জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গুপ্তহত্যার চেয়ে জীবন্তই চেয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

দেবদুলাল মুন্না : ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৩ ফুট প্রস্থের ঘর। মাঝখানে দেয়াল দিয়ে বানানো হয়েছে দুটো কামরা। এর একটিতে অফিস করতেন এবং অন্যটিতে ঘুমাতেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একাকিত্ব দূর করতে গতবছরের মে মাসে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল একটি বিড়াল। লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে এই স্বেচ্ছাবন্দী জীবন ছিল তার। অপরাধ? যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বহু অতি গোপনীয় নথি ফাঁস করে দিয়ে ঝড় তোলেন। অ্যাসাঞ্জের অপরাধ, ঈঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইরাক-আফগান্তিান-যুদ্ধাপরাধের গোপন সত্য উন্মোচন করা। এটাই কিন্তু ঘটনা। এরপর থেকে যেকোনো প্রকারে অ্যাসাঞ্জকে হাতে চেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ইন্টেলিজেন্স এস্টাবলিশমেন্ট। তাকে বিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করেছে গত বৃহস্পতিবার।উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসাঞ্জ তাঁর জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়া থেকে ‘বিশেষ কোনো সুবিধা’ পাবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। গতকাল শুক্রবার অ্যাসাঞ্জ সম্পর্কে তিনি এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেন, আর দশজন সাধারণ অস্ট্রেলীয় নাগরিকের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন অ্যাসাঞ্জ। তাঁকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে জাতীয় গণমাধ্যম এবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মরিসন বলেন, ‘এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপার, এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।’ কিন্তু তাকে গ্রেফতারের গুঞ্জন উঠেছিল গতবছরই। গুঞ্জন ছিল তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হতে পারেন। আবার ইকুয়েডর সরকারও তার ওপর রুষ্ট ছিল। পুরনো ভালবাসা আর তার প্রতি ছিলো না। কেন? গুপ্তহত্যার বিষয়ে উইকিলিকস-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানে ইকুয়েডর সরকার। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সে দেশের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এই গুপ্তহত্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন অ্যাসাঞ্জ। উইকিলিকস আদালতের সেই নথির অনুলিপি প্রকাশ্যে এনেছে। তারা বলছে, সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জেনেও অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস থেকে বহিষ্কার করা হলে ইকুয়েডরের সংবিধান লঙ্ঘিত হবে। সেসময়েই ইকুয়েডর অচিরেই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে দেওয়া রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত সে দেশের দূতাবাসে অবস্থানরত উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসাঞ্জকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে ইকুয়েডর ও যুক্তরাজ্যের সমঝোতার খবর দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইন্টারসেপ্ট। কারণ ইকুয়েডরের বর্তমান সরকার ছিল নাখোশ তার ওপর। ইকুয়েডর সরকারের ধারণা অ্যাসেঞ্জ ও উইকিলিকস আইএনএ পেপারস ফাঁসে জড়িত।সামাজিক যোগাযো মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মোরেনো ও তার পরিবারের একটি ব্যক্তিগত ছবি ফাঁসের সঙ্গেও অ্যাসাঞ্জের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করছিলেন তারা। প্রেসিডেন্ট মোরেনো গতবছরে জুলাইয়ে স্থানীয় একটি রেডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই দুই ঘটনাকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘কারও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক বা ফোনে আড়ি পাতার অধিকার অ্যাসাঞ্জের নেই।আমরা অ্যাসাঞ্জ ও তার আইনজীবীদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলাম তিনি অনেকবার তা লঙ্ঘন করেছেন।’
কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যের ফেডারেল পুলিশ ইকুয়েডরের দূতাবাসের বাইরে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু রেখেছিল। গতবছরের জুন মাসে খবর প্রকাশিত হয়, ভয়াবহভাবে ‘ভেঙে পড়েছে’ অ্যাসাঞ্জের স্বাস্থ্য। অ্যাসাঞ্জ সে সময় জানান, দূতাবাসে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রিত অবস্থায় থাকার ফলে তার শারীরিক অবস্থার ওপর অবনতি ঘটেছে। ফলে তিনি বিষয়টিতে হস্তক্ষেপের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান।২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসাঞ্জকে মুক্তভাবে চলাফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মত দেয় জাতিসংঘের আইনি প্যানেল। সেই সঙ্গে এতোদিন ‘স্বাধীনতাবঞ্চিত’ করে রাখার কারণে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।কিন্তু
ব্রিটিশ কুটনৈতিক সাংবাদিক রিচার্ড হ্যাসলে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ গ্রেফতার হুয়ার পর ‘দ্য থট’ রেডিওতে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, ‘এসবই ছিলো ইকুয়েডর, জাতিসংঘের ও ব্রিটেনের ‘অ্যাসাঞ্জের ব্যাপারে নজরদারি খরচ বেড়ে যাওয়া’র একটা ধারাবাহিক নাটক।কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ইন্টেলিজেন্স এস্টাবলিশমেন্ট কর্তৃপক্ষ বারবারই চাচ্ছিল মাইকেল অ্যাসাঞ্জকে। আর এ কারণেই প্রপোগা-া ছড়ানো হয় প্রথমে গুপ্তহত্যা’র, পরে ইকুয়েডর সরকারের বিরুপ মনোভাবের, জাতিসংঘের আইনি প্যানেলের লোক দেখানো মানবতার। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে জ্যান্তই চেয়েছিল বলে ছিল এসব নাটক।’
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সাড়া জাগানো বিকল্প সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয় ২০১০ সালে। মার্কিন কূটনৈতিক নথি ফাঁসের মধ্য দিয়ে উইকিলিকস উন্মোচন করে মার্কিন সা¤্রাজ্যের নগ্নতাকে। সুইডেনে দুই নারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর ২০১২ সালের জুন থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসের আশ্রয়ে ছিলেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এতো ক্ষ্যাপার পেছনে কারণ শুধু গোপন নথি প্রকাশই নন, অ্যাসাঞ্জের মার্কিন বিরোধী বেশ কিছু উক্তি। যেমন,১.‘জারজদেরকে ধ্বংস করতে আমি মজা পাই’ (জার্মানীর স্পিগেল পত্রিকা, ২০১০)২.‘আমেরিকা নেমকহারাম, তারা কলম্বাস পড়ায় না সিলেবাসে, বাপের নাম নেয় না কিন্তু সেক্স করা শেখায়’ (অস্ট্রেলীয় রেডিও, ক্যানবার্ণ , ২০১১)‘আমেরিকা সারাবছর দেশে দেশ যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখে তাদের অস্ত্র ব্যবসার জন্য, আমি অস্ত্রবাজদের নপংসুক করতে চাই’(ডয়েচ ভেলে, ২০১১)। সম্পাদনা : ইকবাল খান




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]