নতুন বছর আসে, আমরা কতোটা নতুন হই?

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : আজ নতুন বছর এসেছে। ঘরে ঘরে নতুনভাবে মানুষ সাজগোজে বছর উদযাপনে দিনটি কাটিয়ে দেবে। শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পীরা নতুন শাড়ি পড়ে কিংবা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে গান, কবিতা ও নানা ধরনের শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করবে। শিশুরা এসব অনুষ্ঠান প্রাণভরে গ্রহণ করে নিবে। তরুণরা শহরজুড়ে ঘুরে বেড়াবে, আড্ডা দিবে, পান্তাভাত খাবে। ঘরে মায়েরা নতুন বছরের নতুন খাবার তৈরি করবে। সবাই ঘরে আসলে একসঙ্গে বসে খাবে। ইলিশ মাছ হলে তো সবারই খাওয়াটি জমবে ভালো। শহরে এখন বাংলা নববর্ষ প্রায় ঘরেই ঢুকে গেছে। এর আগে নতুন জামাকাপড়, নানা ধরনের অলংকার দ্রব্য-সামগ্রী বেচাকেনা হচ্ছে বেশ নজর কাড়ার মতো। বিশেষত বৈশাখী ভাতা প্রবর্তিত হওয়ায় বাজারে কেনাকাটার মাত্রা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। বৈশাখী অর্থনীতির ধারণা চালু হয়েছে। অনেকেই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বেচাকেনার পসরা সাজাচ্ছেন। মানুষজন খুঁজে খুঁজে পছন্দের জিনিসটি কিনছেন। নববর্ষের দিন অনেকেই নতুন নতুন জামাকাপড় পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন। এখানে নেই কোনো ধর্ম-বর্ণের ভেদাবেদ। সবাই জাতীয়তার পরিচয়ে দিনটি পালন করেন। একসময় এ ছিলো কেবলই পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকানোর মাধ্যমে নতুনভাবে বছরকে আলিঙ্গন করার বিষয় হিসাবে। এখন সময় বদলে গেছে। শহরের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, নি¤œবিত্তÑসবাই নববর্ষকে একত্রে মিলেমিশে পালনে সাংস্কৃতিক বন্ধন অনুভব করে। এটি ভালো লক্ষণ। তবে যে বিষয়টি আমাদের পীড়িত করে তা হচ্ছে বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে একসময় বাংলা নববর্ষের মেলা বসতো। আমরা ঘুড়ি উড়াতাম, মুরলি খেতাম, বাঁশি বাজাতাম, রং-বেরঙের হাতের তৈরি মাটি ও বাঁশের পণ্য সামগ্রী কিনতাম। যদিও কিছু কিছু মানুষ এসব বৈশাখী মেলাকে খুব বেশি পছন্দ করতো না। তারপরেও মানুষ মেলায় অংশ নিতে খুব একটা বাধা মানতো না। কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলে এমন পরিবেশ সর্বত্র সুখকর নয়। অনেক জায়গাতেই মেলা সেভাবে বসে না। স্থানীয় নানা গোষ্ঠী এইগুলোতে ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে। তারা নানাভাবে এগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচারও করে থাকে। ফলে অনেক মানুষেই বাংলা নববর্ষের বৈশাখী মেলার ইতিহাস, এতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের বিষয়াদি না বুঝে এসব সর্বজনীন আয়োজনে অংশগ্রহণকে মেনে নিতে পারছেন না। ধর্মীয় উৎসবের বাইরে জাতিগত অনেক উৎসবই তো থাকতে পারে। সেখানে সমাজের ধনী-দরিদ্র বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষজন অংশ নিতে পারে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই নববর্ষের অনুষ্ঠান পালনের রীতিনীতি দেখে আসছি। এগুলো মূলতই প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠীর ভেতর থেকে ইতিহাসের কোনো একটি পর্বে সৃষ্টি হয়ে থাকে। যেমন ইরানিরা ‘নওরুজ’ পালন করে। এটি তাদের নতুন বছরের আয়োজন। যা পারস্য সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলিত রূপ। এখানে মানুষজন আনন্দ-উৎসবে নিজেদের নতুন বছরকে গ্রহণ করে নেয়। ভিয়েতনামীরাও এমনটি করে, চীনা জাতি-গোষ্ঠীরা নববর্ষ পালন করে, আফগানরাও তাদের নতুন বছরকে স্মরণ করে। এটি সম্পূর্ণরূপেই প্রতিটি জাতির নিজস্ব ঋতু-মৌসুমকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করে না, নিজেদেরও তুলে ধরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। বাঙালি জনগোষ্ঠী স¤্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা নববর্ষের যে ধারণা গ্রহণ করে এসেছে সেটি আমাদের ফসল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সফলতাকে নতুনভাবে আলিঙ্গন করার ব্যর্থতা ও বিফলতাকে ভুলে যাওয়ার একটি মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। এখন হয়তো এর সঙ্গে ফসল বা ব্যবসায়িক চাকরিগত, সাফল্য-ব্যর্থতার কোনো আবেদন নেই। কিন্তু আধুনিক সমাজ জীবনে জাতিগতভাবে মানুষের একসঙ্গে মিলেমিশে আনন্দ উৎসব করা এক নতুন পর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাঙালি কেন এই বাংলাদেশ ভূ-খ-ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগুলোও তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নতুন বছরকেন্দ্রিক নানা আয়োজনের সমারোহ গঠিয়ে থাকে। বৈসাবি তেমনি একটি বহু ক্ষুদ্র নৃ-জাতি-গোষ্ঠীর নববর্ষের আয়োজন যা তাদের জীবনকে রাঙিয়ে তোলার ও প্রকাশ করার অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলা নববর্ষ এবং বৈসাবির সময়কালটি প্রায় একই। অন্যান্য জনগোষ্ঠীরও তেমনি নিজ নিজ নতুন বছরের আয়োজন রয়েছে। বলা চলে বাংলাদেশ ভূ-খ-ে বসবাসকারী বাঙালি এবং অন্যান্য ছোট-বড় নৃ-জাতি-গোষ্ঠী প্রায় একই সময়ে নিজ নিজ নতুন বছর পালন করেÑযেখানে আমরা সবাই একে অপরের নতুন বছরকে প্রায় একইভাবে পালন করতে পারি। এটি আমাদের সকলের জন্যই একটি কাকতালীয় ঘটনা। আমরা সকলেই যার যার নতুন বছরকে যার যার মতো করে উদযাপন করতে পারি। একে অপরের কাছাকাছি যেতে পারি। একইসঙ্গে নতুন বছরকে আলিঙ্গন করে জীবনকে কিছু সময়ের জন্য হলেও নতুনভাবে দেখার ও পাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য চাই দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা, উদারতা এবং সাংস্কৃতিক বোধের বিকাশ। তাহলেই আমাদের জীবন নতুন বছরে কিছু সময়ের জন্য হলেও কাছাকাছি হাতে হাত রেখে চলার সুযোগ খুঁজে পাবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]