ঐক্যের বছর থেকে কোটিপতি রাজ

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পুর্ননির্বাচনের জনমতে কয়েক কোটি ভারতীয় তাদের সাধারণ নির্বাচনের প্রথম দিনে ভোট দিয়েছেন। ২০টি রাজ্যের ৯১টি আসনে সে ভোটগ্রহণ ঘটেছে। সাত ধাপের এই ভোটগ্রহণ ১৯ মে পর্যন্ত চলবে। কিন্তু সে চিত্রটি ভারতীয় রাজনীতির উপর রচিত দুটি সাম্প্রতিক গ্রন্থের আলোকে বিবেচ্য। এদের একটি ভারতীয় সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স’ এবং অপরটি ব্রিটিশ সাংবাদিক-গ্রন্থাকার জেমস ক্রেবট্রি-র ‘দ্য বিলিয়নিয়ার রাজ’।

তদ্রুপ বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে সে দুটি বই-ই এই লেখনীর উপজীব্য হয়েছে। কেননা প্রণব মুখার্জীর দাবি অনুযায়ী তার কারণেই বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যটি সুপ্রসন্ন, যার সুদূরপ্রসারী সত্যতা ও নৈতিকভিত্তিটি পাঠকের কাছে উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন।

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন আহমেদ ভারত সফরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলে প্রণব মুখার্জী নিজের বইয়ে লিখেন, ‘বন্দি রাজনীতিকদের মুক্তির ক্ষেত্রে তার গুরুত্বারোপে আমার মনে অনুকূল ধারণার সৃষ্টি হয়। শেখ হাসিনা মুক্তি পেলে তার ক্ষমতাচ্যুতির ভয় ছিল। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত দায়িত্ব নিয়ে হাসিনার ক্ষমতারোহনে জেনারেলের ভবিষ্যতটি অক্ষুন্ন রাখি। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাথে দেখা করে এ বিষয়ে আমি তার হস্তক্ষেপ কামনাসহ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মুক্তি নিশ্চিত করি। তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণনের মাধ্যমে আমার হস্তক্ষেপে সকল রাজনীতিকের মুক্তি ও দেশটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করি।

পাশাপাশি অনেক বছর পর ক্যান্সার আক্রান্ত জেনারেল মঈনের চিকিৎসাটি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবস্থা করে দেই।’ একইভাবে শেষ অনুচ্ছেদে লিখেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি সব সময়ই ভিন্নধর্মী ছিল, যা সুস্পষ্টভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি থেকে প্রস্থানমুখী। এই সৃষ্টিতত্ত্বের উপাদানে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের বিপ্লবী নেতা সংগ্রহের পটভূমিটি রয়েছে। সেটা রাষ্ট্রের জনগণের উপর টেকসইপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। আর বাংলাদেশে চলমান সহিংস রাজনীতির অন্য কারণটি হচ্ছে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সমস্যা সমাধানে সামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা।’

তথাপি ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স’ বইটি ১৯৯৬ সাল থেকে সংঘটিত পরবর্তী ১৬ বছরের ভারতীয় রাজনীতির উত্থান-পতনেরই উপাখ্যান। বৃহৎ পরিসরে তা ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘ঐক্যের রাজনীতি’ একজন প্রধান কারিগরের দৃষ্টিতে প্রতিভাত, যা একচ্ছত্র কংগ্রেস পরবর্তী রাজনীতির প্রতিফলন। একই সঙ্গে ঐক্য সরকারের জটিল চ্যালেঞ্জ ও বাধ্যবাধকতা প্রণব মুখার্জীর বইয়ে প্রতিভূ হিসেবে সাবলীলতায় বর্ণিত। আর সেটা ভারতীয় সম-সাময়িক রাজনীতিতে আমাদের প্রজন্মের অন্যতম রাষ্ট্রনায়কের সুবিশাল কীর্তিটি তুলে ধরেছে।

পক্ষান্তরে ‘দ্য বিলিয়নিয়ার রাজ’ বইটিতে ভারতের প্রাগ্রসর অসম সমাজব্যবস্থায় কোটিপতি ধণিক শ্রেণির উত্থান চিত্রটি বিধৃত। যদিও দেশটির গণতন্ত্র বিশ্বে সর্ববৃহৎ, তবু তা ১০০ কোটির ঊর্ধ্বে জনগোষ্টির চীনের তুলনায় দ্রুতই সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ফলাফলের সম্প্রসারণ অসম প্রক্রিয়ায় বন্টিত এবং সেক্ষেত্রে উপরের ১ শতাংশ ধণিক শ্রেণির সম্পদের পরিমাণ দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ। মুম্বাইয়ের মতো বৃহৎ নগরীর অর্ধেক জনগোষ্টির বসবাস বস্তিতুল্য পরিবেশে, সেখানে আমেরিকার বিত্তবান ভেন্ডারবিল্ট ও রকফেলার্সদের মতো স্বর্ণালী প্রাচুর্য এবং মুনাফায় বুঁদ হওয়া ও আকষর্ণীয় ভোগ-বিলাস স্বভাবতই দৃষ্টিকটু। এই বইটি পাঠকদের নিয়ে যাবে জনবিচ্ছিন্ন কোটিপতি ধণিক, পলায়ণপর শিল্পপতি ও আলো-আধারি রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছাকাছি। একই সঙ্গে পাঠক দেখতে পারবে আকাশচুম্বি ধর্ণাঢ্য অট্টালিকা থেকে পাশের মানবেতর বস্তি ও জনপদ, যা লেখক ক্রাবট্রি পুঁজিপতিদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কারকদের দ্বন্দ্ব এবং জাত-পাতভেদে বাস্পরুদ্ধ বঞ্চনা ও অসমতার অসহিষ্ণু সংগ্রামটি তুলে ধরেছেন। এ বইটি কেবল ভারতের সমাজ উত্তরণের ক্ষেত্রে নয়, বরং সারা বিশ্বের সংগ্রাম ও পরিপূর্ণতা অর্জনে এক দেদীপ্যমান আলোকবর্তীকা।

তাই ওই দুটি বইয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণে কেউ সহসা বুঝে উঠতে পারবেন না কোথায় ভারতের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবর্তিত। কেননা প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘এই সৃষ্টিতত্ত্বের উপাদানে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের বিপ্লবী নেতা সংগ্রহের পটভূমিটি রয়েছে। সেটা রাষ্ট্রের জনগণের উপর টেকসইপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।’ তদুপরি দয়াপরবশ হয়ে জেনারেল মঈনের সুচিকিৎসার বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশে চলমান সহিংস রাজনীতির অন্য কারণটি হচ্ছে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সমস্যা সমাধানে সামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা’ কেবল অসামঞ্জস্যপূর্ণই ঠেকবে।
ই-মেইল: [email protected]




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]