কিছু সম্মান গৃহকর্মীদেরও প্রাপ্য

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

অধ্যাপক আবুল হাসনাৎ মিল্টন : মায়ের কথা প্রায়ই মনে পড়ে। কেবল তিনি প্রয়াত হয়েছেন বলেই নয়, শৈশবে শেখানো তার কিছু কথার কারণে। খুলনায় তখন আমাদের বাসায় গৃহকর্মী থাকতো। মা সব সময় আমাকে মনে করিয়ে দিতেন, গরিব বলে আমি যেন তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার না করি। তাদের কখনো নাম ধরে ডাকতাম না, খালা-ফুফু-মামা-চাচা বা ভাই ডাকতাম। আমরা যা খেতাম তারাও তাই খেতেন। ঈদে বা বিভিন্ন উৎসবে আমি নতুন কাপড় পেলে তারাও পেতেন। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মীরাও ছিলো পরিবারের সদস্যদের মতনই। এখন প্রবাসে থাকি। ঘরের রান্না-ধোয়ামোছার প্রায় সব কাজ আমি আর নূপুরজানই করি, এখানে বাসায় গৃহকর্মী রাখবার মতো বিলাসিতা খুব কম মানুষেরই আছে।
অনেকদিন পরে এবার ঢাকায় গিয়ে ডা. রুবাইউল মুর্শেদ ভাইয়ের সাথে দেখা। ক্যানবেরায় আমরা একসাথে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম, ডিপার্টমেন্টে একই রুমে বসতাম। পরে ঢাকায় যতোবারই তার সাথে দেখা হয়েছে, প্রতিবারই কোনো না কোনো নতুন সৃজনশীল ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। ঢাকা শহরের প্রায় প্রতিটি বড় হাসপাতালের জন্মলগ্নে তিনি জড়িত ছিলেন। এবার গিয়ে দেখলাম তিনি দারুণ মহৎ একটা কাজে হাত দিয়েছেন। বাংলাদেশে আমাদের অধিকাংশের ঘরেই সাহায্যকর্মীরা আছেন, যাদের আমরা গৃহকর্মীও বলি। মানুষ হিসেবে তাদের ন্যূনতম অধিকারটুকু নিশ্চিত করবার জন্য তিনি ‘সম্মান’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেছেন। খুব বেশি কিছু নয়, একটু সহানুভূতি যেন আমরা এই মানুষগুলোকে দেখাই।
বাংলাদেশে বসবাস করে আমরা অনেক সৌভাগ্যবান। সামান্য কয়েকটা টাকা বেতনের বিনিময়ে কোনোরকম ছুটিছাটা ছাড়াই সার্বক্ষণিক সাহায্যকর্মীর রাখার মতো বিলাসিতা করতে পারি। এই মানুষগুলো আমাদের জন্য এতোকিছু করেন, বিনিময়ে আমরা তাদের ঠিকমতো খাবার দিই না, শোবার জন্য হয়তো তাদের জায়গা হয় মেঝেতে বা ঘরের কোনো কোনায়। তাদের ঠিকমতো পোশাক-আশাকও দিই না। আর খবরের কাগজে মাঝেমধ্যে শিরোনাম হয়, গৃহকত্রী কর্তৃক অমানবিক নির্যাতনে আহত হয়ে সাহায্য কর্মী হাসপাতালে ভর্তি। এ ছাড়াও যৌন হয়রানিসহ আরো অনেক ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় এসব সাহায্য কর্মীদের। কিন্তু এসব অন্যায়ের কোনো প্রতিকার পাবার সুযোগ তাদের জন্য খুব সীমিত।
অথচ এই সাহায্য কর্মীরাও মানুষ। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনযাপন সহজ করবার জন্য তারা এতোকিছু করছেন। বিনিময়ে আমাদের কি কিছুই করণীয় নেই? একটা মানুষ কতোটা অসহায় হলে, গরিব হলে অন্যের বাসায় কাজ করতে আসে এটা আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তাদের প্রতি আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। তাদের একটু ভালো খেতে দেওয়া, ভালো কাপড় পরতে দেওয়া, উৎসবের দিনগুলো একসাথে উদযাপন করা, মাঝেমধ্যে ছুটি দেওয়ার মত ব্যাপারগুলো কিন্তু সহজেই করা যায়। এই সামান্যটুকু পাওয়া তাদের অধিকার, তাদের প্রতি এটা কারো করুণা নয়। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটা মানবিক সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে সাহায্য কর্মীরাও হবে আমাদের পরিবারেরই একটা অংশ।
লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]