টার্গেট প্রয়োজন। আর ঠিক এ কারণেই মূর্তি পূজার প্রয়োজন রয়েছ। আর যখন মনে করবেন মন স্থির হয়ে উঠেছে, তখন খালি চোখে  দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে তাঁকে ডাকলে দেখবেন মনের আয়নায়  সেই দেব-দেবীর ছবি ফুটে উঠেছে। তাই মূর্তি পূজা করলে কোনো ক্ষতি হয় না, বরং মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে ওঠে। আর মন শান্ত হলে যে কোনও পরিস্থিতিতেই যে সুখে থাকা সম্ভব হয়, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে!

ভগবান হলেন কল্প বৃক্ষ: আমরা ভগবানের সামনে এসে মনের কথা বলি। নিজেদের মনের নানা স্বপ্ন রেখে দিই সর্বশক্তিমানের সামনে। কিন্তু তবুও মনের কোণায় একটা সন্দেহ  থেকেই যায় যে “ভগবান কে বললাম বটে। কিন্তু তিনি কি আমার স্বপ্ন পূরণ করবেন?”। এমন বিশ্বাস এবং খারাপ চিন্তার কারণেই কিন্তু আমাদের সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। এক্ষেত্রে পরমহংসদেব এক মজার গল্প শোনাতেন। তিনি বলতেন ভগবান হলেন সেই কল্প বৃক্ষ, যার নিচে বসে এক গবীর ভাবলেন আমি যদি রাজা হয়ে উঠতাম, তাহলে বেশ হত। যেই ভাবনা অমনি সে রাজা হয়ে উঠলো। এরপর সে ভাবলো এবার যদি এক সুন্দরী আমার স্ত্রী হতেন, তাহলে কেমন হয়! সেই স্বপ্নও পূরণ হলো। এবার কোনো০ এক অজানা কারণে সে মনে মনে ভাবতে থাকলো হঠাৎ করে যদি একটা বাঘ এসে যায়, তাহলে তো তার মৃত্যু নিশ্চিত। যেই না ভাবনা, আমনি কোথা থেকে একটা বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেললো। একই ভাবে ভগবানের নাম নেওয়ার সময় ভালো কথা ভাবলে ভালো ফল পাবেন, আর যত খারাপ ভাববেন, তত খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

ভগবান ছাড়া বাঁচা সম্ভব? একথা তো মানবেন যে আমাদের আশেপাশে উপস্থিত খারাপ শক্তি যেমন সারাক্ষণ আমাদের ক্ষতি করতে চাইছে, তেমনি শুভ শক্তি, যাকে ভগবান নামেও ডাকা যেতে পারে, সেও চেষ্টা চালাচ্ছে আমাদের উদ্ধার করতে। তাই ভগবান ছাড়া কি সত্যিই বাঁচে থাকা সম্ভব? এরূপ প্রশ্নে শ্রীরাম কৃষ্ণ বলতেন, একটা প্রদীপ যেমন তেল ছাড়া জ্বলতে পারে না, তেমনি একজন মানুষের পক্ষে ভগবান চাড়া বাঁচা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।

জীবনের কী লক্ষ হওয়া উচিত? আমরা সবাই আজ টাকার পিছনে ছুটছি। টাকা, বাড়ি-গাড়ি, জাগতিক কমফোর্ট পেলেই আমাদের জীবন সার্থক এমনটা ভেবে নিয়েছি আমরা। কিন্তু একথা ভুলে গেছি যে টাকা দিয়ে কেনা জিনিস সাময়িক কালের জন্য মনকে খুশি দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘক্ষণের জন্য নয়। তাই টাকার পিছনে না ছুটে আশেপাশের মানুষদের কীভাবে আনন্দে রাখা যায়, সে চেষ্টা করলে, সবাইকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালবাসলে,এতটাই অনন্দের সন্ধান পাওয়া যাবে যে দুঃখ ধারে কাছেও ঘিষতে পারবে না।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]