নুসরাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজের ক্ষমতার উৎস কি?

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

বিভুরঞ্জন সরকার : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন সিরাজউদদৌলা। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন রিমান্ডে আছেন। তিনি নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি। এই সিরাজ সম্পর্কে এখন বিভিন্ন তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা তার শাস্তি দাবি করছি। তিনি যে একজন দুষ্ট চরিত্রের মানুষ, তিনি যে নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা করেন না, তিনি যে একাধিক অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত – এসব জেনেশুনে তাকে এতোদিন কেন একটি প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্বে রাখা হয়েছিলো? তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, তিনি আগাগোড়া অনৈতিক কাজ করে আসছেন। অথচ তাকে একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে বহাল রাখা হয়েছিলো কি কারণে, কাদের স্বার্থে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সঙ্গে সঙ্গে যে বা যারা তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তার অপরাধের মাত্রা বাড়াতে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তিনি জামায়াতের ‘রোকন’ ছিলেন। নৈতিক স্খলনের কারণে যে লোকটিকে জামায়াত দলে রাখলো না, বহিষ্কার করলো, সেই লোকটি কী করে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেলেন? জামায়াতের বাতিল মাল যখন আওয়ামী লীগের ঝুরিতে জায়গা পায় তখন সেই আওয়ামী লীগ নিয়ে কি গৌরব করা যায়? আমরা জামায়াতবিরোধিতা করবো আর আওয়ামী লীগের জামায়াতিকরণ মেনে নেবো- এটা কি হতে পারে?
ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনা, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা আমাদের কতোগুলো প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। নুসরাত যদি সিরাজউদদৌলার মুখোশ খোলার সাহস না দেখাতো তাহলে তো তিনি দিব্যি দাপটের সঙ্গে তার রাজ্যপাট চালিয়ে যেতেন। লোকটি খারাপ এটা জেনেও তার মুক্তির দাবিতে যারা মিছিল বা মানববন্ধন করেন তারা সেটা কেন করেন, তা-ও আসলে খতিয়ে দেখা দরকার, বোঝা দরকার। আমাদের কোথায় গলদ, কোথায় সমস্যা? যে মাদ্রাসায় ধর্ম এবং নীতিনৈতিকতার শিক্ষা দেয়ার কথা, সেই মাদ্রাসার প্রধান যখন একজন লম্পট লোক হন এবং জেনেশুনেও সেটা সবাই মেনে নেন, তখন আমরা আর কীভাবে নিজেদের উন্নত সভ্য মানুষ হিসেবে দাবি করবো?
একটা বড় রকমের দুর্ঘটনা না ঘটলে আমরা অনিয়ম দেখতে পাই না। বহুতল ভবনে আগুন লেগে মানুষ পুড়ে মরলে আমরা জানতে পারি যে ভবনটি বানানোর যথাযথ অনুমোদন নেই। গাড়ি চালক চাপা দিয়ে মানুষ মারার পর আমরা জানতে পারি ওই চালকের লাইসেন্স নেই। গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে জানা যায় ওই গাড়ির ফিটনেস নেই। ছাত্রী লাঞ্ছিত হওয়ার পর জানা যায় শিক্ষক দুশ্চরিত্রের অধিকারী। কবে আমরা এসব বিষয় আগে জানতে পারবো? কীভাবে আমরা নিয়মে অভ্যস্ত হবো? কবে আমরা নিজেদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে দাবি করতে পারবো?
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ধর্ষক আছেন সেটা এখন আর গোপন বিষয় নয়। এই ধরনের শিক্ষকদের কি চিহ্নিত করার কোনো উপায় নেই? যদি থাকে তাহলে অঘটন ঘটার আগেই কেন তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক করা যায় না। হাতে নাতে না ধরতে পারলে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না- এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও তো সত্য যে যে দুষ্কর্ম করে সে আড়ালেআবডালেই করতে চায়। কিন্তু আজকাল কেউ কেউ অপরাধ করে সবাইকে জানিয়েশুনিয়েই। যেমন সোনাগাজীর সিরাজউদদৌলা। বড় অপরাধ কেউ একা করতে পারে না। সঙ্গীসাথী নিয়ে করে। আর একাধিক মানুষ মিলে যে কাজ করে সেটা গোপনও থাকে না। কারো অপরাধ সম্পর্কে যদি জানা থাকে তাহলে তাকে অপরাধ সংঘটন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা দরকার।
আমরা এটাও জানি যে, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয় ছাড়া অপরাধীরা বড় অপরাধ করতে পারে না। সিরাজ যেমন জামায়াত, আবার জামায়াত না থাকলে আওয়ামী লীগে ঝুঁকে তার অন্যায়, অপকর্মের তালিকা বাড়িয়ে চলেছে। খারাপ মানুষদের বিরুদ্ধে যতোক্ষণ সামাজিক ঘৃণা তীব্র না হবে, পরিবারে-সমাজে যতোক্ষণ কুআচারীদের বয়কটের মনোভাব গড়ে না উঠবে ততোক্ষণ সিরাজদের উত্থান অব্যাহত থাকবে। ভালো মানুষরা আস্তে আস্তে জায়গা ছেড়ে দেয়ার সব কিছু নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। আমরা একটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। বলা যায় একটি ক্রস রোডে এসে দাঁড়িয়েছি। এখন আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা যেভাবে চলছি সেভাবেই চলবো,নাকি নতুন করে সব কিছু ভাববো।
অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে , অন্যায় বিস্তারে নীরব থেকে আমরা আমরা অন্যায়কারীর সমান অপরাধে অপরাধী হচ্ছি।
ঘুরে দাঁড়ানোর, সাহস দেখানোর সময় বোধহয় হয়েছে।
লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদেক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]